সার কেলেঙ্কারির মামলায় বিএনপি নেতা কারাগারে

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মেহেরপুর
সার কেলেঙ্কারির মামলায় বিএনপি নেতা কারাগারে
মো. সোহরাব হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

মেহেরপুরে বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, আবার একই সঙ্গে জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সেই নেতার বিরুদ্ধেই উঠেছে সরকারি সার পাচারের অভিযোগ। প্রায় দুই বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ৪৬০ বস্তা সরকারি ডিএপি সারসহ একটি ট্রাক আটকের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে পাঁচ আসামির একজন তিনি।

দীর্ঘদিন আদালতে হাজির না হওয়ায় জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। শেষ পর্যন্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করলে জামিন নামঞ্জুর করে তাকে পাঠানো হয় গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে। ঘটনাটি ঘিরে মেহেরপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন ও কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানায় দায়ের হওয়া সরকারি সার পাচারের মামলায় মেহেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মেহেরপুর জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। বর্তমানে তিনি এ মামলায় গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি এশিয়া পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন।

গোপালগঞ্জ কোর্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাটির একাধিক শুনানিতে সোহরাব হোসেন অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি আদালতে চার্জশিট দাখিল হওয়ার পরও তিনি শুনানিতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে গত ১ জুলাই তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে রোববার (১২ জুলাই) বিষয়টি আলোচনায় আসে।

মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মুকসুদপুর উপজেলার বড়ইতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশের একটি চেকপোস্টে চুয়াডাঙ্গা-ট ১১-**৪১ নম্বরের একটি ট্রাকে তল্লাশি চালানো হয়। এসময় ট্রাকটি থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৪৬০ বস্তা ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি বস্তায় বিএডিসির লোগো এবং উৎপাদনের দেশ হিসেবে সৌদি আরবের নাম উল্লেখ ছিল। জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।

এ ঘটনায় মুকসুদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর ২৫/২৫(ডি) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. রকিবুল ইসলাম উজ্জ্বল তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালতে ৩৫৭ নম্বর চার্জশিট দাখিল করেন।

চার্জশিটভুক্ত পাঁচ আসামি হলেন— মেহেরপুর শহরের মন্ডলপাড়ার মো. আবু তালেব ওরফে রিপন (৪২), উজলপুর গ্রামের মো. সজল (২৭), মেহেরপুর সদর উপজেলার আমদহ গ্রামের মো. সোহরাব হোসেন (৫৩), গাংনী উপজেলার সহোগলপুর গ্রামের মো. আব্দুস সালাম (৩৯) এবং বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হরহর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেন বেপারী (৪৮)।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ করা সারগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে পরিবহন করা হচ্ছিল এবং এ ঘটনায় আসামিদের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। আদালতের নির্দেশে জব্দ করা ৪৫৯ বস্তা সার নিলামে বিক্রি করে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৮০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সরকারি সার পাচারের মতো ঘটনায় সরকার দলীয় একজন রাজনৈতিক নেতার নাম আসায় মেহেরপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

মেহেরপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রাজনীতি করার পাশাপাশি আমি নিজেও একজন কৃষক। এবার ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। কিন্তু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেও আমাকে চড়া মূল্যে কালোবাজারিদের কাছ থেকে সার কিনতে হয়েছে। অথচ সদর উপজেলা বিএনপির নেতা এবং সার ব্যবসায়ীদের নেতা হয়েও সোহরাব হোসেন মেহেরপুর জেলার কোটার সার অন্য জেলায় কালোবাজারিতে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। বিষয়টি সত্যিই লজ্জার।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জাবেদ মাসুদ মিল্টনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা রিসিভ হয়নি।

তবে মেহেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মেহেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। কারণ মামলাটি বর্তমান উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠনের আগের। তবে এই মামলায় তিনি যদি আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হন, তখন দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সরকারি সার পাচারের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকরাও। মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘মৌসুম এলেই সার নিয়ে সংকট দেখা দেয়। অনেক সময় নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যায় না। যদি সরকারি সার এভাবে পাচার হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা সাধারণ কৃষকরাই। আমার একটাই দাবি, এ বিষয়ে সরকার যেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়।’

একই উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, ‘সারের জন্য আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারের দোকানে অপেক্ষা করতে হয়। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দামও দিতে হয়। যারা কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার পাচার করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্পেশাল ট্রাইবুনাল অ্যাক্টের মামলাটি আমি মুকসুদপুর থানায় যোগদান করার আগের। বর্তমানে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলমান।’

বিষয় :মেহেরপুর