logo

সর্দি-কাশিতে আইসক্রিম খাওয়া যাবে? জানুন চিকিৎসক কী বলছেন

সর্দি-কাশিতে আইসক্রিম খাওয়া যাবে? জানুন চিকিৎসক কী বলছেন
ছবি: কার্নেশন

সর্দি, কাশি বা গলা ব্যথা হলেই বাড়ির বড়দের কাছ থেকে একটি পরামর্শ প্রায়ই শোনা যায়, ঠান্ডা কিছু খাওয়া যাবে না। বিশেষ করে আইসক্রিম যেন এই সময় একেবারেই নিষিদ্ধ। অনেকের ধারণা, আইসক্রিম খেলে সর্দি বেড়ে যায়, কফ জমে যায় কিংবা ভাইরাস আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু বিষয়টি কি সত্যিই এমন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, সর্দি হলে আইসক্রিম খাওয়া সবার জন্য নিষেধ নয়। সাধারণ সর্দি মূলত ভাইরাসের কারণে হয়। আইসক্রিম খেলে সেই ভাইরাস দ্রুত বাড়তে শুরু করে বা সর্দির সংক্রমণ আরও খারাপ হয়ে যায়, এমন প্রমাণ নেই। তবে ঠান্ডা খাবারে প্রত্যেকের শরীরের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। কারও গলা সাময়িকভাবে আরাম পেতে পারে, আবার কারও গলা বেশি খুসখুস করতে পারে বা কাশি বাড়তে পারে।


সর্দি হলে আইসক্রিম খাওয়া কি নিরাপদ?

সাধারণভাবে, পরিমিত পরিমাণে আইসক্রিম খাওয়া যেতে পারে, যদি তা খেলে আপনার গলা বা শরীরে অস্বস্তি না হয় এবং দুধজাত খাবার হজমে সমস্যা না থাকে।

ভারতের অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ড হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ রোগ বিশেষজ্ঞ বাসবরাজ এস কুম্বার জানিয়েছেন, ভাইরাসজনিত সর্দি হয়েছে বলেই ঠান্ডা খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আইসক্রিম সর্দির ভাইরাসকে দ্রুত বংশবিস্তার করতে সাহায্য করে না।

অর্থাৎ সর্দি হয়েছে মানেই আইসক্রিম নিষিদ্ধ, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

আইসক্রিম কি কফ বাড়ায়?

এটি সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি। অনেকেই মনে করেন দুধ, দই বা আইসক্রিমের মতো দুধজাত খাবার খেলে শরীরে বেশি কফ তৈরি হয়।

কিন্তু মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, দুধ শরীরে অতিরিক্ত কফ তৈরি করে, এমন প্রমাণ নেই। দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার পর মুখ ও গলায় সাময়িকভাবে একটু ঘন বা আস্তরণের মতো অনুভূতি হতে পারে। সেটিকে অনেক সময় অতিরিক্ত কফ হিসেবে মনে হয়।

তাই আইসক্রিম খেলেই শরীরে বেশি কফ তৈরি হবে, এমনটা বলা ঠিক নয়।


তাহলে আইসক্রিম খেলে কারও গলা আরাম পায় কেন?

ঠান্ডা খাবার গলার সংবেদন কিছু সময়ের জন্য কমিয়ে দিতে পারে। ফলে গলা ব্যথা বা জ্বালাপোড়ায় সাময়িক আরাম অনুভূত হতে পারে।

বিশেষ করে গলা ব্যথার সময় ঠান্ডা বা জমাট খাবার কিছু মানুষের কাছে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। মায়ো ক্লিনিকও গলা ব্যথার ক্ষেত্রে আইসক্রিম, জমাট ফলের খাবার বা ঠান্ডা পানীয় সাময়িক আরাম দিতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।

তবে এই আরাম সাময়িক। আইসক্রিম সর্দির ভাইরাস সারিয়ে দেয় না।

আবার কারও কাশি বাড়তে পারে কেন?

একই খাবার সবার শরীরে একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না।

কেউ আইসক্রিম খাওয়ার পর গলায় ঠান্ডা অনুভূতি পেয়ে স্বস্তি পেতে পারেন। আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে ঠান্ডা খাবার গলার অস্বস্তি, কাশি বা নাক বন্ধ থাকার অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাই আইসক্রিম খাওয়ার পর যদি নিজের গলার অবস্থা খারাপ মনে হয়, তখন সেটি না খাওয়াই ভালো।

সর্দির সময় কখন আইসক্রিম এড়িয়ে চলবেন?

সর্দি হলেই আইসক্রিম বাদ দিতে হবে না। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটি এড়িয়ে চলা ভালো হতে পারে। যেমন-

  • আইসক্রিম খেলে গলা বেশি ব্যথা বা জ্বালা করলে
  • কাশি স্পষ্টভাবে বেড়ে গেলে
  • গিলতে সমস্যা হলে
  • বমি বা ডায়রিয়া থাকলে
  • দুধজাত খাবার খেলে সাধারণত পেটের সমস্যা হলে
  • খুব বেশি অসুস্থ বোধ করলে এবং সহজপাচ্য খাবার প্রয়োজন হলে

বিশেষ করে দুধজাত খাবার আপনার হজমে সমস্যা তৈরি করলে অসুস্থ অবস্থায় আইসক্রিম খেয়ে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।

সর্দি হলে কী খাওয়ার দিকে বেশি নজর দেবেন?

আইসক্রিম খাবেন কি না, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরে পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি পৌঁছানো।

সর্দির সময় পর্যাপ্ত তরল পান করা জরুরি। পানি, স্যুপ ও ঝোলজাতীয় খাবার শরীরে তরলের ঘাটতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। গলা অস্বস্তিকর হলে উষ্ণ তরলও সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।

পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সর্দির নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

আইসক্রিম কি সর্দি সারাতে পারে?

না। আইসক্রিম সর্দির চিকিৎসা নয়।

আইসক্রিম খেলে কারও গলা সাময়িকভাবে আরাম পেতে পারে, কিন্তু এটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। একইভাবে গরম চা, স্যুপ বা অন্য কোনো খাবারও সাধারণ সর্দির মূল ভাইরাসকে সরাসরি ধ্বংস করে না।

সর্দির সময় এসব খাবার মূলত শরীরকে আরাম দিতে এবং পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টি পেতে সাহায্য করতে পারে।

সর্দির সময় দুধ কি বন্ধ করতে হবে?

শুধু সর্দি হয়েছে বলে দুধ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, দুধ শরীরে বেশি কফ তৈরি করে, এমন ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং অসুস্থ অবস্থায় দুধজাত খাবার কারও জন্য পুষ্টি ও ক্যালরি পাওয়ার একটি উপায় হতে পারে।

তবে দুধ খেলে যদি আপনার পেট ফাঁপা, পেট ব্যথা বা অন্য কোনো হজমের সমস্যা হয়, তাহলে অসুস্থ অবস্থায় সেটি এড়িয়ে চলাই আরামদায়ক হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

সাধারণ সর্দি বেশির ভাগ সময় নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সব ধরনের সর্দি বা কাশি সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি নয়।

শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে, চার দিনের বেশি জ্বর থাকলে বা ১০ দিনের বেশি সময়েও উপসর্গের উন্নতি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। উপসর্গ কিছুটা ভালো হওয়ার পর আবার জ্বর বা কাশি বেড়ে গেলেও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার।

সর্দি হলে আইসক্রিম খাওয়া যাবে না, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দিতে পরিমিত আইসক্রিম খেলে সর্দি আরও খারাপ হয়ে যায় বা ভাইরাস দ্রুত বাড়তে থাকে, এমন প্রমাণ নেই। দুধজাত খাবার বেশি কফ তৈরি করে, এমন ধারণারও শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

তবে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আইসক্রিম খেলে যদি গলা আরাম পায়, পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন। আবার খেলে যদি কাশি বা গলার অস্বস্তি বাড়ে, তখন কিছুদিন এড়িয়ে চলাই ভালো। সর্দির সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত তরল, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ।

সূত্র: এনডিটিভি