logo

মাথাব্যথা ছাড়াও মস্তিষ্কের টিউমারে দেখা দিতে পারে যেসব উপসর্গ

মাথাব্যথা ছাড়াও মস্তিষ্কের টিউমারে দেখা দিতে পারে যেসব উপসর্গ
ছবি : এনডিটিভি

মাথাব্যথা, খিঁচুনি বা দৃষ্টির সমস্যা হলে অনেকেই মস্তিষ্কের কোনো সমস্যার কথা ভাবেন। কিন্তু মস্তিষ্কে টিউমার হলে সবসময় একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। টিউমার মস্তিষ্কের কোন অংশে তৈরি হয়েছে এবং কত দ্রুত বাড়ছে, তার ওপর উপসর্গ অনেকটাই নির্ভর করে।

কখনো কখনো স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন, মনোযোগ কমে যাওয়া, মেজাজের অস্বাভাবিক ওঠানামা কিংবা আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে শুরু হওয়ায় অনেকে এগুলোকে বয়স, মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনো সাধারণ কারণ বলে মনে করেন।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা মেজাজ পরিবর্তন হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমন নয়। এসব উপসর্গের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে বা এর সঙ্গে অন্য স্নায়বিক উপসর্গ যুক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন হতে পারে

মস্তিষ্কের কিছু অংশ শেখা, তথ্য মনে রাখা এবং স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত। সেই অংশে টিউমার হলে স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

যেমন, কেউ সাম্প্রতিক কথাবার্তা ভুলে যেতে পারেন, পরিচিত মানুষের নাম মনে করতে সমস্যা হতে পারে বা প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা ভুলে যেতে পারেন। একই সঙ্গে মনোযোগ ধরে রাখা, কোনো নির্দেশনা অনুসরণ করা কিংবা আগের মতো দ্রুত চিন্তা করার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাই প্রথমে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের আচরণ বা স্মৃতির পরিবর্তন সবসময় বুঝতে পারেন না।

মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তন

মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে আবেগ ও মেজাজের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। কারও অকারণে বিরক্তি বাড়তে পারে, আবার কারও মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা রাগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

আগে যে মানুষটি স্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিলেন, তিনি হঠাৎ অল্পতেই রেগে যেতে পারেন। আবার কেউ আগের তুলনায় বেশি চুপচাপ বা সামাজিকভাবে দূরে সরে যেতে পারেন।

তবে মেজাজের পরিবর্তন অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয় এবং এর সঙ্গে মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ নানা কারণ জড়িত থাকতে পারে। তাই শুধু এই একটি লক্ষণ দেখে মস্তিষ্কের টিউমারের কথা ভাবা ঠিক নয়।

ব্যক্তিত্ব ও আচরণ বদলে যেতে পারে

কখনো মস্তিষ্কের টিউমারের কারণে একজন মানুষের আচরণে এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা পরিবারের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।

কেউ হঠাৎ বেশি রাগী বা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন। কেউ আবার আগের তুলনায় বেশি আবেগপ্রবণ, চুপচাপ বা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে পারেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিচারবোধ এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে উপযুক্ত আচরণ করার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল লোবের আশপাশে টিউমার হলে ব্যক্তিত্ব, আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব পড়তে পারে।

মনোযোগ ও চিন্তাভাবনায় সমস্যা

শুধু কোনো ঘটনা মনে রাখতে না পারাই নয়, মনোযোগ ধরে রাখতেও সমস্যা হতে পারে। কোনো কাজ শেষ করতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে। একসঙ্গে একাধিক বিষয় সামলাতে অসুবিধা হতে পারে।

কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়া বা কোনো বিষয় বুঝতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগাও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে, তার ওপর এসব সমস্যার ধরন নির্ভর করে।

মাথাব্যথা হতে পারে

মস্তিষ্কের টিউমারের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো মাথাব্যথা। তবে বেশির ভাগ মাথাব্যথাই মস্তিষ্কের টিউমারের কারণে হয় না।

টিউমারের কারণে মাথার ভেতরে চাপ বাড়লে মাথাব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে মাথাব্যথা যদি সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে বা আগের মাথাব্যথার ধরন থেকে আলাদা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সকালে বেশি মাথাব্যথা হওয়া, ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া মাথাব্যথা বা মাথাব্যথার সঙ্গে বমি কিংবা অন্য স্নায়বিক সমস্যা থাকলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

খিঁচুনি বা সিজার হতে পারে

যার আগে কখনো খিঁচুনি হয়নি, তার হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে কখনো কখনো খিঁচুনি প্রথম লক্ষণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।

তবে প্রথমবার খিঁচুনি হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমন নয়। খিঁচুনির আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। প্রথমবার খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

দৃষ্টিতে পরিবর্তন

মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ বা চোখের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুর আশপাশে টিউমার হলে দৃষ্টিতে সমস্যা হতে পারে।

ঝাপসা দেখা, দুইটি করে দেখা বা দৃষ্টির কোনো অংশ দেখতে সমস্যা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা নতুন করে শুরু হলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা অবশভাব

মস্তিষ্কের যে অংশ শরীরের নড়াচড়া ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে টিউমার হলে শরীরের কোনো এক পাশে দুর্বলতা বা অবশভাব দেখা দিতে পারে।

হাত বা পায়ে শক্তি কমে যাওয়া, হাঁটতে সমস্যা হওয়া বা শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো লক্ষণও দেখা যেতে পারে। টিউমার মস্তিষ্কের সমন্বয় নিয়ন্ত্রণকারী অংশে হলে হাঁটা ও হাত-পায়ের সূক্ষ্ম নড়াচড়াতেও সমস্যা হতে পারে।

কথা বলায় সমস্যা

মস্তিষ্কের ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে সমস্যা হলে কথা বলা বা অন্যের কথা বোঝার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বলা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই নতুন করে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বমি ও বমি বমি ভাবও থাকতে পারে

মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ বেড়ে গেলে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। অনেক সময় এর সঙ্গে মাথাব্যথা ও তন্দ্রাভাবও থাকতে পারে।

তবে শুধু বমি বা বমি বমি ভাবকে মস্তিষ্কের টিউমারের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হজমের সমস্যা, সংক্রমণসহ আরও অনেক সাধারণ কারণেও এসব হতে পারে।

সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায় না

মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে সবার একই ধরনের উপসর্গ হবে, এমন নয়। টিউমার কোথায় রয়েছে, কত বড় এবং কত দ্রুত বাড়ছে, তার ওপর লক্ষণ নির্ভর করে।

কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা প্রধান সমস্যা হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি, কথা বলা, দৃষ্টিশক্তি, ভারসাম্য বা আচরণে পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে বা লক্ষণ খুব ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে।

এসব লক্ষণ দেখা দিলেই কি টিউমার হয়েছে?

না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।

মাথাব্যথা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মেজাজের পরিবর্তন, মাথা ঘোরা বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কিছু ওষুধ, সংক্রমণ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও একই ধরনের লক্ষণ তৈরি করতে পারে।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটিও জানিয়েছে, মস্তিষ্কের টিউমারের মতো দেখতে উপসর্গ অন্য অনেক কারণেও হতে পারে। তাই উপসর্গ থাকলেই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নতুন কোনো উপসর্গ শুরু হলে এবং সেটি দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নিচের কয়েকটি সমস্যা একসঙ্গে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না-

  • ক্রমেই বাড়তে থাকা বা নতুন ধরনের মাথাব্যথা
  • বারবার বমি বা বমি বমি ভাব
  • নতুন করে খিঁচুনি হওয়া
  • স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগে ক্রমাগত পরিবর্তন
  • আচরণ বা ব্যক্তিত্বে স্পষ্ট পরিবর্তন
  • দৃষ্টিতে নতুন সমস্যা
  • কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা
  • শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা অবশভাব
  • হাঁটা বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা

এ ধরনের লক্ষণ থাকলেই যে মস্তিষ্কে টিউমার রয়েছে, তা নয়। কিন্তু কারণটি খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।


কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?

হঠাৎ প্রচণ্ড ও অস্বাভাবিক মাথাব্যথা, প্রথমবার খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা গুরুতর নতুন স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

মস্তিষ্কের টিউমারের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে মাথাব্যথা বা খিঁচুনির কথা আসে। কিন্তু টিউমার মস্তিষ্কের কোন অংশে রয়েছে, তার ওপর উপসর্গের ধরন বদলে যেতে পারে। স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, মেজাজ, ব্যক্তিত্ব, কথা বলা, দৃষ্টিশক্তি বা শরীরের ভারসাম্যেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

তবে এসব লক্ষণের কোনোটিই একা মস্তিষ্কের টিউমার প্রমাণ করে না। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গটি কতদিন ধরে আছে, বাড়ছে কি না এবং অন্য কোনো লক্ষণ সঙ্গে রয়েছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন বা ক্রমশ বাড়তে থাকা উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: এনডিটিভি