প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনাররা কি আইনগতভাবে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট

মাসুদ রায়হান
প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনাররা কি আইনগতভাবে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো নিয়ে সময় সময় এমন কিছু বিতর্ক সামনে আসে, যেগুলো কেবল পেশাগত পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামো ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যের ব্যাখ্যার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে—প্রশাসন ক্যাডারের একজন সহকারী কমিশনার নিজেকে ‘এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন কি না। বিষয়টি নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ শব্দটির ব্যবহার ও পরিসর সম্পর্কে অনেকের মধ্যেই আংশিক ধারণা রয়েছে।

প্রথমেই মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করে। দীর্ঘ সময় ধরে জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর সেই একক কাঠামোর অবসান ঘটে। এরপর থেকেই ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়—জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৬(২)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে দেশে দুই শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে: (ক) জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং (খ) এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। অর্থাৎ, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নামে কোনো পদ বা শ্রেণির অস্তিত্ব নেই—এমন দাবি আইনগতভাবে টেকসই নয়। বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনাররা কোন আইনি ভিত্তিতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিবেচিত হন।

এখানে ধারা ১০ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারা ১০(১) অনুযায়ী সরকার প্রত্যেক জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করবে এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেবে। এটি সরকারের সাধারণ নিয়োগ ক্ষমতার ভিত্তি।

ধারা ১০(৫)-এ বলা হয়েছে, সরকার প্রয়োজন বা সুবিধাজনক মনে করলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের যেকোনো সদস্যকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে এবং তাকে সেই ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে। এই উপধারাটি মূলত একটি enabling provision—অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়। নির্বাচনকালীন সময়ে মন্ত্রণালয়ে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা এর বাস্তব উদাহরণ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারা ১০(৬)। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো জেলা বা উপজেলায় সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হবেন এবং তাদের নিজ নিজ এলাকায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এখানে ব্যবহৃত ‘shall be Executive Magistrates’ শব্দবন্ধটি আইন ব্যাখ্যার স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আইনগতভাবে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মর্যাদা লাভ করেন।

এখানেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কেউ কেউ মনে করেন, আলাদা প্রজ্ঞাপন ছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নন। কিন্তু ধারা ১০(৬)-এর ভাষ্য থেকে ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হলে তার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি দেখাতে হবে। কারণ, আইনে যেখানে নির্দিষ্টভাবে কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা সব সময় গ্রহণযোগ্য হয় না।

আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দুটি নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, Literal Rule—আইনের ভাষা যদি স্পষ্ট হয়, তবে সেটিকে তার স্বাভাবিক অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, Expressio Unius Est Exclusio Alterius—আইন যেখানে কোনো বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, সেখানে তার বাইরে অন্য কিছু অনুমান করে যুক্ত করা যায় না। ধারা ১০(৬)-এ সরাসরি Assistant Commissioner, Additional Deputy Commissioner এবং Upazila Nirbahi Officer-কে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই বিধানকে উপেক্ষা করে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়।

তবে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার—আইনগত মর্যাদা ও ক্ষমতার পরিধি একই জিনিস নয়। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট উভয়েই আইনসম্মত পদ, কিন্তু তাদের দায়িত্ব ও এখতিয়ার ভিন্ন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারিক কার্য পরিচালনা করেন, অন্যদিকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মূলত জনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক তদারকি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ধারা ১৪৪ জারি, শান্তি-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০৭ থেকে ১২৬, ধারা ১৩৩, ধারা ১৪৪, ধারা ১৪৫, ধারা ১৪৬ এবং আরও বহু ধারায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ও দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এও ‘এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট’ পরিচয়ের ভিত্তিতেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, আইন কেবল এই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেয়নি; বরং নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তা ব্যবহার করেছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি নতুন নয়। ভারতের Code of Criminal Procedure, 1973-এর ধারা ২০ বাংলাদেশের ধারা ১০-এর সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। সেখানেও প্রশাসনিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তারা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় ব্যবহার করেন। ফলে বাংলাদেশের ব্যবস্থাটি বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়; বরং উপমহাদেশীয় প্রশাসনিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।

তাহলে বিতর্কের উৎস কোথায়? মূলত ‘সহকারী কমিশনার’ একটি প্রশাসনিক পদ এবং ‘এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট’ একটি আইনগত ক্ষমতাভিত্তিক পরিচয়—এই দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুটি পরিচয় বহন করতে পারেন: তিনি পদে সহকারী কমিশনার এবং আইনের বলে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। যেমন একজন বিচারক ‘সিভিল জজ’ পদে থেকে ‘জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

অবশ্যই এ কথাও সত্য যে কোনো আইনগত বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমেই হয়। কিন্তু বর্তমান আইনগত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সহকারী কমিশনারদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিদ্যমান। এটি কেবল প্রশাসনিক প্রথা নয়; বরং আইনের নির্দিষ্ট ধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি স্বীকৃত পরিচয়।

সুতরাং আলোচনার কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ বা পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে আইনের ভাষাকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। আইন যদি স্পষ্টভাবে কোনো পদধারীকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে সেই পরিচয় ব্যবহারকে ব্যক্তিগত দাবি বা অনধিকার চর্চা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং প্রয়োজন হলো প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতার সীমারেখা সম্পর্কে জনগণের কাছে আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা তুলে ধরা, যাতে আইনগত পরিচয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নীলফামারী।