অক্টোবরে কোন মাছ খাওয়ায় ঝুঁকি থাকতে পারে, জানুন সতর্কতার কারণ

মাছ বাঙালির খাবারের অন্যতম পরিচিত অংশ। ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল, ভাজা কিংবা সর্ষে দিয়ে রান্না, খাবারের তালিকায় মাছ থাকেই। তবে বছরের সব সময় সব ধরনের মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে একই রকম সতর্কতা প্রয়োজন হয় না। মাছের প্রজাতি, তার আকার, কোথা থেকে ধরা হয়েছে এবং পানির পরিবেশের ওপর মাছের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে।
অক্টোবর মাসে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একদিকে এ সময় কিছু মাছের প্রজনন মৌসুম থাকে, অন্যদিকে বর্ষার পর নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের পানিতে বিভিন্ন ধরনের দূষিত পদার্থ মেশার আশঙ্কা থাকে। আবার বড় শিকারি মাছের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে পারদসহ কিছু দূষক জমতে পারে।
তাই অক্টোবরে মাছ খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং মাছ বাছাই এবং উৎস সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
বড় শিকারি মাছের ক্ষেত্রে কেন সতর্কতা
মাছের মধ্যে বড় শিকারি প্রজাতি সাধারণত খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের দিকে থাকে। তারা ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খাওয়ার কারণে শরীরে কিছু দূষক, বিশেষ করে পারদ, তুলনামূলক বেশি জমতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শে বড় শিকারি মাছের অতিরিক্ত খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। হাঙর, সোর্ডফিশ, কিং ম্যাকারেল এবং বড় আকারের কিছু টুনা এ ধরনের মাছের উদাহরণ। এর অর্থ এই নয় যে এই মাছ একবার খেলেই শরীরের ক্ষতি হবে। মূল বিষয় হলো দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পরিমাণে দূষকযুক্ত মাছ খাওয়ার সম্ভাবনা কমানো।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং ছোটদের ক্ষেত্রে মাছ বাছাইয়ের সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বর্ষার পর মাছ কেনার সময় দরকার বাড়তি সতর্কতা
বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে নদী, খাল, বিল ও পুকুরের পানির সঙ্গে নর্দমা, কৃষিজমির রাসায়নিক, শিল্পবর্জ্য কিংবা অন্যান্য দূষিত পদার্থ মিশে যেতে পারে। সেই পানিতে থাকা মাছও দূষণের সংস্পর্শে আসতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে বর্ষা বা বর্ষার পর সব মাছই দূষিত হয়ে যায়। বরং মাছের উৎস এবং জলাশয়ের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক একটি স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দূষিত পানি থেকে ধরা মাছ দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক মনে হলেও তাতে জীবাণু বা রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে বন্যার পানিতে ধরা মাছের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তাই অজানা উৎসের মাছের চেয়ে নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে মাছ কেনা নিরাপদ অভ্যাস।
ইলিশের ক্ষেত্রে অক্টোবর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জন্য অক্টোবর মাসে ইলিশের বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য ২০২৬ সালে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এই সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, কেনাবেচা ও বিনিময়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
অর্থাৎ এই সময় ইলিশ না খাওয়ার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এর সঙ্গে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের বিষয়ও জড়িত।
প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখা।
ছোট মাছ কি তুলনামূলক ভালো?
মাছের আকার ও খাদ্যশৃঙ্খলে অবস্থানের সঙ্গে শরীরে কিছু দূষক জমার সম্পর্ক রয়েছে। বড় শিকারি মাছের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাই বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরামর্শে ছোট মাছ বা ছোট আকারের প্রজাতিকে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের সঙ্গে রাখার কথা বলা হয়।
তবে শুধু মাছ ছোট হলেই সেটি নিশ্চিতভাবে নিরাপদ, এমন বলা যায় না। মাছটি কোন জলাশয় থেকে এসেছে এবং সেই জলাশয় কতটা দূষিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অক্টোবরে মাছ কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
মাছ কেনার সময় কয়েকটি সাধারণ বিষয় খেয়াল করলে নষ্ট বা নিম্নমানের মাছ কেনার ঝুঁকি কমানো যায়।
চোখ দেখুন: তাজা মাছের চোখ সাধারণত স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকে। অতিরিক্ত ঘোলাটে বা বসে যাওয়া চোখ সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
ফুলকা দেখুন: তাজা মাছের ফুলকা সাধারণত উজ্জ্বল লালচে বা গোলাপি দেখায়। অস্বাভাবিক বিবর্ণতা থাকলে সতর্ক থাকুন।
গন্ধ পরীক্ষা করুন: মাছ থেকে তীব্র পচা বা অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে সেটি না কেনাই ভালো।
মাংসের দৃঢ়তা দেখুন: মাছের শরীর অতিরিক্ত নরম বা চাপ দিলে অস্বাভাবিকভাবে বসে গেলে সতর্ক হওয়া উচিত।
উৎস সম্পর্কে জানুন: সম্ভব হলে মাছ কোথা থেকে এসেছে এবং কতক্ষণ আগে ধরা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করুন।
শুধু ভালোভাবে রান্না করলেই কি সব ঝুঁকি দূর হয়?
না। ভালোভাবে রান্না করলে অনেক জীবাণু ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু মাছের শরীরে থাকা সব ধরনের রাসায়নিক দূষক রান্নার মাধ্যমে দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষ করে দূষিত বন্যার পানি থেকে ধরা মাছের ক্ষেত্রে শুধু ধুয়ে বা ভালোভাবে রান্না করে নিরাপদ করা যাবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞরা এমন মাছের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তাই নিরাপদ উৎস থেকে মাছ কেনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় মাছ খাওয়া কি বন্ধ করে দিতে হবে?
একেবারেই নয়। মাছ উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস এবং অনেক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ থাকে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বরং একই ধরনের মাছ নিয়মিত বেশি খাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এতে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির সম্ভাব্য দূষকের সংস্পর্শ অতিরিক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
আমাদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
বাংলাদেশে অক্টোবর মাসে ইলিশের ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৮ থেকে ২৯ অক্টোবরের নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ কেনাবেচা বা পরিবহন না করাই শুধু আইনি বিষয় নয়, ইলিশের প্রজনন রক্ষার সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
এ ছাড়া বন্যা বা জলাবদ্ধতার পানি থেকে ধরা অজানা উৎসের মাছ কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা উচিত। মাছ দেখতে স্বাভাবিক হলেই সেটি নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অক্টোবর এলেই সব ধরনের মাছ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং মাছের ধরন, আকার, উৎস এবং মৌসুম বিবেচনা করে মাছ বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
বড় শিকারি মাছ অতিরিক্ত খাওয়ার ক্ষেত্রে দূষকের ঝুঁকি বিবেচনা করা দরকার। আর বাংলাদেশে অক্টোবরের ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ না কেনা ও না খাওয়ার মাধ্যমে প্রজনন মৌসুমে মাছ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাছকে ভয় পাওয়ার নয়, সচেতনভাবে মাছ বেছে নেওয়ার অভ্যাস করা। নিরাপদ উৎসের মাছ কিনুন, ভালোভাবে সংরক্ষণ করুন এবং যথাযথভাবে রান্না করে খান।
সূত্র: নিউজ ১৮
