রাতে যে ৫ উপসর্গ বেশি দেখলেই সতর্ক হবেন
-44d0e7-720x405.webp)
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া, পায়ের পেশিতে টান ধরা কিংবা শুয়ে পড়লে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, এসব সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ শারীরিক অসুবিধা মনে করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এগুলো কিডনির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও হতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের সমস্যা নিয়মিত হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক না।
কিডনি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে বের করে দেয় এবং শরীরে বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে অতিরিক্ত তরল ও বর্জ্য জমতে পারে। এর প্রভাব ঘুম, প্রস্রাবের অভ্যাস এবং শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মেও পড়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিডটাউন নেফ্রোলজির প্রকাশিত একটি নিবন্ধে কিডনি সমস্যা থাকলে রাতে দেখা দিতে পারে এমন কয়েকটি লক্ষণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, রাতে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব সমস্যার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রাতে কিডনির সমস্যার ৫টি সম্ভাব্য লক্ষণ
রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া (Nocturia)
রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া কিডনির সমস্যার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ। কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে রাতে প্রস্রাব ঘন করার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে, ফলে অনেকের প্রস্রাবের বেগ তুলনামূলক কম হয়। কিন্তু কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে প্রস্রাব তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে হলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আগে এমন সমস্যা না থাকলেও হঠাৎ প্রস্রাবের বেগ বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে ডায়াবেটিস, মূত্রথলির সমস্যা, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং পুরুষদের প্রোস্টেট বড় হওয়ার কারণেও রাতে বারবার প্রস্রাব হতে পারে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে কিডনির রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
রাতে পা নাড়ানোর অস্বস্তি (Restless Leg Syndrome)
রাতে শুয়ে থাকার সময় পায়ে অস্বস্তি, ঝিনঝিন অনুভূতি কিংবা বারবার পা নাড়ানোর তাগিদ হলে সেটি রেস্টলেস লেগ সিনড্রোমের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় পা নাড়ালে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়। ফলে ঘুমাতে অসুবিধা হয় এবং বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত কিছু মানুষের মধ্যে এ সমস্যা দেখা যায়। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তস্বল্পতা এবং শরীরের বিভিন্ন উপাদানের ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যা ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে পায়ে অস্বস্তি হলেই কিডনির রোগ হয়েছে, এমন নয়। নিয়মিত এ সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
রাতে পায়ের পেশিতে টান ধরা (Severe Nighttime Leg Cramps)
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ পায়ের পেশিতে তীব্র টান ধরলে ব্যথায় ঘুম ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে পায়ের পেছনের পেশি বা পায়ের পাতায় এমন সমস্যা দেখা যায়।
কিডনি শরীরে পানি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে এসব উপাদানের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে কিছু মানুষের পেশিতে টান বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
তবে পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও পেশিতে টান ধরতে পারে। তাই বারবার বা তীব্র ব্যথা হলে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
রাতে ত্বকে অতিরিক্ত চুলকানি (Intense Itching)
ত্বকে কোনো র্যাশ বা দৃশ্যমান সমস্যা না থাকলেও সারা শরীরে চুলকানি হতে পারে। বিশেষ করে রাতে চুলকানি বেড়ে গেলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
কিডনির গুরুতর সমস্যায় রক্তে বর্জ্য পদার্থ ও ফসফরাসের মতো উপাদানের মাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে। এর সঙ্গে ত্বকের চুলকানির সম্পর্ক থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়।
তবে শুষ্ক ত্বক, অ্যালার্জি, একজিমা এবং অন্যান্য রোগেও চুলকানি হতে পারে। তাই শুধু চুলকানির কারণে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন ধরে চুলকানি থাকলে বা এর সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রাতে বমি বমি ভাব বা সকালে ঘুম থেকে উঠে বমি লাগা (Nighttime Nausea or Nausea Upon Waking)
রাতে শুয়ে থাকার সময় বমি বমি ভাব হওয়া কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে বমি লাগার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কখনো বদহজম, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা খাবারের সমস্যার কারণে এমন হয়।
তবে কিডনির কার্যক্ষমতা অনেক কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। এর প্রভাবে ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। এসব লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে দেখা দিতে পারে।
যদি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার বমি বমি ভাব হয় এবং এর সঙ্গে ক্ষুধা কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা প্রস্রাবের পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কিডনির সমস্যা হলে আর কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
কিডনির রোগের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। রোগ বাড়তে থাকলে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।
- পা, গোড়ালি, হাত বা মুখ ফুলে যাওয়া
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- ক্ষুধা কমে যাওয়া
- প্রস্রাবের পরিমাণ বা অভ্যাসে পরিবর্তন
- প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া
- শ্বাসকষ্ট
- ত্বকে চুলকানি
- মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা
- ঘুমের সমস্যা
এসব লক্ষণের পেছনে কিডনির রোগ ছাড়াও অন্য কারণ থাকতে পারে। আবার কিডনির রোগ থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। তাই শুধু লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া, পেশিতে তীব্র টান, দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি বা বমি বমি ভাবের মতো সমস্যা নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ কিংবা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাই করতে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা দিতে পারেন। যেমন-
রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা: কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ কতটা ভালোভাবে সরাতে পারছে, তা মূল্যায়নে সাহায্য করে।
ইজিএফআর পরীক্ষা: রক্ত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কিডনির ছেঁকে দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা: প্রস্রাবের মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে প্রোটিন বের হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে সাহায্য করে।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারণ করবেন।
শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা তীব্র অসুস্থতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
কিডনি সুস্থ রাখতে কী করবেন?
কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো, তবে কিডনির রোগ বা হৃদ্রোগের কারণে চিকিৎসক পানি পানের পরিমাণ সীমিত করে দিলে সেই নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া এড়িয়ে চলুন। কিডনির রোগের ঝুঁকি থাকলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাতে দেখা দেওয়া কোনো একটি লক্ষণকে কিডনি বিকল হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে সমস্যা বারবার হলে বা একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে অবহেলা না করে পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের মিডটাউন আটলানা নেফ্রোলজির ওয়েবসাইটে ‘5 Kidney Failure Symptoms That Show Up ONLY At Night [No. 3 Wakes Most Patients Up]’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।

-5ec7d3.jpg)
