আলজাজিরার কলাম/ঈশ্বরের নাম ভাঙিয়ে ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থন দিতে নারাজ খ্রিষ্টানরা

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী খ্রিষ্টান লবিং গ্রুপ হলো ‘খ্রিষ্টানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’ (সিইউএফআই)। ওয়াশিংটনে তাদের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন শেষ হয়েছে গত মঙ্গলবার। সেখানকার নানা আলোচনা ও ভাষণের মূল বিষয় ছিল ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থন অব্যাহত রাখা। এর সপক্ষে তারা ‘ঈশ্বরের মনোনীতদের আশীর্বাদ করার বাইবেলীয় আদেশের’ দোহাই দিয়েছে।
সমস্যাটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো নীতির পক্ষে লবিং করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সিইউএফআইসহ অন্যান্য খ্রিষ্টান জায়নবাদী সংগঠনগুলো ইসরায়েলকে সমর্থনের বিষয়টিকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করেছে।
পশ্চিম তীরে জন্মগ্রহণকারী একজন ফিলিস্তিনি-মার্কিন খ্রিষ্টান হিসেবে আমি মনে করি, এই দাবি কেবল রাজনৈতিকভাবেই বিপজ্জনক নয়; ধর্মতাত্ত্বিকভাবেও বিকৃত ও বেপরোয়া।
কোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে যখন ঐশ্বরিক আদেশ ধরে নেওয়া হয়, তখন সাধারণ নৈতিক যাচাই-বাছাইও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সামরিক সহায়তা, বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় গণহত্যা বা ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণের মতো বিষয়গুলো তখন আর সাধারণ নীতিগত বিতর্কের পর্যায়ে থাকে না। সিইউএফআইয়ের কাঠামোতে এগুলোকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতে পারে।
সিইউএফআই সব খ্রিষ্টানের প্রতিনিধিত্ব করে না। বিভিন্ন মতাদর্শের অনেক খ্রিষ্টানই তাদের এই চরমপন্থী অবস্থানের বিরোধিতা করেন। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে খ্রিষ্টানদের ইহুদিদের ভালোবাসা উচিত কি না, সেটি কোনো প্রশ্ন নয়। খ্রিষ্টানদের তো সব মানুষকেই ভালোবাসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে ইহুদিদের ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে হবে। এর মানে কোনো সরকার বা তাদের নীতিগুলোর পক্ষে সাফাই গাওয়া নয়। যেসব নীতি ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের ভূমিচ্যুত করেছে, চলাফেরায় বাধা দিয়েছে এবং খ্রিষ্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলেছে, সেসবের পক্ষে কিছুতেই সাফাই গাওয়া যায় না।
সিইউএফআইয়ের যুক্তির প্রধান গলদ হলো, তারা ইহুদি জনগণ, বাইবেলে উল্লিখিত ইসরায়েল, আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং বর্তমান ইসরায়েল সরকারকে একই অবিচ্ছেদ্য সত্তা বিবেচনা করে। অথচ এগুলো মোটেও এক নয়।
ইহুদিরা হলো একটি জাতি। আর আধুনিক ইসরায়েল হলো ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্র। এর নির্দিষ্ট সীমানা, নির্বাচনব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল ও সামরিক শক্তি রয়েছে। এর সরকার হলো একটি অস্থায়ী রাজনৈতিক জোট। এই সরকারের নীতিগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব এবং তা অবশ্যই করা উচিত।
এসব কিছুকে বাইবেলের প্রতি আনুগত্য হিসেবে বিবেচনা করা মোটেও কোনো ভক্তি নয়; এটি মূলত একধরনের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব। খ্রিষ্টানেরা যদি বিশ্বাসও করেন যে ঈশ্বরের পরিকল্পনায় ইহুদিদের একটি অনন্য স্থান রয়েছে, তবুও সেই বিশ্বাস কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা সামরিক অভিযানকে নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।
ইভানজেলিক্যাল গণ্ডির বাইরের পাঠকদের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লাগতেই পারে—প্রাচীন বাইবেলের বাণী কীভাবে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের প্রতি মার্কিন নীতি নির্ধারণ করতে পারে!
তবে খ্রিষ্টান জায়নবাদী ধর্মতত্ত্ব আব্রাহাম ও ইসরায়েলের প্রতি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতিকে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থনের এক চলমান আদেশ হিসেবে পাঠ করে থাকে। প্রায়ই বুক অব জেনেসিসের ১২ নম্বর অধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘যারা তোমাকে আশীর্বাদ করবে, আমি তাদের আশীর্বাদ করব।’
তবে বাইবেলের বিস্তৃত বর্ণনায়, আব্রাহামকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কখনোই রাষ্ট্রের যেকোনো অপরাধের জন্য পার পাওয়ার ছাড়পত্র ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা যে ‘পৃথিবীর সব পরিবার’ আশীর্বাদপুষ্ট হবে। নবীরা কখনোই অবিচারকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলকে আশীর্বাদ করেননি। তারা ইসরায়েলকে এতটাই ভালোবাসতেন যে এর দুরাচারী রাজাদের মুখোমুখি হতেও পিছপা হননি। তারা অসহায়দের রক্ষা করেছেন এবং সহিংসতা, অহংকার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
যিশু তার অনুসারীদের কোনো নির্দিষ্ট জাতিকে পবিত্র হিসেবে মানতে শেখাননি। বরং তিনি তাদের প্রতিবেশীদের ভালোবাসতে, শত্রুদের আশীর্বাদ করতে এবং শান্তিস্থাপনকারী হতে বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের খ্রিষ্টানেরা এখন ধীরে ধীরে চোখ খুলছেন। তারা খ্রিষ্টান জায়নবাদীদের ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক যুক্তির গলদগুলো বুঝতে পারছেন।
গত এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপ প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। জরিপে অংশ নেওয়া খ্রিষ্টানদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ৬১ শতাংশ ক্যাথলিক ইসরায়েলের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক মতামতের কথা জানিয়েছেন।
শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যালরা এখনো ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমর্থক। তবে তাদের মধ্যেও এখন হাওয়া বদলাচ্ছে। ওই জরিপেই দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন; ২০২৫ সালে যা ছিল ২৬ শতাংশ। আমি নিজের চোখেই এই নীরব পরিবর্তন দেখেছি।
সবচেয়ে সোচ্চার ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো এখনো দাবি করতে পারে যে তারা সব ‘বাইবেলে বিশ্বাসী খ্রিষ্টানের’ হয়ে কথা বলছে। তবে আমি এমন অনেক ইভানজেলিক্যালের দেখা পেয়েছি, যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রশ্ন নিয়ে লড়াই করছেন। তারা ভাবছেন, ইসরায়েলকে সমর্থনের বিষয়টি পবিত্র ধর্মগ্রন্থের প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে কি না।
গত ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য টাকার কার্লসন শো’-তে উপস্থিত হওয়ার পর আমি এই সন্দেহের ঢেউ লক্ষ করেছি। অনেক ইভানজেলিক্যাল যাজক ও নেতা গভীর দুঃখ নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তারা জানান, একজন ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান কীভাবে তাদের নিজেদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করেন, তা তারা আগে কখনো শোনেননি। বেথলেহেম, বেইত সাহুর, জেরুজালেম, তাইবেহ ও গাজায় বসবাসরত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলোর কাছে দখলদারি, বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন অপমানের অর্থ যে কী, তা তারা প্রথমবার জানতে পেরেছেন।
ফিনিক্সে আয়োজিত খ্রিষ্টান যুব সম্মেলন ‘আরবানা ২৫’-এ আমি ভিন্ন ধরনের এক আশা দেখেছি। সেখানে সাত হাজার শিক্ষার্থী ও নেতা জড়ো হয়েছিলেন। আমি ‘জিউস ফর জেসাস’-এর প্রধান নির্বাহী অ্যারন আব্রামসনের সঙ্গে একই মঞ্চে কথা বলেছি। আমরা দেখিয়েছি, খ্রিষ্টানদের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতার প্রয়োজন নেই। আমরা একে অপরের কষ্ট বুঝতে পারি এবং একসঙ্গে মিলে যেকোনো অবিচারকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি।
এরপর অনেক শিক্ষার্থী লাইনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানান। তারা নতুন কোনো শত্রু খুঁজছিলেন না; তারা শুধু সত্য বলার জন্য আরও বিশ্বাসযোগ্য একটি উপায় খুঁজছিলেন।
ইভানজেলিক্যালদের নতুন প্রজন্ম ঠিক এটাই পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তারা এমন এক বিশ্বাস খুঁজছে, যা ইহুদিদের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনিদের মর্যাদার মধ্যে কোনো মিথ্যা বিভাজন তৈরি করে না।
খ্রিষ্টানেরা মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষকে প্রশ্রয় না দিয়েই ইহুদিবিদ্বেষের তীব্র বিরোধিতা করতে পারেন। তারা গাজার ধ্বংসযজ্ঞকে বৈধতা না দিয়েও ৭ অক্টোবরের ভয়াবহতা নিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারেন। তারা ফিলিস্তিনিদের কষ্ট কেবল ৭ অক্টোবর শুরু হয়েছে এমন ভান না করেও সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আর তারা ফিলিস্তিনিদের চিরস্থায়ী ভূমিচ্যুতির বিষয়টিকে সমর্থন না করেও ইসরায়েলি নিরাপত্তার বিষয়ে যত্নবান হতে পারেন।
এই বিষয়গুলো বিতর্কমূলক হওয়ার কথা নয়। এগুলো কেবল তখনই বিতর্কিত হয়ে ওঠে, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা হাসিলের জন্য ধর্মতত্ত্বকে বিকৃত করা হয়।
ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের কাছে এই ধর্মতাত্ত্বিক বিকৃতির মাশুল কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী খ্রিষ্টানদের হত্যা করেছে এবং গির্জাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে বহু ঐতিহাসিক সম্প্রদায় আজ বাস্তুচ্যুত এবং স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান। পশ্চিম তীরে গির্জার নেতারা বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এদিকে রসিং সেন্টার ২০২৫ সালে পুণ্যভূমিতে খ্রিষ্টান এবং খ্রিষ্টানদের সম্পত্তির ওপর ১৫৫টি সহিংস ঘটনার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে।
এ কারণেই আমি অনেক ইভানজেলিক্যালকে বলতে শুনেছি, ইসরায়েলের কাজগুলোর সাফাই গাইতে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে ব্যবহার করার বিষয়টি নিয়ে তারা ক্রমেই অস্বস্তিবোধ করছেন। তারা ইহুদিদের পরিত্যাগ করেননি; তারা শুধু তাদের বিশ্বাসকে এমন কোনো নীতির পবিত্রতা প্রমাণের কাজে ব্যবহার হতে দিতে নারাজ, যা তাদের প্রতিবেশীদের ক্ষতি করে।
যে ভূমিতে গির্জার জন্ম, সেখানেই গির্জাকে স্তব্ধ করে দিতে তারা রাজি নন। বাইবেলের আসল আদেশ কোনো পতাকা বা সেনাবাহিনীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। এর আসল অর্থ হলো সত্য বলা, ক্ষমা করা এবং শান্তি স্থাপন করা পক্ষপাতহীন ভালোবাসা। ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যকে মানুষের অপরাধের দায়মুক্তির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা।
খ্রিষ্টানেরা যদি পুণ্যভূমির মানুষকে আশীর্বাদ করতে চান, তবে তাদের সব ধরনের অবিচারের বিরোধিতা করতে হবে। আর তারা যদি সেখানকার গির্জাকে আশীর্বাদ করতে চান, তবে সেটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাদের কথা শুনতে হবে।
লেখক: ফিলিস্তিনি-মার্কিন যাজক ও সমাজকর্মী। ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি ফ্লোরিডাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘লেভান্ট মিনিস্ট্রিজে’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট।




