আলজাজিরার কলাম/ইসরায়েলের বিচার প্রসঙ্গে কেন ‘ঐকমত্যের’ দোহাই দিচ্ছে ইউরোপ

তামাম আবুসালামা
ইসরায়েলের বিচার প্রসঙ্গে কেন ‘ঐকমত্যের’ দোহাই দিচ্ছে ইউরোপ
ইইউ এবং ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১৩ জুলাই ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আবার বৈঠকে বসছেন। আলোচনার মূল বিষয় হলো গাজা ও পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি।

বৈঠকে ইসরায়েলের অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্য, ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন এগ্রিমেন্ট এবং ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা হতে পারে। এছাড়া অবৈধ বসতির পণ্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে কেবল ‘সীমিত’ করার একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আগের অভিজ্ঞতা বলে, এই বৈঠক থেকেও বিশেষ কিছু পাওয়ার নেই। বরাবরের মতো এবারও হয়তো সিদ্ধান্তহীনতা আর অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হবে।

ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে বড় অজুহাত হবে ‘ঐকমত্যের অভাব’। মূলত নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা ঢাকতে ইইউ এই শব্দটি ব্যবহার করে।

জার্মানি ও ইতালি বারবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা দিচ্ছে। পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্রও তাদের সমর্থন দিচ্ছে।

অন্যান্য দেশগুলো সাহসী পদক্ষেপ না নিয়ে ইইউ’র ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। ইউরোপীয় দেশগুলো মুখে আন্তর্জাতিক আইনের কথা বললেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করে না।

এই লুকোচুরি এখন আর ধোপে টিকছে না। ২০১৭ সালের একটি ফাঁস হওয়া আইনি নথি বলছে, ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি স্থগিত করার যথেষ্ট আইনি ভিত্তি ইইউর কাছে আগে ছিল।

এক তদন্তে দেখা গেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরে ইইউ’র অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ১৫ কোটি ইউরো (১৭ কোটি ২০ লাখ ডলার) মূল্যের অবকাঠামো ধ্বংস করেছে ইসরায়েল। অথচ এর কোনো বিচার হয়নি। এমনকি অবৈধ বসতির পণ্যগুলো এখনও মিথ্যা লেবেল দিয়ে ইউরোপের বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুনে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা ‘গণহত্যা’ ও ‘যুদ্ধাপরাধের’ শামিল।

সম্প্রতি ইইউ’র পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসকে নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে। এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘বর্ণবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এতে ইসরায়েল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমকি দেন, কালাস ওই বক্তব্য প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন থাকবে। ইউরোপীয় কমিশন তখন তাকে সমর্থন না দিয়ে উল্টো ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছে, তাদের সম্পর্ক আগের মতোই অটুট থাকবে।

ব্রাসেলসের এই আচরণ প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইইউ’র ওপর চাপ সৃষ্টি করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জবাবদিহি শুধু ব্রাসেলসের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেও তাদের দায়বদ্ধতা নিতে হবে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) স্পষ্ট জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অবৈধ। এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের লঙ্ঘন। আদালত আরও বলেছে, বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র আইনিভাবে বাধ্য যেন তারা এই অবৈধ দখলদারিত্বকে কোনো সহায়তা না করে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলো চাইলে একাই অনেক কিছু করতে পারে। এর জন্য পুরো ইইউ’র ঐকমত্যের প্রয়োজন নেই। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বন্ধ করতে পারে। তারা চাইলে ইসরায়েলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারে।

এছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসরায়েলি অপরাধীদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা প্রতিটি দেশের রয়েছে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলো চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যা মামলায় সরাসরি অংশ নিতে পারে।

গত আড়াই বছর ধরে ইইউ এবং এর সদস্য দেশগুলো কেবল অজুহাত খুঁজেছে। ২০২৬ সালের শেষার্ধে আয়ারল্যান্ড ইইউ’র সভাপতিত্ব করছে।

আয়ারল্যান্ডের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে তাদের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে বাস্তবে রূপান্তর করার। আইনি সরঞ্জামের কোনো অভাব নেই, অভাব কেবল সদিচ্ছার। সদস্য রাষ্ট্রগুলো কি ব্রাসেলসের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করবে? নাকি নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাহসী পদক্ষেপ নেবে? সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


আলজাজিরা থেকে অনূদিত

লেখক: তামাম আবুসালামা একজন ফিলিস্তিনি-বেলজিয়ান অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন বিশেষজ্ঞ। তিনি বর্তমানে ইউরোপীয় নাগরিকদের উদ্যোগ ‘জাস্টিস ফর ফিলিস্তিন’-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।