অ্যাসিডিটি ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন, পেটের এই ব্যথা হতে পারে বিপদের সংকেত

খাওয়ার পর পেটের ওপরের দিকে জ্বালা, অস্বস্তি বা ব্যথা হলে অনেকেই সেটিকে গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা বলে ধরে নেন। কখনও কখনও সাধারণ বদহজমের কারণেও এমন হতে পারে। তবে ব্যথা যদি হঠাৎ তীব্র হয়, দীর্ঘক্ষণ থাকে বা পেট থেকে পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিষয়টি শুধু অ্যাসিডিটি নাও হতে পারে। এটি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণও হতে পারে।
সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া বক্তব্যে নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটস অফ মেডিকেল সায়েন্সেসের (AIIMS) গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হিউম্যান নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ডা. প্রমোদ গর্গ এমন ব্যথাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, তীব্র ও স্থায়ী ওপরের পেটের ব্যথা, বিশেষ করে যা পিঠের দিকে ছড়িয়ে যায়, অগ্ন্যাশয়ের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
প্যানক্রিয়াটাইটিস কী
অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস পেটের পেছনে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি খাবার হজমে প্রয়োজনীয় এনজাইম তৈরি করে। পাশাপাশি ইনসুলিনসহ বিভিন্ন হরমোন তৈরির মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হলে তাকে প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়। এটি হঠাৎ শুরু হলে তাকে অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে চললে সেটি ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে।
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে হজমের জন্য তৈরি এনজাইম অস্বাভাবিকভাবে অগ্ন্যাশয়ের ভেতরেই সক্রিয় হয়ে গেলে অঙ্গটির কোষে ক্ষতি ও প্রদাহ তৈরি হতে পারে।
অ্যাসিডিটির সঙ্গে কীভাবে গুলিয়ে যেতে পারে
সাধারণ বদহজম বা অ্যাসিডিটির ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, ঢেঁকুর, অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি বা বুক-পেট জ্বালাপোড়া হতে পারে। কিন্তু প্যানক্রিয়াটাইটিসে সাধারণত ওপরের পেটের ব্যথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এই ব্যথা কখনও পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
তাই শুধু ব্যথার জায়গা দেখে নিজে থেকে অ্যাসিডিটি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ব্যথা যদি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয় বা কমার বদলে বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যে ব্যথাকে গুরুত্ব দিতে হবে
প্যানক্রিয়াটাইটিসে ওপরের পেটের ব্যথা ধীরে ধীরে বা হঠাৎ শুরু হতে পারে। ব্যথা কয়েক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে এবং অনেকের ক্ষেত্রে পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। বমি বমি ভাব ও বমিও হতে পারে।
বিশেষভাবে সতর্ক হওয়ার মতো লক্ষণ হলো-
- ওপরের পেটে তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথা
- ব্যথা পিঠের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া
- বারবার বমি বা বমি বমি ভাব
- জ্বর বা কাঁপুনি
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
- পেট ফুলে যাওয়া বা স্পর্শে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- ত্বক বা চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া
এসব লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। গুরুতর প্যানক্রিয়াটাইটিসে শরীরের অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হতে পারে।
কেন হয় প্যানক্রিয়াটাইটিস
অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। পিত্তথলিতে পাথর এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ অন্যতম পরিচিত কারণ। এছাড়া রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা, কিছু ওষুধ, পেটে আঘাত এবং কিছু বংশগত বা শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও প্যানক্রিয়াটাইটিসের সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে পিত্তথলির পাথর পিত্তনালি বা অগ্ন্যাশয়ের নালিতে বাধা তৈরি করলে অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হতে পারে।
তাই প্যানক্রিয়াটাইটিস ধরা পড়লে শুধু ব্যথা কমানো নয়, কেন হয়েছে সেটিও খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারণটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতে আবার সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
গুরুতর হলে ফুসফুস ও কিডনিতেও প্রভাব পড়তে পারে
প্যানক্রিয়াটাইটিস শুধু অগ্ন্যাশয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। গুরুতর অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে শরীরে ব্যাপক প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এর ফলে ফুসফুস ও কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।
এই কারণেই তীব্র পেটব্যথাকে দিনের পর দিন গ্যাস বা অ্যাসিডিটি ভেবে ফেলে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে।
কীভাবে বোঝেন চিকিৎসক
শুধু উপসর্গ দেখে প্যানক্রিয়াটাইটিস নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ইমেজিং পরীক্ষা করেন।
পিত্তথলিতে পাথর আছে কি না দেখতে আল্ট্রাসাউন্ড উপকারী হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী CT স্ক্যান বা MRI করা হয়।
অর্থাৎ পেটব্যথা অ্যাসিডিটি নাকি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, সেটি বাড়িতে বসে নিশ্চিত করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের মূল্যায়ন করাই নিরাপদ।
চিকিৎসা কীভাবে হয়
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসা রোগের তীব্রতা ও কারণের ওপর নির্ভর করে। হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী শিরায় তরল, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সহায়তা এবং রোগীর বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ বা জটিলতা দেখা দিলে বিশেষ চিকিৎসা, এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
একবার ভালো হলেই কি ঝুঁকি শেষ
সবসময় নয়। প্যানক্রিয়াটাইটিসের একটি পর্ব সেরে যাওয়ার পরও কিছু রোগীর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বা পুনরায় প্রদাহ হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে ডা. প্রমোদ গর্গ জানিয়েছেন, প্যানক্রিয়াটাইটিসের পর কিছু রোগীর ডায়াবেটিসও দেখা দিতে পারে।
তাই রোগের কারণ অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা ও ফলোআপ গুরুত্বপূর্ণ। পিত্তথলির পাথর কারণ হলে পুনরায় প্যানক্রিয়াটাইটিস ঠেকাতে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পিত্তথলি অপসারণের পরামর্শ দিতে পারেন। ধূমপানও বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
হঠাৎ তীব্র ওপরের পেটের ব্যথা শুরু হলে, বিশেষ করে সেই ব্যথা পিঠে ছড়িয়ে পড়লে এবং সঙ্গে বমি, জ্বর, দ্রুত হৃদস্পন্দন বা শ্বাসকষ্ট থাকলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। তীব্র বা বাড়তে থাকা পেটব্যথা নিজেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কারণ হতে পারে।
সব পেটব্যথাই প্যানক্রিয়াটাইটিস নয় এবং সাধারণ অ্যাসিডিটিও খুব পরিচিত সমস্যা। কিন্তু ব্যথার ধরন অস্বাভাবিক হলে বা আগের তুলনায় অনেক বেশি হলে সেটিকে শুধু গ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শই পারে সাধারণ হজমের সমস্যা আর গুরুতর অসুস্থতার মধ্যে পার্থক্য করতে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


