পাবলিক পরীক্ষা কখন নেওয়া উচিত, কখন নেওয়া হয়?

আব্দুল জব্বার তপু
পাবলিক পরীক্ষা কখন নেওয়া উচিত, কখন নেওয়া হয়?
হাঁটু পানিতে ভিজে পিরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

একটি ভিডিও দেখলাম, প্রায় কোমর পর্যন্ত পানি মাড়িয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। একজন নারী শিক্ষার্থী কাগজপত্রসহ পড়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করলে এরকম ভোগান্তির বহু ভিডিও-ছবি চোখে পড়ছে।

দেশের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। যেখানে সারা দেশের প্রতিটা গ্রাম-পাড়া-মহল্লার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। গত কয়েক দশক ধরে এই পরীক্ষা দুটি এপ্রিল-জুলাই মাসের মধ্যে নেওয়া হচ্ছে। এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ২ জুলাই শুরু হয়েছে, যা ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের আবহাওয়া বিবেচনায় এই সময়ে এই ধরণের পরীক্ষা নেওয়াটা কতটা যৌক্তিক?

এপ্রিল ও মে মাস গ্রীষ্মকাল। এই সময় দেশে প্রচণ্ড গরম থাকে। তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪০-৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসও হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট তো এই সময় প্রায় ঘটে। পাশাপাশি আমি গত ৫ বছর যাবত স্কুলভিত্তিক একটি গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেখানে ১০৪টি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। এই গবেষণার মাঠকর্ম করতে গিয়ে দেখেছি, গ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর চাল টিনের। কোনো কোনোটার তো দেওয়ালও টিনের।

একবার ভাবুন, বিদ্যুৎ নেই ও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় একজন শিক্ষার্থী টিনের ঘরে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। সে কি তার প্রস্তুতি অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে পারবে? পাশাপাশি এই সময় কালবৈশাখী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই ধরনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মন-সংযোগের বিরাট ব্যাঘাত ঘটায়।

জুন-জুলাই মাস বর্ষাকাল। সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। প্রায় প্রতিবছরই অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা হয়। যেটা স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে দুই থেকে তিন মাসও লেগে যায়। এবছরও তাই হচ্ছে। চট্রগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জেলায় বন্যা হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার পার্বত্য চট্রগ্রাম ছাড়া বাকি সব স্থানে পরীক্ষা চলমান রেখেছে। যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরণের আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি না কমলে এ পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন থাকবে। এই অবস্থায় অন্তত আজকের (১৩ জুলাই) পরীক্ষা স্থগিত করা যেত।

নৌকা করে কুমিল্লার একটি পরীক্ষা কেন্দ্র যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নৌকা করে কুমিল্লার একটি পরীক্ষা কেন্দ্র যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আমার বিবেচ্য বিষয় হলো, শুধু আজকের পরীক্ষা নয়। পরীক্ষার সময় ও রুটিন নির্ধারণ করার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কি জানেন না, এই সময় বৃষ্টি হবে, বন্যা হতে পারে? তাহলে প্রতিবছর এই সময়ই কেন পরীক্ষা নিতে হবে?

আমার মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া বিবেচনায় যেকোনো পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার উপযুক্ত সময় হলো জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস। এই সময় শীতের আবহ থাকে। ঝড়-বৃষ্টি কম হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের শেষ নাগাদ।

অনেকেই বলতে পারেন, এই সময় রোজা থাকে ও তৎপরবর্তী ঈদের ছুটি থাকে। আমার এখানে আপত্তি আছে। সম্পূর্ণ রোজার সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে বা চালু থাকলেও পরীক্ষা নেওয়া যাবে না সেটা কে বলেছে? রোজা কি খালি আমরাই করি নাকি বাকি দুনিয়ার মুসলমানেরাও করেন? তারা কি রোজার মাসে সব বন্ধ রাখেন? রোজা কোন অযুহাত হতে পারে না। মুসলমান রোজা রেখেই সব কাজ করতে পারে। সেটা পরীক্ষা হোক আর রিকসা চালানোর মত কঠিন কাজই হোক।

সরকার আগামী বছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটাকে সাধুবাদ জানাই। সেই সঙ্গে আশা করি, পরের বছরগুলোতে একই সময় এই পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু আগামী বছর উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে ৬ জুন থেকে। যা ১৮ জুলাই পর্যন্ত চলমান থাকবে। ফলে এবছরের মত আগামী বছরও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করা উচিৎ।

শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিবেচনা করা উচিৎ যে, এটার সঙ্গে সারা দেশের প্রতিটা গ্রাম-পাড়া-মহল্লার শিক্ষার্থী জড়িত। ফলে সবার যেন ভাল করার সমান সুযোগ থাকে। এখানে কেউ আংশিক খারাপ ফল করলে সেটার প্রভাব তার উচ্চ মাধ্যমিক পরবর্তী জীবনেও পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষার ন্যুনতম যোগ্যতা ঠিক করে দেয়। ফলে অনেকের উচ্চ শিক্ষার দুয়ার চির তরে বন্ধ হয়ে যায়। আশা করছি, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।


লেখক: আব্দুল জব্বার তপু একজন গবেষক। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডেপুটি প্রজেক্ট কো-অরডিনেটর।