ডেঙ্গুর ঢাকা: প্রতি বর্ষায় কেন একই আতঙ্ক

বর্ষা এলেই ঢাকার আকাশে জমে কালো মেঘ। কিন্তু সেই মেঘের চেয়েও বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে আরেকটি অদৃশ্য বিপদ—ডেঙ্গু। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর খবর, আর পরিবারগুলোতে নেমে আসে এক অজানা শঙ্কা। প্রশ্ন হলো, এ বছরও কি একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হবে? কেন ডেঙ্গু এখনও ঢাকার জন্য এমন এক জনস্বাস্থ্য সংকট, যার কার্যকর সমাধান আমরা খুঁজে পাচ্ছি না?
ডেঙ্গু আজ আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি আমাদের নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। একসময় যে রোগটিকে ঢাকার একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, তা এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গুর কেন্দ্রবিন্দু এখনও ঢাকা।
গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু বাড়ছেই না, এর বিস্তার ও তীব্রতাও পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, এটিই হয়তো সর্বোচ্চ সতর্ক সংকেত। কিন্তু ২০২৩ সালে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ওই বছর দেশে তিন লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১,৭০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি, নীতিগত দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘায়িত বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা দেখিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়া হবে। ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি । রাজধানীর অসংখ্য নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এবং জলাবদ্ধতা এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা যেন প্রতি বর্ষায় ডেঙ্গুর পক্ষে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব। সাধারণত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে তৎপরতা দেখা যায়; শুরু হয় ফগিং, সচেতনতামূলক প্রচার এবং জরুরি সভা। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সারা বছরব্যাপী পরিকল্পনা ও নজরদারি। মশা জন্মানোর পর তা ধ্বংস করার চেয়ে মশার জন্মস্থান নির্মূল করা অনেক বেশি কার্যকর ও টেকসই পদ্ধতি।
জনসচেতনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায় শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিই। অথচ বাড়ির বারান্দা, ছাদ, ফুলের টব, এসির ট্রে কিংবা অব্যবহৃত পাত্রে জমে থাকা সামান্য পানিই এডিস মশার জন্মস্থল হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক রোগী এখনও জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ ভেবে অবহেলা করেন। ফলে হাসপাতালে আসতে দেরি হয় এবং জটিলতা বেড়ে যায়। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি বড় কারণ হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব। তাই দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
ঢাকাকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে হলে শুধুমাত্র ফগিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত লার্ভা জরিপ, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী জনসম্পৃক্ততা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতকে প্রস্তুত রাখতে হবে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য।
ডেঙ্গু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্য কেবল হাসপাতালের বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নাগরিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সমন্বিত ফল। প্রতি বর্ষায় যদি আমরা একই আতঙ্কের পুনরাবৃত্তি দেখতে না চাই, তাহলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অন্যথায় এই বর্ষায়ও হয়তো আমরা আবার একই প্রশ্নের সম্মুখীন হবো—ডেঙ্গুর ঢাকা থেকে মুক্তির উপায় কি ?





