‘নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনে ঘুষের বাণিজ্য বন্ধ করব’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনে ঘুষের বাণিজ্য বন্ধ করব’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। একসময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি জামায়াতের পক্ষ থেকে তাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘আলাপনে’ এসেছিলেন অতিথি হয়ে। কথা বলেছেন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি, ঢাকার নগর সমস্যা এবং সমসাময়িক জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনীতির শুরুর গল্প জানতে চাই। একসময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আপনার পথচলা কীভাবে শুরু হয়েছিল? শুরুর ধাপগুলো কেমন ছিল?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তখন আমাদের এলাকার কিছু বড় ভাই আমাকে ডাকতেন এবং পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতেন। তারা খুব সুন্দর ও ভালো কথা বলতেন, যা আমার কাছে জাদুর মতো মনে হতো। তাদের ব্যবহার ও আচরণে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। কোনো এক অজান্তেই তাদের সেই ভালো আচরণে মুগ্ধ হয়ে আমি ছাত্রশিবিরে যোগদান করি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্রশিবির আমার জীবনের মোড় পরিবর্তনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

ছাত্রশিবির মানেই একটি সুশৃঙ্খল জীবন। সেখানে ফজরের আগেই ঘুম থেকে ওঠা, সম্ভব হলে তাহাজ্জুদ পড়া এবং মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। নামাজ শেষে কোরআন ও হাদিস অধ্যয়ন, নিয়মিত সাহিত্য পাঠ এবং আত্মগঠনের চর্চা থাকে।

ছাত্রজীবনে পড়ালেখা শেষে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা হলেও সেটি ছিল অত্যন্ত গঠনমূলক। একে অপরের খোঁজ নেওয়া, পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা করা—এসবই ছিল সেই আড্ডার অংশ। শিবির আমার জীবনকে হাতে ধরে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, যেটাকে আমি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত মনে করি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ডিএনসিসির মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। একই সঙ্গে মহানগর উত্তরের আমিরের দায়িত্বও পালন করছেন। নির্বাচন ও সাংগঠনিক কাজ মিলিয়ে আপনার ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: ব্যস্ততা মূলত মানুষের জীবনের একটি ইতিবাচক দিক। ব্যস্ত থাকার মধ্যেই কল্যাণ খুঁজি। আমরা যারা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করি, আমাদের রাজনীতি অত্যন্ত গঠনমূলক। আমাদের কাজের পরিধি অনেক বড়। বাইরে যা দেখা যায়, বাস্তবে কাজ এর চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি। এসব কাজের সবকিছু মিডিয়ায় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের অনেক অভ্যন্তরীণ কাজ থাকে। যেমন—নিজেদের নৈতিক ও আদর্শিক পরিচর্চা, গভীর অধ্যয়ন, অন্যকে বই পড়ানো এবং নানাবিধ মানবসেবা। বর্তমানে একদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন, সামনে নির্বাচন ঘিরে নতুন কর্মপরিকল্পনা, আবার ১১ দলীয় জোটের মাঠের কর্মসূচি, সব মিলিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রশিবিরে কর্মী, সাথি ও সদস্য হওয়ার বিভিন্ন ধাপ এবং নির্দিষ্ট সিলেবাস সম্পর্কে যদি বিস্তারিত বলতেন।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: ছাত্রশিবিরকে আপনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে পারেন, যেখানে প্লে থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যারা নতুন সমর্থক, তারা কোন বইগুলো পড়লে দেশ, দুনিয়া, ইসলাম ও মানবতা বুঝতে পারবে, তার একটি প্রাথমিক তালিকা থাকে।

এরপর ‘কর্মী’ পর্যায়ের সিলেবাসে কোরআন-হাদিসের নির্দিষ্ট অংশ এবং সমাজ ও বিশ্ব সম্পর্কে জানার জন্য হিন্দু লেখকসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি লেখকের সাহিত্য পড়তে হয়। ‘সাথি’ হওয়ার ধাপটি অনেকটা হাইস্কুল লেভেলের মতো। সেখানে সিলেবাস আরও আপগ্রেডেড হয় এবং বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হয়। এ জন্য রিটেন ও ভাইভা পরীক্ষা দিতে হয়।

সবশেষে ‘সদস্য’ হওয়ার জন্য অর্থসহ পুরো কোরআন অধ্যয়ন করতে হয়। এর বাইরে রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস এবং বিভিন্ন মনীষীর জীবনী সম্পর্কে গভীর জ্ঞানার্জন করতে হয়। কেউ যদি মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না-ও যায়, শিবিরের এই সিলেবাস তাকে একজন সচেতন ও যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের সংগঠনে ধূমপানসহ নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিষয়ে যে কঠোর শৃঙ্খলার কথা শোনা যায়, সেটি আপনারা কীভাবে নিশ্চিত করেন?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমাদের সংগঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করে। আমাদের এখানে মাদকের তো প্রশ্নই আসে না, এমনকি কেউ সিগারেট পর্যন্ত পান করে না। এটি নিশ্চিত করার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ ও খোঁজখবর নেওয়ার একটি পদ্ধতি রয়েছে। কার সঙ্গে চলাফেরা করছি, পরিবেশ কেমন, এগুলো দায়িত্বশীলরা পর্যবেক্ষণ করেন। কারও ব্যক্তিগত অভ্যাস গোপন থাকে না। তবে আমাদের সংগঠনের ভেতরের পরিবেশটাই এমন যে, সেখানে কেউ সিগারেট খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না।

এশিয়া পোস্ট: নতুন ছাত্ররা কীভাবে শিবিরে যুক্ত হয়? আর যে শপথের কথা বলা হয়, সেখানে আসলে কী ওয়াদা করা হয়?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমরা যখন সাধারণ সভা, চায়ের আড্ডা বা নবীনবরণ করি, তখন আমাদের বক্তব্য শুনে অনেক ছাত্র কনভিন্স হয়ে তাৎক্ষণিক বা পরে শিবিরে যোগ দেয়। আমাদের দায়িত্বশীলরা হোস্টেল ও বাড়ি বাড়ি গিয়েও কাজ করেন। শপথের বিষয়টি হলো, আল্লাহর নামে একটি ওয়াদা নেওয়া যে, আমি আল্লাহ ও কোরআনের পথে চলব, হারাম জিনিস থেকে দূরে থাকব এবং মা-বাবার যত্ন করব। এই ক্যারেক্টারগুলো মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কেউ যদি এই স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করতে না পারে, তাহলে সে নিজে ইস্তফা দিতে পারে, অথবা সংগঠন তাকে বাদ দিয়ে দেয়।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ২০০৪ থেকে পাঁচ সেশনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। নিজের সেই সময়কার দায়িত্ব পালনকে আপনি কতটা সফল মনে করেন?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: নিজের সফলতার কথা নিজে বলা কঠিন। তবে এটুকু বলতে পারি, কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দ্বীন, দেশ এবং ছাত্রসমাজের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে ইসলাম ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিনসিয়ারলি কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমার সহকর্মীরাই হয়তো ভালো বলতে পারবেন, আমি কতটা সফল হয়েছি। তবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করিনি।

এশিয়া পোস্ট: অনেকে বলেন, ছাত্রশিবির আধুনিক হলেও জামায়াত এখনও পুরোপুরি আধুনিকতা বোঝে না। আপনি কী মনে করেন? বিশেষ করে শিবির থেকে আসা নেতৃত্ব জামায়াতে কী পরিবর্তন আনছে?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: জামায়াত ও শিবিরের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। শিবির শুধু ছাত্রদের নিয়ে কাজ করে, আর জামায়াত বস্তিবাসী থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণি পর্যন্ত বিশাল পরিসরে কাজ করে। একসময় জামায়াতে প্রশিক্ষিত লোকের অভাব থাকলেও এখন শিবিরের সাবেক নেতারাই সারা দেশে জামায়াতের নেতৃত্বে আছেন। ফলে এখানে আধুনিকতা বা চিন্তার কোনো পার্থক্য নেই। পুরো জামায়াত এখন শিবির থেকে আসা লোকেরাই পরিচালনা করছে। গত কয়েক মাসে ঢাকা সিটিতে জামায়াত যে ধরনের সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী কাজ করেছে, তা দেখলেই বোঝা যায়, জামায়াত কতটা আধুনিক ও সময়োপযোগী চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: যারা ছাত্রজীবন শেষ করে জামায়াতে আসছেন না, তাদের বিষয়ে আপনাদের ভূমিকা কী? আর জামায়াতে যোগ দিলে দায়িত্ব বা পদের প্রক্রিয়া কেমন হয়?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমরা নিয়মিত খোঁজ নিই, প্রতি বছর কতজন শিবির থেকে বিদায় নিচ্ছে। এমনকি ২০ বছর আগে যারা বিদায় নিয়েছেন, তাদেরও খুঁজে বের করে কাজ দেওয়ার চেষ্টা করি। বৃহত্তর জীবনে আসার পর চাকরি বা পারিবারিক কারণে অনেকের মধ্যে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। তবে আমরা তাদের অধিকাংশকেই আবার যুক্ত করি। জামায়াতে আসার পর পদের চেয়ে কাজের গুরুত্ব বেশি। এখানে দাওয়াতি কাজ, সমাজসেবা কিংবা সাধারণ মানুষকে কোরআনের তালিম দেওয়া, সবই দায়িত্ব। আমাদের দর্শনে প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। তাই এখানে কারও বেকার থাকার সুযোগ নেই।

এশিয়া পোস্ট: গত ১৭ বছর রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে আপনি ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: গত ১৭ বছর প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলাম। এখন যেখানে ৩০০ লোককে নিয়ে এক জায়গায় মিটিং করতে পারি, তখন সেই ৩০০ জনের সঙ্গে কথা বলতে আমাদের ৩০টি আলাদা জায়গায় যেতে হতো। প্রশাসন সবসময় আমাদের পেছনে লেগে থাকত। কিন্তু আমরা আধুনিক কলাকৌশল ও নিজস্ব ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাংগঠনিক কাজ অব্যাহত রেখেছি। কোভিডের সময়ও জুমের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম চালিয়েছি। আমাদের প্রবীণ নেতারাও দ্রুত এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন।

এশিয়া পোস্ট: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: জুলাই আন্দোলনে আমাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। আমাদের আমির ছয় সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। শিবিরের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা প্রতিদিন ফজরের পর বসে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতাম এবং নির্দেশনা দিতাম।

ব্যক্তিগতভাবে আমাকে প্রশাসন অনেক খুঁজেছে। এমনকি আমাদের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারকে গ্রেপ্তার করে আমার বাসা চিনিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি বা তার স্ত্রী কোনো তথ্য দেননি।

উত্তর এলাকায় সবচেয়ে বেশি আন্দোলনের স্পট থাকায় আমি তাদের মূল টার্গেট ছিলাম। ১৭ জুলাই আমাদের আমির ওমরাহ থেকে ফিরে আসেন। ১৮ জুলাই একটি মিটিং রাখলেন। যখন গোয়েন্দারা মিটিংয়ের জায়গা কর্ডন করে ফেলল, তখন রাত ১২টায় আমির আমার বাসায় চলে এলেন। এরপর রাত ১টায় আমাকে নিয়ে মিটিং করলেন। সেখানে তিনি নির্দেশ দিলেন, শহীদ ও আহতদের দলীয় পরিচয় না দেখে শুধু আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের সময় আহত ও শহীদদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আপনাদের কার্যক্রম কেমন ছিল?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমিরের নির্দেশে আমরা উত্তরার প্রতিটি হাসপাতালে গিয়েছি। শহীদ পরিবারগুলোকে প্রথমে এক লাখ, পরে দুই লাখ টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছি। আহতদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যয় আমরা বহন করেছি। এমনকি যখন পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা আহতদের পানি দিতে বাধা দিচ্ছিল, তখন আমাদের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দাফন-কাফনের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আহতদের পরিচর্যা, সবই আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করেছি। মাঠে আমাদের ভাইয়েরা লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছেন, ছাত্রদের খাবার ও পানি পৌঁছে দিয়েছেন।

এশিয়া পোস্ট: ১ আগস্ট জামায়াত ও ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করার পর আপনাদের সিদ্ধান্ত কী ছিল?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: যখন আমাদের নিষিদ্ধ করা হলো, তখন আমরা জুম মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, সর্বশক্তি দিয়ে রাজপথে থাকতে হবে এবং আমরা এই নিষেধাজ্ঞা মানি না। হাসিনার এই সিদ্ধান্তটি ছিল অপরিণামদর্শী। ২ আগস্ট বায়তুল মোকাররম থেকে আমরা নজিরবিহীন মিছিল করেছি। ৩ আগস্ট ছাত্ররা যখন গণভবন ঘেরাও করতে চাইল, তখন আমরা তাদের পরামর্শ দিই, এটি বিপজ্জনক হতে পারে। এর পরিবর্তে ৫ বা ৬ আগস্ট ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচির প্রস্তাব দিই। আমরাই কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন।

এশিয়া পোস্ট: ৭১-এর ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ বারবার তোলা হয়, নতুন প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: ৭১-এর প্রসঙ্গটি একটি রাজনৈতিক অপকৌশল। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। জামায়াতের নেতারা পাকিস্তান ভাঙার বিপক্ষে ছিলেন একটি আশঙ্কা থেকে। তারা ভেবেছিলেন, পিন্ডি থেকে মুক্ত হয়ে আমরা দিল্লির দাসে পরিণত হবো। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, তা আদালতে প্রমাণিত হয়নি। এ টি এম আজহারুল ইসলাম সাহেবের মামলার রায়ও পরবর্তীতে আদালত বাতিল করেছে। নতুন প্রজন্ম এখন সব বোঝে। আওয়ামী লীগ নিজেই রাজাকারের যে তালিকা করেছিল, সেখানে তাদেরই নেতাদের নাম ছিল। তাই ৭১-এর দোহাই দিয়ে বিভাজন তৈরির সুযোগ আর নেই। ২৪-এর আন্দোলনও হয়েছে ৭১-এর লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য।

এশিয়া পোস্ট: তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা জামায়াতের আমিরদের দীর্ঘদিন পদে থাকা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সে ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমাদের এখানে দুই বছর পরপর গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হয় এবং ডেমোক্র্যাটিক প্রসেসে নেতা নির্বাচিত হন। এখানে টিম স্পিরিট আছে। একসময় লিডারশিপ ক্রাইসিসের কারণে কেউ দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকলেও এখন সেটি কমে আসছে। পদ নিয়ে আমাদের এখানে কোনো মারামারি নেই। এটি একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেমের মধ্য দিয়ে চলে।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াত কি এখন জনপ্রিয়তার রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: জামায়াতের রাজনীতি সবসময় জনকল্যাণমুখী। জনকল্যাণ যেখানে আছে, সেখানে জনপ্রিয়তাও চলে আসে। আমরা সেবা দিয়ে মানুষের দোয়া পেতে চাই। ইসলামের সৌন্দর্যই হলো মানুষের সেবায় পাশে দাঁড়ানো।

এশিয়া পোস্ট: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম এবং বিএনপির সঙ্গে আপনাদের বর্তমান সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে কিছু লোক ইউনূস সরকারকে মিসগাইড করার চেষ্টা করেছে। আমরা গণভোটের দাবি করেছিলাম। কিন্তু বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, তা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অশ্রদ্ধা জানানোর শামিল। পৃথিবীর কোনো দেশে গণভোটের রায়কে এভাবে উপেক্ষা করার দৃষ্টান্ত নেই। বিএনপির সঙ্গে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। তারা সরকারি দল হিসেবে কাজ করছে, আমরা বিরোধী দল। তারা ভালো কাজ করলে আমরা সমর্থন দেব, আর জনস্বার্থবিরোধী কাজ করলে প্রতিবাদ করব।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং এয়ানতের স্বচ্ছতা নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: ইসলামী ব্যাংক বা ইবনে সিনা জামায়াতের সরাসরি প্রতিষ্ঠান নয়। আর জামায়াতের নিজস্ব তহবিলের ক্ষেত্রে আমরা প্রফেশনাল অডিটর নিয়োগ করি। বছরে দুই থেকে তিনবার অডিট হয় এবং সংশ্লিষ্ট বডিতে সেই রিপোর্ট পেশ করা হয়। জামায়াতই সম্ভবত একমাত্র দল, যেখানে কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কঠোর আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়।

এশিয়া পোস্ট: ডিএনসিসির মেয়র প্রার্থী হিসেবে আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো কী?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে সিটি করপোরেশনকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করা এবং ঘুষের বাণিজ্য বন্ধ করা। সেবাগুলোকে একটি সমন্বিত অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসব। জলাবদ্ধতা নিরসনে মরা খাল ও জলাশয় উদ্ধার করে হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে পরিচালনার মাধ্যমে আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। যানজট নিরসনে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু এবং বড় মার্কেটগুলোতে আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওভারগ্রাউন্ড পার্কিং টার্মিনালের ব্যবস্থা করব। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ রোধে মেকানিক্যাল সুইপিং এবং হর্ন নিয়ন্ত্রণের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্জ্যের রিসাইকেল করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য তৈরির পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: আপনি তরুণদের জন্য বিশেষ কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমি ইতোমধ্যেই ‘নাগরিকবা ডট নেট’ (NagorikBa.net) নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছি। এখানে নাগরিকরা রেজিস্ট্রেশন করে ফিজিওথেরাপিস্ট, অ্যাম্বুলেন্স বা কারিগরি সেবার জন্য যোগাযোগ করলে আমাদের কুইক রেসপন্স টিম দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। নির্বাচিত হলে তরুণদের জন্য ‘মেয়র স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার’ এবং ‘করজে হাসানা ফান্ড’ (বিনা সুদে ঋণ) চালু করব। আমরা তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে মেন্টরশিপ দেব এবং প্রতি মাসে তাদের নিয়ে টাউন হল মিটিং করব।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের অনেক আগেই জামায়াত কেন প্রার্থী ঘোষণা করে দেয়? প্রচারণায় ছবির ব্যবহার নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করার ফলে প্রার্থীরা জনগণের সঙ্গে মেশার এবং তাদের সমস্যাগুলো জানার সুযোগ পান। এটি শুধু ভোট নয়, জনগণের দুর্ভোগ শোনারও একটি মাধ্যম। আর প্রচারণায় ছবির ব্যবহার একটি আধুনিক প্রয়োজন। ভোটারদের অধিকার আছে, তারা কাকে ভোট দিচ্ছেন, তাকে চেনার এবং জানার। ছবি ছাড়া মানুষকে চেনানোর আর কোনো সহজ মাধ্যম নেই।

এশিয়া পোস্ট: সরকারি দলে অন্য কেউ থাকলে বরাদ্দ বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো সংকট তৈরি হবে?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: এমপির একটি নির্দিষ্ট ফান্ড থাকে, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। বরং সরকারি দলের কেউ মেয়র হলে দুর্নীতির সম্ভাবনা বেশি থাকে। জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে সততার সঙ্গে সেই ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবেন এবং উন্নয়নের সুষম বণ্টন হবে।

এশিয়া পোস্ট: আগামী নির্বাচন নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আমি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বাস রাখতে চাই। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি। আমরা একটি আধুনিক ও নিরাপদ ঢাকা উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: আপনাদেরও ধন্যবাদ। জনগণের কাছে আমাদের কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সবাই ভালো থাকুন।