‘বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে আওয়ামী লীগ ফেরার সুযোগ তৈরি হবে’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। ছাত্রজীবনে ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। সেখান থেকেই বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে পথচলা শুরু। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী প্রচারণা এবং অর্থপাচারকারীদের তালিকা প্রকাশের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকার জন্য পরিচিত তিনি। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। বাংলাদেশে বামপন্থার রাজনীতি, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে নিজের ভাবনা জানিয়েছেন তিনি। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি থেকে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক—এই দীর্ঘ পথচলায় বামপন্থার প্রতি আপনার নিজের টান তৈরি হলো কীভাবে?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আপনাকে ধন্যবাদ। আজ যখন কথা বলছি, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমার ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পথচলার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ঘটনাটি ১৯৭৮ সালের একদম শেষের দিকের, ডিসেম্বর মাসের কোনো এক সময়ে খুলনায় তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। মূলত ১৯৭৯ সালে আমি সরাসরি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই এবং তারপর থেকে এ পর্যন্ত আমার পথচলা অব্যাহত রয়েছে। প্রায় ৪৫ বছরের স্মৃতিচারণ করতে গেলে বলতে হয়, আমি ১৯৭৯ সালে যখন ছাত্ররাজনীতিতে এলাম, তখন এটি বুঝেই এসেছিলাম যে মানুষের মুক্তি বলতে তাদের জীবনের মৌলিক সংকট—খাদ্য, বস্ত্র, উন্নত জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করা। এটি আমাদের দেশসহ সারাবিশ্বে তখনই সম্ভব, যখন পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে আমরা একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে যেতে পারব। এই আদর্শিক জায়গাটি বুঝেই খুলনার তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর আমি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই। আমি যে অঞ্চলে ছিলাম, সেই খুলনা অঞ্চল কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে কলেজ কমিটি, শহর কমিটি এবং জেলা কমিটিতে একাধিক দায়িত্ব পালন শেষে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। পরবর্তীতে পার্টিতে যুক্ত হই। আমাদের পার্টির সদস্যপদ পাওয়া কিছুটা কঠিন প্রক্রিয়া, সেখানে গ্রুপ থেকে সদস্যপদ অর্জন করতে হয়। আমি সৌভাগ্যবান যে ১৯৮১ সালে সেটি অর্জন করতে পেরেছিলাম। এভাবেই ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বামপন্থি রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি এবং আজও আমি এই পথেই চলছি।
এশিয়া পোস্ট: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বামপন্থিদের সবচেয়ে ইতিবাচক বা সুসময় ছিল কোন সময়টি?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি ও অনেক বামপন্থি রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তবে ওই সময়েও কমিউনিস্টরা ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের আলাদা বাহিনী গঠন করে যুদ্ধ করার গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। আশির দশকে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন, বিশেষ করে শ্রমিকদের সংগ্রাম দানা বাঁধার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এরপর ক্ষেতমজুর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পার্টি একটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে আমাদের পার্টির সভাপতি ছিলেন কমরেড মণি সিংহ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। ওই সময়টিই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিদের একটি শক্তিশালী অবস্থানের কাল। যে কোনো ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির জমায়েত করার ক্ষমতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করত। সেই বিবেচনায়, বিশেষ করে আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম আন্দোলন একটি জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান জায়গায় আসতে সক্ষম হয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: বামপন্থিরা বিভিন্ন সময়ে নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এখন পর্যন্ত আপনাদের অর্জিত সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো কী কী?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: অর্জনের খতিয়ান দেখতে গেলে ব্রিটিশ আমল থেকেই কমিউনিস্টরা প্রতিটি লড়াইয়ে যুক্ত ছিল। তেভাগা আন্দোলন ও টঙ্ক আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক সংগ্রামে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিস্টরা জয়লাভ করেছিল। এগুলো এখন ইতিহাসের অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা খাস জমি দখল করে ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জয়ী হয়েছি। ঢাকাসংলগ্ন গাজীপুরসহ অনেক জেলায় এই আন্দোলনের সফল ইতিহাস আছে। শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন দলকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘স্কপ’ (SKOP) গড়ে তোলা এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায় করা আমাদের অন্যতম অর্জন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা ছিল অনন্য। তবে বর্তমানে মানুষের কাছে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও অগ্রগণ্য সংগ্রাম হলো জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন। আমরা ফুলবাড়ী আন্দোলনে বিজয়ী হয়েছি, কনসাল্টেড বিদ্যুৎ আন্দোলনেও আমাদের বিজয় এসেছে। সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনে আমরা হয়তো পুরোপুরি সফল হইনি, কিন্তু সরকারের জোড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছি। অনেক সময় তাৎক্ষণিক জয় না এলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র বা সরকার আমাদের দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়, যা আমাদের সংগ্রামেরই প্রতিফলন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। আপনাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে কীভাবে দেখছেন?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। ২০১৩-১৪ সাল থেকেই আমরা কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রাম করেছি। মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার ছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে বলি, ১৯৯০-এর আগে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে আমরা দেশের চার প্রান্ত থেকে হেঁটে ২২ দিনে ঢাকা এসেছিলাম। আমাদের স্লোগান ছিল—‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। সেই অধিকার ১৯৯০-এ অর্জিত হলেও পরবর্তীতে আবার সংকটে পড়ে। এবারের গণ-অভ্যুত্থানটি আমাদের অনেক রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে। তবে যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা যদি সেই পথ ধরে এগোতে পারত, তবে সংকট অনেকটা কমত। কিন্তু দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য মৌলিক বিষয়ের ওপর আঘাত করা হলো এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একাত্তরের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলল। দুর্নীতি ও লুটপাটও বন্ধ হয়নি। তবে অন্তত একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা বড় অর্জন। আমরা বারবার বলে আসছি, ন্যূনতম গণতন্ত্রের পথে হাঁটার কাজ শুরু করা জরুরি। কোনো অপশক্তি যেন একে পিছু টেনে ধরতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা দায়িত্বশীল আচরণ করছি।
এশিয়া পোস্ট: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে বামপন্থিদের উল্লেখযোগ্য অবদান কী ছিল?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আমরা মনে করি, এই গণ-অভ্যুত্থান শুধুমাত্র জুলাই মাসের কয়েক দিনের ফসল নয়। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে এটি স্পার্ক করলেও এর পটভূমি তৈরি হয়েছে এক যুগের বেশি সময়ের লড়াইয়ের মাধ্যমে। বামপন্থিদের মধ্যে অনেকেই নানা সময় এদিক-সেদিক ভিড়লেও আমাদের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোট নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে যখন অনেক রাজনৈতিক দল কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল, তখন ১৬ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোটই প্রথম রাজপথে জোরালো অবস্থান নেয়। ১৭ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির সভা করে রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নিই এবং এই সরকারকে উৎখাত করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই বলে ঘোষণা করি। আমরা দেশব্যাপী কর্মসূচি দিয়েছি এবং বিদেশের বন্ধুপ্রতিম দলগুলোকে এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বার্তা দিয়েছি। এ ছাড়া সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং কারফিউ ভেঙে রাজপথে নামার ক্ষেত্রে বামপন্থিদের নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। এটিই জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের প্রধান অবদান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেউ ‘বিপ্লব’ বলছেন, কেউ বলছেন ‘গণ-অভ্যুত্থান’। আপনার মূল্যায়ন কী?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: এটি মূলত একটি গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব নয়। বিপ্লব হলো সমাজের আমূল পরিবর্তন। আমরা যদি ক্ষমতায় যেতে পারতাম বা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতে থাকত, তবে হয়তো এটি বিপ্লবের অভিমুখে যাত্রা করতে পারত। ৫ আগস্ট একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে এবং এটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা আমরা কতটা রক্ষা করতে পারছি বা এটি হাতছাড়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভিন্ন আলোচনা হতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি শক্তিশালী গণ-অভ্যুত্থান ছিল, তা নিশ্চিত।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উত্থান নিয়ে আপনাদের উদ্বেগের কারণ কী?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: দক্ষিণপন্থি রাজনীতি বলতে আমরা মূলত সেই শক্তিকে বুঝি যারা প্রগতি বা অগ্রগতির বদলে সমাজকে পেছনের দিকে টেনে নিতে চায়। আমাদের দেশে যারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তারাই এই ধারার প্রতিনিধি। আমাদের দেশের আলেম সমাজও অতীতে ধর্মকে রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন। আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় এই শক্তিটি কেবল পাকিস্তানের পক্ষেই থাকেনি, বরং রাজাকার, আলবদর বাহিনী গঠন করে গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের সময়ও তারা তলে তলে সমঝোতা করে চলেছে। এরা নারীদের অধিকারের বিপক্ষে এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পরিপন্থি অবস্থান নেয়। রাষ্ট্রের উচিত সব নাগরিককে সমান চোখে দেখা, কিন্তু দক্ষিণপন্থিদের দৃষ্টিভঙ্গি এর ঠিক উল্টো। বাংলাদেশ যদি এই শক্তির কবলে পড়ে, তবে আমরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারব না।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সংসদ এবং সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সংস্কার কাজ হাতে নিলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতো। বর্তমান সংসদের ক্ষমতাসীন দল কিছুটা সহনশীল আচরণ করার চেষ্টা করছে, তবে বিরোধী দলের কাছ থেকে আমি খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করি না। কারণ, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক দর্শনে খুব একটা পার্থক্য নেই—সবাই মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষপাতী। ফলে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সংসদে আলোচনা হয় না। যেমন বড় বড় বাণিজ্য চুক্তি বা সীমান্ত হত্যার মতো জাতীয় ইস্যুতে সংসদে কার্যকর বিতর্ক আমরা দেখছি না। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে মানুষ একে ভবিষ্যতে ‘নামমাত্র সংসদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করবে।
এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনার বিষয়। এক সময় তরুণরাই বামপন্থার মূল শক্তি ছিল, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আমরা সেই ধারা বজায় রাখতে পারিনি। এর প্রধান কারণ প্রচলিত রাজনীতির প্রতি তরুণদের অনীহা। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সেই শক্তিশালী দৃশ্যমান চেহারা এখন আর নেই। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষকে লোভ আর ভয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের বদলে তাদের বিপথগামী করা হচ্ছে। আমাদের ভাষা অনেক সময় সাধারণ মানুষ বা তরুণদের কাছে সহজবোধ্য হয় না। জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণরাই বৈষম্যমুক্ত সমাজের স্লোগান তুলেছে, যা আসলে আমাদেরই চাওয়া। কিন্তু তাদের এই শক্তির সঙ্গে আমরা সংহতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা চাই তরুণরা আসুক এবং বাম রাজনীতির কোনো ত্রুটি থাকলে তা নতুনভাবে সংস্কার করে শোষণের অবসানে পথ দেখাক।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের কর্মসূচিতে জনসমাগম অনেক সময় কম দেখা যায় কেন? সাধারণ মানুষের সঙ্গে কি আপনাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: কর্মসূচিতে লোকসংখ্যা সবসময় এক থাকে না। এখন মানুষ ঘরে বসেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিভিশনে খবর পায়, তাই জনসভায় আসার প্রবণতা কমেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের কর্মীদের ৯৯ শতাংশই শ্রমজীবী মানুষ। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে তারা সবসময় আসতে পারে না। বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে কর্মীরা নিজেদের চাঁদা দিয়ে সমাবেশ করে। যেমন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বা পরবর্তীতে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে সমাবেশ করেছি, তা দেখে অনেকেই অবাক হয়েছে যে লাল পতাকাতলে এত মানুষ আছে। আমরা গণচাঁদার ওপর নির্ভর করি, তাই অর্থের বিনিময়ে লোক আনার ক্ষমতা বা ইচ্ছা আমাদের নেই। তবে মানুষের কাছে দৃশ্যমান হওয়ার জন্য আমাদের আরও বড় জমায়েত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: বাম সংগঠনগুলোর মধ্যে বারবার ভাঙন হওয়ার মূল কারণ কী? এতে কি মানুষের ভরসা কমছে না?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: সিপিবিতে ১৯৯৩ সালে একটি বড় পরিবর্তন এলেও মূলত সিপিবি ঐক্যবদ্ধ আছে। তবে অন্যান্য বাম দলের মধ্যে অনেক ভাঙন আমরা দেখেছি। এর কারণ অনেক সময় আদর্শিক শুদ্ধতা বা ‘পিউরিস্টিক অ্যাটিটিউড’। কৌশলগত ব্যাখ্যায় একমত হতে না পারা এবং নেতৃত্বের সংকটও বড় কারণ। এই বিভক্তি অবশ্যই আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর এবং তরুণদের আমাদের প্রতি ভরসা হারানোর একটি কারণ। তবে বর্তমানে আমরা কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্যের দিকে এগিয়েছি। বাম জোটের মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। শুধুমাত্র দলের ঐক্য নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণি সংগঠন ও সাধারণ মানুষের ঐক্য গড়তে হবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ আছে যে, ৯০-পরবর্তী সময়ে আপনারা অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় ছিলেন। এটি কি সত্য?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: বামপন্থিদের একটি অংশ ১৪ দলীয় জোটে ছিল, তারা অবশ্যই আওয়ামী লীগকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমরা যারা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম বিকল্প শক্তি হিসেবে ছিলাম, আমরা আমাদের সাধ্যের চেয়েও বেশি লড়াই করেছি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর প্রথম রাজপথে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ আমরাই করেছি। জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রথম গণশুনানি আমরাই আয়োজন করেছি। সংকটটা হলো আমাদের শক্তির ভারসাম্যে। আমরা সবসময় আমাদের নিজস্ব নীতিতে অটল ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী হিসেবে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললে আওয়ামীপন্থি সমর্থকরা খুশি হতো, আবার গণতন্ত্রের কথা বললে বিএনপি সমর্থকরা খুশি হতো। কিন্তু আমরা দুইয়ের সমন্বয়ে আমাদের নিজস্ব পথে চলার চেষ্টা করেছি। অতীত থেকে প্রাপ্ত কিছু ভুল ধারণা মানুষের মনে আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, তবে ৯০-পরবর্তী সময়ে সিপিবি দৃঢ়ভাবে নিজস্ব অবস্থান বজায় রেখেছে।
এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল যার বড় ইতিহাস আছে, কিন্তু তারা যে ধরনের হত্যাকাণ্ড ও স্বৈরাচারী শাসন চালিয়েছে, তাতে তারা কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবে তা আমার কাছে অস্পষ্ট। আমরা কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই, কিন্তু তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষের কাছে তারা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটিই বড় প্রশ্ন। তবে শাসকরা যদি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয় বা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হয়, তবেই সেই শূন্যস্থান অন্য কেউ পূরণ করতে পারে। আমরা যদি একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠন করতে পারি, তবে স্বৈরাচারী কোনো শক্তির ফেরার সুযোগ থাকবে না।
এশিয়া পোস্ট: দেশবাসীর উদ্দেশে আপনি কিছু বলতে চান কি না?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আমি শুধু বলব, মানুষ এবং প্রকৃতির মুক্তির জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করতে হবে। আমরা যদি নিজের স্বার্থের চেয়ে সমষ্টির স্বার্থকে বড় করে দেখি, তবে ছোট ছোট অবদানও বাংলাদেশের জন্য বড় রক্ষাকবচ হতে পারে। আসুন আমরা সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সাহস অর্জন করি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য কাজ করি।




