logo

সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি কেন বেশি

সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি কেন বেশি
ছবি: সাইডেভ.নেট

এইচআইভি বা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস এমন এক ভাইরাস, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণ থেকে সহজেই এইডস হতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং সংক্রমিত ব্যক্তিরাও দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন গবেষণা। এর পেছনে শুধু শারীরিক বা জৈবিক কারণই না বরং সামাজিক বৈষম্য, যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসাসেবা পেতে বাধার মতো বিষয়গুলোও কাজ করে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, সমকামী হওয়া মানেই কারও এইচআইভি হবে, বিষয়টা এমন না। যৌন অভিমুখিতা নিজ থেকে কোনো সংক্রমণ ঘটায় না। বরং কোন ধরনের যৌনসম্পর্ক হচ্ছে, প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং সঙ্গীর এইচআইভি সংক্রমণ আছে কি না- এসব বিষয়গুলো ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণ কী?

পায়ুপথে যৌনসম্পর্কে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি

সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের সময় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। তবে এই ধরনের যৌনসম্পর্ক শুধু সমকামী পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নারী-পুরুষের মধ্যেও এমন যৌনসম্পর্ক হতে পারে যা সমান ঝুঁকিপূর্ণ।

পায়ুপথের ভেতরের আবরণ তুলনামূলক পাতলা ও সংবেদনশীল। যৌনসম্পর্কের সময় সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি হলে সংক্রমিত ব্যক্তির বীর্য, প্রাক্-বীর্য বা মলদ্বারের তরলের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার সুযোগ থাকে।

বিশেষ করে যে সঙ্গী পায়ুপথে প্রবেশকারী যৌনাঙ্গ গ্রহণ করেন, তার সংক্রমণের ঝুঁকেই তুলনামূলক বেশি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, অন্য সঙ্গীরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কনডম ব্যবহার এবং চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি কমানো যায়।

সঙ্গীর এইচআইভি সংক্রমণ সম্পর্কে না জানা

একটা বিষয় বোঝা জরুরি, কোনো ব্যক্তি এইচআইভিতে আক্রান্ত কি না, তা শুধু কারও চেহারা বা শারীরিক অবস্থা দেখে বোঝা যায় না। অনেকের সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণও থাকে না। ফলে পরীক্ষা না করালে একজন ব্যক্তি নিজের সংক্রমণ সম্পর্কেও দীর্ঘদিন অজ্ঞাত থাকতে পারেন।

যদি কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভির বিস্তার তুলনামূলক বেশি হয়, তাহলে সেই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত সঙ্গীর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। এখানে বুঝতে হবে, এটি একটি জনগোষ্ঠীগত ঝুঁকি, প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই রকম নয়।

নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা, সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কনডম ব্যবহার না করা

যৌনসম্পর্কের সময় কনডম ব্যবহার না করলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখতে হবে, প্রতিবার যৌনসম্পর্কে নতুন কনডম ব্যবহার করা এবং ব্যবহারের আগে মেয়াদ ও প্যাকেটের অবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি। কনডম ছিঁড়ে গেলে বা সরে গেলে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুবিধাজনক।

খেয়াল রাখবেন, কনডম এইচআইভির পাশাপাশি অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করে। তবে এটি শতভাগ সুরক্ষা কখনই নিশ্চিত করে না। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য প্রতিরোধব্যবস্থাও বিবেচনা করা উচিত।

একাধিক যৌনসঙ্গী এবং অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণ

একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলেই কারও এইচআইভি হবে, এমন নয়। তবে সঙ্গীর সংখ্যা বাড়লে সংক্রমিত কারও সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকলে।

এ ছাড়া সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া বা হারপিসের মতো অন্য যৌনবাহিত সংক্রমণ থাকলে যৌনাঙ্গ বা আশপাশের টিস্যুতে প্রদাহ কিংবা ক্ষত তৈরি হতে পারে। এর ফলে কিছু পরিস্থিতিতে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা এবং সংক্রমণ শনাক্ত হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

সামাজিক বৈষম্য ও চিকিৎসাসেবা পেতে বাধা

এইচআইভির ঝুঁকির পেছনে সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে সমকামী ও উভকামী পুরুষেরা যৌন অভিমুখিতার কারণে বৈষম্য, অপমান বা হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করেন।

এই ভয়ের কারণে কেউ কেউ চিকিৎসকের কাছে নিজের যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে চান না। কেউ এইচআইভি পরীক্ষা করাতে দেরি করেন, আবার কেউ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পরও চিকিৎসা শুরু করতে বা নিয়মিত চালিয়ে যেতে বাধার মুখে পড়েন।

ফলে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে দেরি হতে পারে। নিরাপদ, গোপনীয়তা-সম্মত এবং বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা তাই এইচআইভি প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এইচআইভি প্রতিরোধের উপায় কী?

এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর জন্য বেশ কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন-

কনডম ব্যবহার করুন: প্রতিবার যৌনসম্পর্কে সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করলে এইচআইভি ও অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

নিয়মিত পরীক্ষা করান: যৌনসম্পর্কের ধরন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে এইচআইভি পরীক্ষা করানো উচিত। সম্ভাব্য সংক্রমণের পরপরই পরীক্ষা করলে সব সময় সংক্রমণ শনাক্ত নাও হতে পারে। তাই পরীক্ষার সঠিক সময় সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা PrEP সম্পর্কে জানুন: এইচআইভি নেই, এমন ব্যক্তি যাদের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে PrEP নিতে পারেন। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই ওষুধ যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে।

সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর দ্রুত চিকিৎসা নিন: কনডম ছিঁড়ে যাওয়া বা সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে এমন যৌনসম্পর্কের পর PrEP নয়, বরং পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা PEP প্রয়োজন হতে পারে। এই ওষুধ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা জরুরি এবং সাধারণত সম্ভাব্য সংস্পর্শের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করতে হবে।

এইচআইভি থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নিন: অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি বা ART নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসায় ভাইরাসের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে শনাক্তের সীমার নিচে থাকলে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি U=U, অর্থাৎ Undetectable = Untransmittable নামে পরিচিত।


এইচআইভি কি সাধারণ স্পর্শে ছড়ায়?

না। হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা, একই টেবিলে খাওয়া, একই টয়লেট ব্যবহার করা কিংবা পাশাপাশি বসার মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। সাধারণ চুম্বন, লালা, ঘাম বা মশার কামড়ের মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়ায় না।

সাধারণত এইচআইভি ছড়ায় নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক তরলের মাধ্যমে। যেমন রক্ত, বীর্য, মলদ্বারের তরল, যোনির তরল ও বুকের দুধ। সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে এসব তরলের সংস্পর্শের ধরন এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।

তাই এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ না করে তার চিকিৎসা, গোপনীয়তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের জৈবিক ঝুঁকি, কনডম ব্যবহার না করা, সংক্রমণ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে এই ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কার্যকর উপায় আছে।

যৌন অভিমুখিতা দিয়ে কারও সংক্রমণের অবস্থা নির্ধারণ হয় না। সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা, কনডম ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী PrEP বা PEP গ্রহণ এবং সংক্রমণ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা এইচআইভি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সূত্র: ভেরি ওয়েল হেল্থ