হরমোন নিয়ে ইন্টারনেটের পরামর্শ মানার আগে যে সতর্কতা জরুরি

শরীরে হঠাৎ কিছু পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। মাসিকের তারিখ বদলে যাচ্ছে, আগের চেয়ে বেশি ক্লান্ত লাগছে, ঘুম ঠিক হচ্ছে না, ওজন বাড়ছে, চুল পড়ছে কিংবা মেজাজ বারবার খারাপ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এখন অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে ইন্টারনেটে খুঁজে দেখেন, এসবের কারণ কী হতে পারে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে আসে নানা ব্যাখ্যা। কেউ বলছেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, কেউ বলছেন কর্টিসল বেড়েছে, আবার কেউ বলছেন এটি পেরিমেনোপজ বা পিসিওএসের লক্ষণ। সঙ্গে থাকে নানা খাবার বাদ দেওয়ার পরামর্শ, খাদ্যতালিকা, পরীক্ষার তালিকা ও বিভিন্ন ধরনের সম্পূরক খাবারের সুপারিশ।
সমস্যা হলো, একই উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শুধু কয়েকটি উপসর্গ দেখে নিজের রোগ নিজে নির্ধারণ করা তাই নিরাপদ নয়। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশেষজ্ঞরা অনলাইনে নারীদের হরমোন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়া এমন নানা ভুল ধারণা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
কোনো একটি হরমোনই কি সব সমস্যার কারণ?
অনলাইনে হরমোন নিয়ে আলোচনার একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, শরীরের কোনো একটি হরমোনকে প্রায় সব সমস্যার জন্য দায়ী করা। যেমন ক্লান্তি হলেই কর্টিসল, ওজন বাড়লেই ইস্ট্রোজেন, চুল পড়লেই হরমোনের সমস্যা, আবার পেট ফাঁপলেই হরমোনের ওঠানামাকে দায়ী করা হয়।
কিন্তু মানুষের শরীর এতটা সরল নয়। শরীরের বিভিন্ন হরমোন ও অঙ্গ একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি হরমোনের মাত্রা দেখেই পুরো শরীরে কী ঘটছে, তা বোঝা যায় না।
ধরা যাক, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে। এর কারণ রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও হতে পারে। আবার চুল পাতলা হওয়ার পেছনে আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিনের ঘাটতি বা থাইরয়েডের সমস্যাও থাকতে পারে।
তাই শুধু হরমোনকে দায়ী করে বসে থাকলে প্রকৃত কারণটি ধরা পড়তে দেরি হতে পারে।
মাসিকের হিসাব রাখার অ্যাপ কি রোগ শনাক্ত করতে পারে?
মাসিকের তারিখ ও শারীরিক পরিবর্তনের হিসাব রাখতে মুঠোফোনের বিভিন্ন অ্যাপ বেশ কাজে লাগে। এতে মাসিকের ধরন বা সময়ের পরিবর্তন বোঝা সহজ হতে পারে।
কিন্তু এ ধরনের অ্যাপ চিকিৎসকের বিকল্প নয়।
কোনো মাসে মাসিকের চক্র কিছুটা দীর্ঘ হলেই যে সমস্যা হয়েছে, তা নয়। একইভাবে নির্দিষ্ট দিনে ডিম্বস্ফোটন না হলেই পিসিওএস হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না।
অ্যাপের একটি সতর্কবার্তা দেখে ভয় পেয়ে নিজের খাবার থেকে একের পর এক খাবার বাদ দেওয়া বা নিজে থেকে ওষুধ কিংবা সম্পূরক খাবার শুরু করাও ঠিক নয়।
অ্যাপ তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ কী, তা নির্ধারণ করতে প্রয়োজন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল্যায়ন।
বয়স ৩৫ বা ৪০ হলেই কি সব উপসর্গ পেরিমেনোপজের?
পেরিমেনোপজ হলো মেনোপজের আগের একটি পরিবর্তনের সময়। এ সময়ে মাসিকের ধরন বদলানো, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কিন্তু বয়স ৩০-এর শেষ দিকে বা ৪০-এর কোঠায় পৌঁছালেই যেকোনো শারীরিক পরিবর্তনকে পেরিমেনোপজ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। থাইরয়েডের সমস্যা, পিসিওএসসহ আরও অনেক কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ কোনো উপসর্গ পেরিমেনোপজের সঙ্গে মিলে গেলেই সেটি পেরিমেনোপজের কারণে হচ্ছে, এমন নয়।
ওজন বাড়লেই কি হরমোনের সমস্যা?
ওজন বাড়লে অনেকেই প্রথমে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কথা ভাবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হরমোন ঠিক করলেই ওজন কমবে, এমন নানা পরামর্শ দেখা যায়।
কিন্তু ওজন বাড়ার পেছনে খাবারের ধরন, শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ, ঘুম, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ইনসুলিনের কার্যকারিতার পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা এবং আরও নানা কারণ থাকতে পারে।
তাই শুধু হরমোন ঠিক করার নামে কঠোর খাদ্যনিয়ম শুরু করার আগে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
ক্লান্তি মানেই কর্টিসল বা মানসিক চাপ নয়
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগলে অনলাইনে অনেক সময় কর্টিসল বা তথাকথিত অ্যাড্রিনাল ক্লান্তির কথা বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্লান্তির পেছনে রক্তস্বল্পতা, ঘুমের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা কিংবা অন্য শারীরিক কারণ থাকতে পারে।
তাই শুধু কোনো সম্পূরক খাবার খেয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা না করে, দীর্ঘদিনের ক্লান্তির কারণ খুঁজে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পিসিওএস মানেই কি সন্তান হবে না?
পিসিওএস নিয়ে অনলাইনে সবচেয়ে ভয় তৈরি করা ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, এই সমস্যা থাকলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণ করা অসম্ভব।
বাস্তবে পিসিওএসের কারণে ডিম্বস্ফোটনে অনিয়ম হতে পারে এবং এর ফলে গর্ভধারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে পিসিওএস মানেই সন্তান ধারণ অসম্ভব নয়। অনেক নারী চিকিৎসা ছাড়াই বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে গর্ভধারণ করতে পারেন।
তাই অনলাইনে কোনো ভয়ংকর তথ্য পড়ে আগেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
হরমোন ঠিক করতে কঠোর খাদ্যনিয়ম কতটা নিরাপদ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করার নামে নানা ধরনের খাদ্যতালিকা জনপ্রিয়। কখনো দুধ বাদ দিতে বলা হয়, কখনো গমজাত খাবার, কখনো তেল বা শর্করা একেবারে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু সবার শরীর এক নয়। একজনের জন্য উপযোগী খাবারের নিয়ম অন্যজনের জন্য প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খাওয়া বা অতিরিক্ত খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাস উল্টো মাসিকের স্বাভাবিক চক্রসহ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো কঠোর খাদ্যনিয়ম অনুসরণ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সম্পূরক খাবার খেলেই কি হরমোন ঠিক হবে?
অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের সম্পূরক খাবারকে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করার সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, সেটি না জেনে নিয়মিত সম্পূরক খাবার খাওয়া ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে ঘাটতি নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূরক খাবার গ্রহণ করা।
প্রাকৃতিক বা ভেষজ লেখা থাকলেই কোনো উপাদান সবার জন্য নিরাপদ হবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়।
বেশি পরীক্ষা করালেই কি বেশি উত্তর পাওয়া যায়?
আরেকটি সমস্যা হলো, অনলাইনে দেখে অনেকে একসঙ্গে অনেক ধরনের হরমোন পরীক্ষা করিয়ে ফেলেন। এরপর কোনো একটি মান স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বা কম এলেই ভয় পেয়ে যান।
কিন্তু একটি পরীক্ষার ফল আলাদা করে দেখলে অনেক সময় তার প্রকৃত অর্থ বোঝা যায় না। বয়স, উপসর্গ, মাসিকের সময়, শারীরিক ইতিহাস এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল মিলিয়ে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিশেষ করে কোনো একটি হরমোনের মাত্রা দেখে নিজে থেকে রোগের নাম ঠিক করে ফেলা বিপজ্জনক হতে পারে।
কিছু উপসর্গকে শুধু হরমোনের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক
অনলাইনে নিজে রোগ নির্ধারণ করার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, কোনো গুরুতর সমস্যাকে সাধারণ হরমোনের ওঠানামা বলে ধরে নেওয়া।
যেমন অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত রক্তপাতকে শুধু হরমোনের সমস্যা মনে করে ফেলে রাখা ঠিক নয়। এর পেছনে জরায়ুর মাংসপিণ্ড, পলিপ বা অন্য কোনো সমস্যাও থাকতে পারে।
একইভাবে দীর্ঘদিনের তলপেটের ব্যথাকে শুধু মাসিকের সমস্যা মনে করে এড়িয়ে গেলে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা, ডিম্বাশয়ের সিস্ট বা জরায়ুর অন্য রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
হঠাৎ খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত বা ক্রমেই বাড়তে থাকা ব্যথার মতো উপসর্গ হলে অনলাইনে খোঁজাখুঁজি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তাহলে ইন্টারনেট থেকে স্বাস্থ্যতথ্য নেওয়া যাবে না?
অবশ্যই যাবে। ইন্টারনেট স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানার একটি ভালো মাধ্যম হতে পারে। সমস্যা তখনই হয়, যখন তথ্যকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
অনলাইনে কোনো তথ্য পড়ার পর কয়েকটি প্রশ্ন নিজেকে করা যেতে পারে-
- তথ্যটির উৎস কি বিশ্বাসযোগ্য?
- তথ্যটি কি চিকিৎসক বা স্বীকৃত স্বাস্থ্য সংস্থার?
- লেখাটিতে কি সবার জন্য একই সমাধান দেওয়া হচ্ছে?
- কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সম্পূরক খাবার বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে কি?
- গুরুতর উপসর্গ থাকলেও কি চিকিৎসকের কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে?
এসব বিষয়ে সতর্ক থাকলে ভুল তথ্য থেকে নিজেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
কোনো উপসর্গ নতুনভাবে শুরু হয়ে দীর্ঘদিন থাকলে, ধীরে ধীরে বাড়লে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী তলপেটের ব্যথা, হঠাৎ তীব্র দুর্বলতা, বারবার মাসিকের ধরন বদলে যাওয়া বা পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলে বিষয়টি নিজে থেকে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
অনলাইনে পাওয়া তথ্য তখন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাজে লাগতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।
ইন্টারনেটে একটি উপসর্গ লিখে সার্চ করলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনেক সম্ভাব্য রোগের নাম সামনে চলে আসে। এতে নিজের শরীর নিয়ে সচেতন হওয়া যেমন সম্ভব, তেমনি অযথা ভয় পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
বিশেষ করে নারীদের হরমোন, মাসিক, পিসিওএস বা পেরিমেনোপজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এর সবটা যে ভুল, তা নয়। কিন্তু একটি উপসর্গ দেখে নিজের রোগ নিজে নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী খাবার, ওষুধ বা সম্পূরক খাবার শুরু করা ঠিক নয়।
শরীরের কোনো পরিবর্তন নিয়ে সন্দেহ হলে ইন্টারনেট থেকে তথ্য নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যকে নিজের রোগের চূড়ান্ত উত্তর না ধরে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই নিরাপদ পথ।
সূত্র:গালফ নিউজ



