গার্ডিয়ানের কলাম/ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল এখনও অনুপ্রেরণার উৎস

সাইমন টিসডল
ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল এখনও অনুপ্রেরণার উৎস
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার প্রদান করেন। ছবি: সংগৃহীত

হোয়াইট হাউসের হস্তক্ষেপ এবং ফিফার লোভ—কোনো কিছুই এই আনন্দ উৎসবকে নষ্ট করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত এমন এক মঞ্চ পাওয়া গেছে, যেখানে বহুত্ববাদ জয়ী হচ্ছে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো গোল দিচ্ছে।

অন্যান্য দেশে বোমা হামলা থেকে শুরু করে একনায়কদের তোষণ করার মতো অনেক আপত্তিকর কাজই ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন। তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র বনাম বেলজিয়াম ম্যাচে তার গোপনে নাক গলানোর বিষয়টি সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সব দিক থেকেই এই ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। ট্রাম্পের প্রতারক হৃদয় ফুটবলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সর্বজনীন শক্তিটি বুঝতে অক্ষম। সাধারণ মানুষের জীবনে ‘সুন্দর এই খেলা’ বা ফুটবলের প্রভাব কতটা গভীরে, তা ট্রাম্পের বোঝার বাইরে।

এই প্রভাব তার ক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্ব সত্যি ফুটবলকে ভালোবাসে, ট্রাম্পকে নয়। আর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বেলজিয়ামের কাছে হেরে গেল। একেই বলে কর্মফল। আধুনিক এই নৈতিক লড়াই কর্তৃত্ববাদের সীমাবদ্ধতাকে আনন্দের সঙ্গে প্রকাশ করে দিয়েছে।

আধিপত্যকামী ও অনুদার অর্থনৈতিক-সামরিক শক্তির এই যুগে পুরুষদের বিশ্বকাপ প্রথাগত ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। এটি আমাদের জন্য বেশ শিক্ষণীয় ও সতেজ একটি অভিজ্ঞতা। এই বিকল্প বিশ্বে ছোট দেশ ও সাধারণ মানুষ অনেক সময় বড় শক্তির চেয়েও জোরালো আওয়াজ তুলতে পারে। ফুটবলের পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালার পরও চীন আবারও বিশ্বকাপে জায়গা পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হারের পর বেলজিয়াম সমর্থকদের উল্লাস। এ সময় এক সমর্থককে লাল কার্ড উচিয়ে ধরতে দেখাতে যায়। ছবি: সংগৃহীত
বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হারের পর বেলজিয়াম সমর্থকদের উল্লাস। এ সময় এক সমর্থককে লাল কার্ড উচিয়ে ধরতে দেখাতে যায়। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া তো ফুটবলে কখনোই খুব একটা ভালো ছিল না। ইউক্রেন আক্রমণের পর তাদের বিশ্বকাপ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আর ট্রাম্পের সব ‘মাগা’ গুণ্ডামি সত্ত্বেও ফুটবলের মাঠে যুক্তরাষ্ট্র এখনও নেহাত চুনোপুঁটি। নামধারী পরাশক্তিগুলোর অবস্থা এভাবে উন্মোচিত হচ্ছে।

ট্রাম্পের গোপন অনুরোধে ফিফা তাদের নিয়ম ভেঙে লাল কার্ড পাওয়া মার্কিন খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনকে আবার খেলার অনুমতি দেয়। ফিফার এই সিদ্ধান্তে ছোট্ট দেশ বেলজিয়াম স্বাভাবিকভাবে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। বেলজিয়াম এর কড়া জবাব দিয়েছে খেলার মাঠে।

ওই সন্ধ্যায় আমেরিকার বাইরের পুরো বিশ্ব বেলজিয়ামকে সমর্থন দিচ্ছিল। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বেলজিয়াম। এটি খেলার চেয়েও বড় ছিল গণতন্ত্রের জয়। একজন দাম্ভিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং দুর্নীতি ও লোভের জন্য কুখ্যাত এক সংগঠনের ষড়যন্ত্র মাঠেই ভেস্তে গেছে। টুর্নামেন্টের শুরুতে বেশ কয়েকটি ছোট ও দুর্বল দেশ বড় দলগুলোকে রুখে দিয়েছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও এবং ডিআর কঙ্গোর কথা ভাবুন। এসব দেশের নাম সচরাচর কয়বারই বা শোনা যায়?

পৃথিবীর ১০টি জনবহুল দেশের মধ্যে আটটিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আসরে নেই। এটি প্রথাগত বিশ্বব্যবস্থার বড় এক ওলটপালট। চীন ও ভারতকে প্রায় একুশ শতকের উদীয়মান পরাশক্তি বলা হয়। প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের দেশ ভারত ফুটবলপ্রেমীর অভাব না থাকা সত্ত্বেও বাছাইপর্ব পার হতে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন শক্তির অন্য দুই দেশ ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়াও এই আসরে নেই। বিপরীতে ইকুয়েডর বা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো দলগুলো বিশ্বমঞ্চে বড় সাফল্য দেখাচ্ছে।

ফুটবল যে ভালো ফল বয়ে আনে, স্বাগতিক মেক্সিকোর অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ। তাদের জাতীয় দল ‘এল ত্রি’র প্রথম দিকের খেলাগুলো সারা দেশে উৎসবের জোয়ার বইয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গুমের ঘটনাগুলো তখন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। খবর পাওয়া গেছে, দেশটিতে মাদক ব্যবসায়ীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও কমে গিয়েছিল। তবে ইংল্যান্ডের কাছে মেক্সিকো হেরে বিদায় নেওয়ার পর পরিস্থিতি হয়তো আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

মাঠে এবং মাঠের বাইরে এই বিশ্বকাপ এখন বহুত্ববাদ ও জাতিগত বৈচিত্র্যের এক রঙিন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি ট্রাম্প বা নাইজেল ফারেজদের মতো উগ্রবাদীদের গালে বড় এক চড়। বিভিন্ন জাতি-বর্ণের খেলোয়াড়রা পুরো বিশ্বের সামনে এক চমৎকার উদাহরণ তৈরি করেছেন। যেখানে বারবার বলা হয় যে, আমাদের সমাজ চিরতরে বিভক্ত হয়ে গেছে, ফুটবল সেখানে ঐক্যের ডাক দিচ্ছে।

টেক্সাস থেকে ম্যাসাচুসেটস পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকরা বিদেশি ভক্তদের যে উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করে নিয়েছেন, তা হোয়াইট হাউসের তৈরি করা উগ্র অভিবাসী-বিদ্বেষী ভাবমূর্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। সম্ভবত এই ইতিবাচক পরিবেশ এবং জেফ্রি এপস্টাইন ইস্যুতে গ্যালারিতে বিদ্রূপের শিকার হওয়ার ভয়ে ট্রাম্প এখনো মাঠে কোনো খেলা দেখতে যাননি।

এই বিশ্বকাপে কুৎসিত ঘটনাও কম ঘটেনি। সোমালিয়ার শীর্ষ রেফারি ওমর আর্তানকে যুক্তরাষ্ট্র অন্যায়ভাবে বাদ দিয়েছে। ইরানের জাতীয় দলকে সরকারিভাবে হয়রানি করার মতো প্রতিহিংসামূলক ঘটনাও ঘটেছে। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্যের পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে। এটি জনমানসের এক বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রেফারি থেকে খেলোয়াড় সবার ক্ষেত্রে মাঠের লড়াই এখন বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিরোধ।

রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারের বিশ্বকাপও সফল হচ্ছে ফিফা এবং এর তৈলাক্ত প্রধান জান্নি ইনফান্তিনোর কারণে নয়, বরং তাদের অপকর্মকে ছাপিয়ে এটি সফল হচ্ছে। টিকিটের গলাকাটা দাম আর চড়া মূল্যের স্যুভেনিয়ার বিক্রি করাটাই ফিফার প্রধান ব্যবসায়িক ধান্দা।

এটি ইনফান্তিনোর আসল রূপ—ক্ষমতা আর টাকাই তার কাছে সব। ২০১৮ সালে ইনফান্তিনো নির্লজ্জের মতো পুতিনকে তোষণ করেছেন। ২০২২ সালে কাতারের একনায়ক শাসকদের বেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ট্রাম্পকে তুষ্ট করতেও ইনফান্তিনো একই রকম তৈলাক্ত কৌশল ব্যবহার করেছেন। হাইতি বা সেনেগালের ভক্তদের যখন হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে বাধা দিচ্ছিল, তখন ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে এক ভুয়া ‘শান্তি পুরস্কার’ তুলে দিয়েছেন। ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে ‘জনদরদি নেতা’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন।

ইনফান্তিনোর নীতিহীন আচরণ এবং ফিফার চরম লোভ সম্ভবত ক্রীড়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বর্তমান অবস্থাকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফার সঙ্গে ফিফার যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা আসলে ট্রাম্পপন্থী একনায়ক আর ইউরোপীয় গণতন্ত্রপন্থীদের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক পার্থক্যের প্রতিফলন।


দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

লেখক: সাইমন টিসডল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক। তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ‘ফরেন লিডার রাইটার’ ও ‘ফরেন এডিটর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য অবজারভারের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক এবং বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।