Advertisement

ডায়াবেটিস ছাড়াও বাড়তে পারে রক্তে শর্করা, কখন সতর্ক হবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ডায়াবেটিস ছাড়াও বাড়তে পারে রক্তে শর্করা, কখন সতর্ক হবেন
ডায়াবেটিস ছাড়াও বাড়তে পারে রক্তে শর্করা।

রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার কথা শুনলেই অনেকের মনে প্রথমে ডায়াবেটিসের কথা আসে। কিন্তু রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা বাড়লেই যে একজনের ডায়াবেটিস আছে, এমন নয়।

Advertisement

আমরা যখন ভাত, রুটি, আলু, মিষ্টি বা অন্য কোনো শর্করাজাতীয় খাবার খাই, তখন হজমের পর সেগুলো থেকে গ্লুকোজ তৈরি হয়। এই গ্লুকোজ রক্তে মিশে যায় এবং শরীরের কোষগুলো সেটি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে খাবারের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু সময়ের জন্য রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে।

স্বাভাবিক অবস্থায় অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন বের হয়। এটি রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের কোষে ঢুকতে সাহায্য করে। ফলে খাবারের পর বাড়তে থাকা রক্তে শর্করা ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে।

তবে কখনো কখনো ডায়াবেটিস না থাকা মানুষেরও রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যেতে পারে। এর পেছনে খাবার, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, অসুস্থতা কিংবা শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ধরনসহ নানা কারণ থাকতে পারে।


খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়া স্বাভাবিক

খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কিছুটা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভাত, রুটি, আলু, মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার বেশি খেলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়তে পারে।

সুস্থ শরীর সাধারণত এই বাড়তি গ্লুকোজ সামলাতে পারে। অগ্ন্যাশয় প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন তৈরি করে এবং রক্তে বেড়ে যাওয়া গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। কিছু গ্লুকোজ আবার যকৃত ও পেশিতে জমা থাকে।

তাই একবার খাবারের পর রক্তে শর্করা কিছুটা বেড়ে গেলেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

মিষ্টি বা বেশি শর্করাজাতীয় খাবার খেলে কী হয়?

একবারে অনেক মিষ্টি বা সহজে হজম হয় এমন শর্করাজাতীয় খাবার খেলে রক্তে শর্করা তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে পারে।

যেমন, খালি পেটে মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় বা পরিশোধিত ময়দার তৈরি খাবার খেলে শরীরে দ্রুত গ্লুকোজ পৌঁছাতে পারে। এর বিপরীতে আঁশযুক্ত খাবার, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্যের খাবার তুলনামূলক ধীরে হজম হয়। ফলে রক্তে শর্করার ওঠানামাও তুলনামূলক ধীর হতে পারে।

তবে কোনো একটি খাবার খেলেই সবার রক্তে শর্করা একইভাবে বাড়বে, এমন নয়। বয়স, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, খাবারের পরিমাণ এবং শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতা এর ওপর প্রভাব ফেলে।


মানসিক চাপেও রক্তে শর্করা বাড়তে পারে

অনেকেই জানেন না, মানসিক চাপও রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

শরীর যখন চাপ বা উদ্বেগের মধ্যে থাকে, তখন কিছু হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এসব হরমোন শরীরকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে। এর একটি প্রভাব হলো রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।

তাই পরীক্ষার আগে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের সময় বা দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে কারও রক্তে শর্করার মাত্রায় সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

ঘুম কম হলেও প্রভাব পড়তে পারে

ঘুমের অভ্যাসও শরীরের বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। নিয়মিত কম ঘুমানো, রাত জাগা বা ঘুমের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন শরীরের হরমোন ও বিপাকক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অসুস্থ হলে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে

শরীরে সংক্রমণ বা অন্য কোনো অসুস্থতা হলে রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। কারণ অসুস্থতার সময় শরীর নানা ধরনের হরমোন তৈরি করে, যা শরীরকে সংক্রমণ বা শারীরিক চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে। এসব পরিবর্তনের কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও বাড়তে পারে।

তাই জ্বর, সংক্রমণ বা অন্য কোনো অসুস্থতার সময় রক্তে শর্করা একটু বেশি পাওয়া গেলেই যে ডায়াবেটিস হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কিছু ওষুধও রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে

কিছু ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কিছু ধরনের প্রদাহ কমানোর ওষুধ বা হরমোনজাতীয় ওষুধের ক্ষেত্রে এমন প্রভাব দেখা যেতে পারে।

তাই কোনো ওষুধ খাওয়ার পর রক্তে শর্করার অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

রক্তে শর্করা বারবার বেশি থাকলে কী হতে পারে?

এখানেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

একবার খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়া স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু যদি বারবার রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে শরীর ইনসুলিনকে আগের মতো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে না কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এটি ইনসুলিন প্রতিরোধের একটি লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় ইনসুলিন প্রতিরোধের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। রক্ত পরীক্ষা করার পর বিষয়টি ধরা পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা থাকলে পরবর্তী সময়ে প্রাক্‌-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

প্রাক্‌-ডায়াবেটিস কী?

প্রাক্‌-ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা, যখন রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু এখনো ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এই অবস্থায় অনেকের কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও রক্ত পরীক্ষায় প্রাক্‌-ডায়াবেটিস ধরা পড়তে পারে।

শরীরের ওজন বেশি থাকা, বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি, শারীরিক পরিশ্রম কম করা এবং পারিবারিক ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় প্রাক্‌-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

খাওয়ার পর দুর্বল লাগলে কি রক্তে শর্করা বেড়ে গেছে?

সব সময় নয়।

অনেকেই খাবার খাওয়ার পর ঘুম ঘুম ভাব, দুর্বলতা, কাঁপুনি বা অস্বস্তি অনুভব করেন। এসব লক্ষণ দেখেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে রক্তে শর্করা বেড়ে গেছে।

বরং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রক্তে শর্করা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। একে খাবারের পর রক্তে শর্করা কমে যাওয়া বলা হয়। এতে কাঁপুনি, ঘাম, ক্ষুধা, মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, মাথাব্যথা বা হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ একই ধরনের অস্বস্তি কখনো রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার কারণে, আবার কখনো কমে যাওয়ার কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

বাড়িতে রক্তে শর্করা মাপলে কী বুঝবেন?

অনেকে এখন বাড়িতে যন্ত্র দিয়ে রক্তে শর্করা মাপেন। এটি শরীরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে একটি মাত্র ফল দেখে নিজের রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়।

কখন রক্তে শর্করা মাপা হয়েছে, তার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে। খালি পেটে, খাবারের আগে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা এক হবে না।

এ ছাড়া এক দিনের একটি ফল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রক্তে শর্করার অবস্থা বোঝা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা করে বিষয়টি মূল্যায়ন করেন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

রক্তে শর্করা বারবার বেশি পাওয়া গেলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

বিশেষ করে যদি অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা বা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কারণ এসব উপসর্গ বিভিন্ন কারণে হতে পারে, তবে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকার সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক থাকতে পারে।

রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে কী করবেন?

রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।

প্রথমত, একসঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি বা শর্করাজাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।

দ্বিতীয়ত, খাবারে শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা দরকার।

চতুর্থত, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

আর শরীরের ওজন বেশি হলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করা উপকারী হতে পারে।

ডায়াবেটিস না থাকলেও রক্তে শর্করা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। খাবারের পর এমন বৃদ্ধি শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ। বেশি শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়া, মানসিক চাপ, অসুস্থতা, ঘুমের সমস্যা এবং কিছু ওষুধের কারণেও রক্তে শর্করার মাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে রক্তে শর্করা যদি বারবার অস্বাভাবিকভাবে বেশি পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে শুধু খাবারের প্রভাব বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এর পেছনে ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করা বা প্রাক্‌-ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি মাত্র রক্ত পরীক্ষার ফল দেখে ভয় পাওয়া বা নিজে নিজে রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। নিয়মিত অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সুত্র: এনডিটিভি