সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে দোকান-পার্ক বানালেন ইউপি চেয়ারম্যান

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর (গ্রেনেড বাবু) বিরুদ্ধে ১৫ কোটি টাকা মূলের সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে দোকান, হোটেল ও ব্যক্তিগত কার্যালয় নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারি হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে একটি খাস পুকুর ভরাট করে তিনি গড়ে তুলেছেন মিনি পার্ক ও কবুতরের খামার।
উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জ বাজারের খাস খতিয়ানের দাগ থেকে মোট ৪০ শতাংশ সরকারি জমি দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রধান সড়কের পাশের খাস জমি এবং ভেতরের পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ব্যক্তিগত অবকাঠামো।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুকুর ভরাট করায় বাজারে যেমন স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তেমনি হাটের জায়গা বেদখল হওয়ায় এবার ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি কেউ ইজারা নেয়নি। ফলে একদিকে ক্রেতা-বিক্রেতারা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
কিশোরগঞ্জ হাটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাজারের প্রধান সমস্যা পানি নিষ্কাশনের যে রাস্তাটি রয়েছে, সেটি দখল হয়ে যাওয়ায় পানি যাওয়ার রাস্তা নেই। এর ফলে একটু বৃষ্টি হলেই বাজারে পানি ওঠে। কাস্টমার আসতে পারে না, আমরাও রাস্তায় নামতে পারি না। আমরা এর একটা সমাধান চাই।

কিশোরগঞ্জ বাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, ‘এই খাস খতিয়ানে যে অবৈধ স্থাপনাগুলো রয়েছে, সেগুলো উচ্ছেদ করা সময়ের দাবি। আমাদের কিশোরগঞ্জ বাজার কাস্টমারশূন্য হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে কোনো কাস্টমার আসছে না। এর কারণ অবকাঠামোগত সমস্যা ও জায়গার সংকট। আরেকটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে, একটু বৃষ্টি হলেই বাজারে পানি জমে যায়। পানি যাওয়ার যে রাস্তাটি, সেটিও দখল করে আছে দখলদাররা। একটি পুকুর ছিল, যেখানে বাজারের অনেক পানি গিয়ে পড়ত। সেটিও আমাদের চেয়ারম্যান সাহেবের দখলে। আমি তাকে অনুরোধ করব, তিনি যেন দখল করা জায়গাগুলো দ্রুত ছেড়ে দেন।’
শুধু খাস জমিই নয়, ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব জমিতেও অবৈধভাবে চারটি দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে এই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিটি দোকান বরাদ্দের নামে আড়াই লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জামানত নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিটি দোকান থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করা হলেও খোদ ইউপি সচিবই জানিয়েছেন, তার কোনো হিসাব পরিষদের সরকারি তহবিলে নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। যার ফলে নিরাপত্তার ভয়ে সাধারণ মানুষ এত দিন মুখ খোলেননি। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টালেও এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গরুর হাটে মাটি ভরাট ও গাইড ওয়াল নির্মাণের নামে তিনটি প্রকল্পে মোট ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, এই অর্থ হাটের উন্নয়নে ব্যয় না করে চেয়ারম্যান তা ব্যবহার করেছেন তার দখলে থাকা পুকুরপাড়ের গাইড ওয়াল ও ব্যক্তিগত কার্যালয় নির্মাণে।

অভিযুক্ত কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘আমি যে জায়গাটা ধরে আছি, সেটি সরকারের। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার ১২ বছর আগে এখানে আমার একটি ডেকোরেশন ব্যবসা ছিল। এখানে মানুষকে চা খাওয়ানোর সময় অনেকে বলেছেন, আপনার এই জায়গাটি রুচিসম্মত না। বিষয়টি আমার ইগোতে লাগে। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই, সরকারি জায়গা হোক আর যা-ই হোক, আমি জায়গাটি রুচিসম্মত করে তুলব। এগুলো যদি ভাঙা হয়, শহরে আরও অনেক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোও যাতে ভাঙা হয়। আইন যেন শুধু আমার একার জন্য না হয়ে সবার জন্য সমান হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওখানে যে বসার স্থানগুলো দেখেছেন, ফ্যান দেখেছেন, সন্ধ্যা হলেই সেখানে এক থেকে দেড়শ মানুষ আরাম করেন। আমি এগুলো তৈরি করেছি, কিন্তু আমি এগুলো ভোগ করি না। এসি রুম বানিয়েছি। আপনাদের মতো লোকদের দাওয়াত দিলে এখানে আসেন এবং আরাম করেন। সামনের অংশটা আমার মোটরসাইকেলের গ্যারেজ। পেছনে একটি হোটেল দিয়েছি। সেখান থেকে ৫-১০ হাজার টাকা আয় হলে মাসিক খরচের কিছুটা হয়। আমার মাসিক খরচ হয় এক থেকে দেড় লাখ টাকা।’
এদিকে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১০ জুন ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সেই তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। তারা ভরাট করা পুকুর, বাজারের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নির্মিত স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্ত শেষ করে দ্রুতই এই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান বা সদস্যদের। কিন্তু সরকারি আইনে সেই সম্পত্তি ভোগ বা দখল করার কোনো সুযোগ নেই। কোনোভাবেই তিনি (ইউপি চেয়ারম্যান) তা ভোগ করতে পারেন না।
এ বিষয়ে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলেই আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





