logo

সয়াবিন স্বাস্থ্যকর হলেও সবার জন্য নয়, যাদের সতর্ক থাকা জরুরি

সয়াবিন স্বাস্থ্যকর হলেও সবার জন্য নয়, যাদের সতর্ক থাকা জরুরি
ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা

সয়াবিন উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। নিরামিষভোজীদের খাদ্যতালিকায় এটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। সয়াবিন থেকে টফু, সয়া দুধসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি হয়। এতে প্রোটিনের পাশাপাশি ফাইবার, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজও রয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই সবার জন্য একই রকম উপযোগী, এমন নয়। কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে সয়াবিন খাওয়ার পরিমাণ, ধরন বা সময় নিয়ে সতর্ক হতে হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে আবার সয়াবিনে অ্যালার্জির কারণে এটি পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হয়।

সম্প্রতি ভারতীয় একটি প্রতিবেদনে থাইরয়েডের সমস্যা, সয়াবিনে অ্যালার্জি, কিডনিতে পাথর, হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসার এবং হজমের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ের সবকটিতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মাত্রা এক নয়।

সয়াবিনে কী আছে?

সয়াবিনে উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডই রয়েছে। পাশাপাশি ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও বি ভিটামিনও পাওয়া যায়।

সয়াবিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আইসোফ্ল্যাভোন। এটি এক ধরনের ফাইটোইস্ট্রোজেন, যা মানুষের ইস্ট্রোজেনের তুলনায় অনেক দুর্বলভাবে কাজ করে। এই উপাদান নিয়েই সয়াবিনকে ঘিরে অনেক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে।

তবে সয়াবিনের সব ধরনের খাবার বা সাপ্লিমেন্টের প্রভাব এক নয়। পুরো সয়াবিন, টফু, সয়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত সয়া প্রোটিন এবং আইসোফ্ল্যাভোন সাপ্লিমেন্টকে একই জিনিস হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

সয়াবিনে অ্যালার্জি থাকলে

যাদের সয়াবিনে অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয়।

সয়াবিন একটি পরিচিত খাদ্য অ্যালার্জেন। খাওয়ার পর ত্বকে চুলকানি বা ফুসকুড়ি, পেটের অস্বস্তি, বমি, ঠোঁট বা মুখ ফুলে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর প্রতিক্রিয়া হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

যাদের চিকিৎসকের মাধ্যমে সয়াবিন অ্যালার্জি শনাক্ত হয়েছে, তাদের সয়াবিন ও সয়া-যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে কি সয়াবিন বাদ দিতে হবে?

সয়াবিন ও থাইরয়েড নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে এই জায়গাতেই।

ভারতীয় এক প্রতিবেদনে সয়াবিনের গয়ট্রোজেন নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং থাইরয়েড রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে বর্তমান গবেষণা অনুযায়ী, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেই সয়াবিন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, এমন সাধারণ নিয়ম নেই। Harvard T.H. Chan School of Public Health-এর পর্যালোচনায় ১৮টি র‌্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সয়া সাপ্লিমেন্ট থাইরয়েড-স্টিমুলেটিং হরমোন কিছুটা বাড়াতে পারে, কিন্তু থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পাওয়া যায়নি।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সয়া থাইরয়েডের ওষুধের শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হাইপোথাইরয়েডিজমের ওষুধ সেবন করলে সয়াবিন বা সয়া-জাত খাবার নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

অর্থাৎ থাইরয়েড রোগীর জন্য বিষয়টি পুরোপুরি নিষেধের নয়, বরং পরিমাণ ও ওষুধের সঙ্গে ব্যবধানের বিষয়।

কিডনিতে পাথর থাকলে কি সয়াবিন এড়িয়ে চলবেন?

সয়াবিনে অক্সালেট রয়েছে। তাই ক্যালসিয়াম অক্সালেট ধরনের কিডনিতে পাথরের ইতিহাস থাকলে খাদ্যতালিকায় অক্সালেটের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

তবে শুধু সয়াবিন খেলেই কিডনিতে পাথর হবে, এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

কিডনিতে পাথর হওয়ার পেছনে পানি কম পান করা, প্রস্রাবে বিভিন্ন খনিজের মাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, বংশগত প্রবণতা এবং পাথরের ধরনসহ একাধিক কারণ থাকে।

তাই আগে কিডনিতে পাথর হয়েছে বলেই নিজের সিদ্ধান্তে সব সয়া-জাতীয় খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়। পাথরের ধরন জানা থাকলে খাদ্যতালিকা আরও নির্দিষ্টভাবে ঠিক করা যায়।

হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসার থাকলে কী করবেন?

সয়াবিনে আইসোফ্ল্যাভোন থাকায় হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসারের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে।

হরমোন-নির্ভর ক্যানসারের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা বলা হয়।

কিন্তু সয়াবিন খেলেই স্তন ক্যানসার বা অন্য কোনো হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান মানব গবেষণা সমর্থন করে না। Harvard-এর পর্যালোচনায় দেখা যায়, মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাগুলোতে সয়া খাবার খাওয়ার সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিতও রয়েছে।

তবে ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালে সয়া সাপ্লিমেন্ট বা উচ্চমাত্রার আইসোফ্ল্যাভোন নেওয়া আলাদা বিষয়। ক্যানসারের ধরন ও চিকিৎসা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সয়াবিন খেলে যাদের পেটের সমস্যা হয়

সয়াবিনে প্রোটিন ও ফাইবার থাকায় কারও কারও বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা হজমের অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে হঠাৎ খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে সয়া যোগ করলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাতেও অতিরিক্ত সয়াবিন খাওয়ার সঙ্গে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যার কথা বলা হয়েছে।

এ ধরনের সমস্যা হলে সয়াবিন পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আগে পরিমাণ কমিয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। সমস্যা নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সয়া দুধ, টফু আর সয়াবিন কি একই?

পুষ্টির দিক থেকে এগুলো একই উৎসের খাবার হলেও শরীরে প্রভাব একেবারে একই হবে, এমন নয়।

সয়াবিন, টফু, সয়া দুধ, টেম্পে, এডামামে এবং সয়া প্রোটিন পাউডারে প্রোটিন ও আইসোফ্ল্যাভোনের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। Harvard-এর তথ্য অনুযায়ী, রান্না করা আধা কাপ সয়াবিনে প্রায় ১৫ গ্রাম প্রোটিন এবং ৫৫ মিলিগ্রাম আইসোফ্ল্যাভোন রয়েছে। অন্যদিকে আধা কাপ এডামামে বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টফুতে পরিমাণ ভিন্ন।

তাই কোনো একটি সয়া খাবারের তথ্য দেখে সব ধরনের সয়া-জাতীয় খাবার সম্পর্কে একই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

সয়াবিনের উপকারও আছে

সয়াবিনকে শুধু ক্ষতিকর খাবার হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

এটি উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস এবং এতে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। Harvard-এর Nutrition Source অনুযায়ী, নিয়মিত খাদ্যতালিকায় সয়া খাবার অন্তর্ভুক্ত করা বেশির ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ এবং বিশেষ করে লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিবর্তে সয়া খাবার খেলে খাদ্যতালিকার সামগ্রিক গুণমান ভালো হতে পারে।

তাই সয়াবিন নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ারও প্রয়োজন নেই।

কতটা সয়াবিন খাওয়া নিরাপদ?

সবার জন্য একই পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ বয়স, শারীরিক অবস্থা, মোট খাদ্যতালিকা এবং নির্দিষ্ট রোগের ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে।

সাধারণভাবে সুস্থ ব্যক্তির খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে সয়া খাবার রাখা যেতে পারে। Harvard-এর তথ্য অনুযায়ী, সয়া পুষ্টিকর খাবার এবং সপ্তাহে কয়েকবার, এমনকি তার চেয়েও বেশি নিয়মিত খাওয়া বেশির ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ হতে পারে।

তবে সয়া প্রোটিন বা আইসোফ্ল্যাভোনের উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্টকে সাধারণ সয়া খাবারের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।

সয়াবিন স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নয়। সয়াবিনে অ্যালার্জি থাকলে এটি এড়িয়ে চলতে হবে। থাইরয়েডের ওষুধ সেবনকারী, বারবার কিডনিতে পাথর হওয়া ব্যক্তি বা ক্যানসারের চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় সয়াবিন রাখার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

তবে থাইরয়েডের সমস্যা আছে বা হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে বলেই সয়াবিন সবার জন্য নিষিদ্ধ, এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। সয়াবিনের ধরন, পরিমাণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা