তরুণ বয়সেই পিঠে ব্যথা? কোন লক্ষণগুলো হতে পারে বিপদের সংকেত

পিঠে ব্যথা হলে অনেকেই একে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো অথবা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল বলে মনে করেন। বিশেষ করে তরুণ বয়সে এমন ব্যথাকেও অনেকে তেমন গুরুত্ব দেন না। ব্যথা কমাতে কেউ বিশ্রাম নেন, কেউ ব্যথানাশক ওষুধ খান। কিন্তু ব্যথা বারবার ফিরে এলে বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ভুল ভঙ্গিতে কাজ করা অথবা হঠাৎ অতিরিক্ত ব্যায়াম করার কারণে পিঠে ব্যথা হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা মেরুদণ্ডের সমস্যা বা প্রদাহজনিত রোগের লক্ষণও হতে পারে। তাই তরুণ বয়সে পিঠে ব্যথা হলেই তা বয়স বা কাজের চাপের কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক না।
তরুণদের পিঠে ব্যথার কারণ কী?
তরুণ বয়সে পিঠে ব্যথার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা: অফিসে কাজ, পড়াশোনা কিংবা মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে অনেকে একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকেন। নিয়মিত নড়াচড়া না করলে পিঠের পেশিতে অস্বস্তি ও ব্যথা হতে পারে।
ভুল ভঙ্গিতে কাজ করা: ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে বসা, বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করা অথবা কাজের জায়গায় শরীরের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে পিঠ ও ঘাড়ে চাপ পড়তে পারে।
হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম করা: দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করে হঠাৎ ভারী ওজন তোলা বা কঠিন শরীরচর্চা শুরু করলে পেশিতে টান লাগতে পারে। ব্যায়ামের সময় ভুল কৌশল ব্যবহার করলেও পিঠে ব্যথা হতে পারে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম না করলে শরীরের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে দৈনন্দিন কাজের সময় পিঠে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
তবে পিঠে ব্যথার সব কারণ জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত না। স্নায়ুতে চাপ, ডিস্কের সমস্যা কিংবা প্রদাহজনিত রোগ থেকেও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে।
কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী পিঠে ব্যথা?
তরুণদের দীর্ঘদিনের পিঠে ব্যথার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ, যা মূলত মেরুদণ্ড ও এর সঙ্গে যুক্ত সন্ধিগুলোকে প্রভাবিত করে।
এই রোগে সাধারণ পিঠে ব্যথার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেমন-
- ৪০ বছরের কম বয়সে পিঠে ব্যথা শুরু হওয়া।
- কয়েক মাস ধরে ব্যথা থাকা বা বারবার ফিরে আসা।
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পিঠ শক্ত হয়ে থাকা।
- দীর্ঘক্ষণ বসে বা বিশ্রামে থাকার পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
- হাঁটাচলা বা ব্যায়ামের মতো নড়াচড়ায় ব্যথা কিছুটা কমে আসা।
এ ধরনের লক্ষণ থাকলেই অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস হয়েছে, এমন নয়। তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। রোগটি শনাক্ত করতে চিকিৎসক লক্ষণ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা ইমেজিং পরীক্ষার সাহায্য নিতে পারেন।
কখন পিঠে ব্যথাকে অবহেলা করা ঠিক না?
সাধারণ পিঠে ব্যথার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি হয়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যথা না কমা বা ক্রমে বাড়তে থাকা।
- ব্যথার কারণে ঘুম, পড়াশোনা, কাজ কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরায় সমস্যা হওয়া।
- বিশ্রামের পরও ব্যথা না কমা বা রাতে ব্যথায় ঘুম ভেঙে যাওয়া।
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা জ্বরের সঙ্গে পিঠে ব্যথা থাকা।
- ব্যথার সঙ্গে পায়ে ঝিনঝিনি, অসাড়তা বা দুর্বলতা দেখা দেওয়া।
কিছু লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। পিঠে ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব আটকে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ হারানো, পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা যৌনাঙ্গ ও নিতম্বের মাঝের অংশে নতুন করে অসাড়তা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যেতে হবে। এসব লক্ষণ মেরুদণ্ডের নিচের দিকে স্নায়ুতে গুরুতর চাপের ইঙ্গিত দিতে পারে।
পিঠের ব্যথা কমাতে কী করবেন?
পিঠে ব্যথা হলে দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকা সব সময় উপকারী না। ব্যথা সহনীয় থাকলে এবং বিপদের কোনো লক্ষণ না থাকলে দৈনন্দিন হালকা কাজ ও হাঁটাচলা চালিয়ে যাওয়া সাধারণত সহায়ক হতে পারে।
কিছু অভ্যাস পিঠের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে-
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে নিয়মিত উঠে হাঁটুন।
- কাজের সময় পিঠ ও ঘাড়ের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
- শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করুন।
- ভারী জিনিস তোলার সময় সঠিক কৌশল ব্যবহার করুন।
- ব্যথা বাড়িয়ে দেয় এমন ব্যায়াম বা কাজ আপাতত এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজন হলে কাপড়ে মোড়ানো গরম পানির ব্যাগ বা ঠান্ডা প্যাক ব্যবহার করতে পারেন।
ব্যথানাশক ওষুধ সবার জন্য উপযুক্ত না। তাই ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ওষুধ খেয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
তরুণ বয়সে পিঠে ব্যথা হওয়া অস্বাভাবিক না। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, পেশিতে টান কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ব্যথা যদি দীর্ঘদিন থাকে, বারবার ফিরে আসে, সকালে পিঠ শক্ত হয়ে থাকে অথবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা করা ঠিক না।
সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ব্যথার কারণ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা সহজ হয়। তাই বয়স কম বলে দীর্ঘস্থায়ী পিঠে ব্যথাকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র
Samaa TV: Experts warn young people against ignoring persistent back pain
NHS: Back pain
NHS: Slipped disc
Chelsea and Westminster Hospital: Back pain

