ঘনঘন প্রস্রাব হচ্ছে, পানি খেলেও তেষ্টা মিটছে না, কারণ জানুন

বারবার পানি খেতে ইচ্ছে করছে, আবার কিছুক্ষণ পরপরই ছুটতে হচ্ছে বাথরুমে। এমন হলে অনেকের প্রথমেই মনে হয়, রক্তে শর্করা বেড়ে গেছে কি না। কারণ অতিরিক্ত তেষ্টা ও ঘন ঘন প্রস্রাব ডায়াবেটিসের পরিচিত লক্ষণ। তবে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা স্বাভাবিক হলেও যদি এই সমস্যা চলতে থাকে, সেটিকে সবসময় সাধারণ বিষয় ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এর পেছনে পানীয়ের অভ্যাস থেকে শুরু করে কিডনি, হরমোন বা কিছু ওষুধের প্রভাবও থাকতে পারে।
কতবার প্রস্রাব হলে বেশি বলা যায়?
প্রস্রাবের স্বাভাবিক সংখ্যা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। আপনি কতটা পানি পান করছেন, চা বা কফি কতটা খাচ্ছেন, আবহাওয়া, বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর এর পরিমাণ নির্ভর করে।
তবে আগের তুলনায় হঠাৎ অনেক বেশি প্রস্রাব হওয়া, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে বাথরুমে যেতে হওয়া বা অতিরিক্ত তেষ্টা লাগার মতো পরিবর্তন হলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণত দিনে প্রায় ৬ থেকে ৮ বার প্রস্রাব করতে পারেন। তবে এই সংখ্যা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
বেশি পানি খেলেও কেন বারবার প্রস্রাব হয়?
খুব বেশি পানি পান করলেও স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়তে পারে। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য অতিরিক্ত পানি খেলে শরীর বাড়তি তরল প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়।
আবার চা, কফি ও এনার্জি ড্রিঙ্কের মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে। ফলে একদিকে বেশি প্রস্রাব হচ্ছে, অন্যদিকে শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ায় আবার তেষ্টা লাগতে পারে।
তাই দিনে কতবার প্রস্রাব হচ্ছে তা দেখার পাশাপাশি আপনি কতটা পানি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করছেন, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
কিডনির সমস্যাও হতে পারে কারণ
কিডনি শরীরের পানি ও বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিডনি ঠিকভাবে প্রস্রাব ঘন করতে না পারলে শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তখন ঘন ঘন প্রস্রাবের পাশাপাশি তৃষ্ণাও বাড়তে পারে।
তবে শুধু এই দুটি লক্ষণ দেখেই কিডনির রোগ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। কিডনির কার্যক্ষমতা বোঝার জন্য চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা করতে পারেন।
হতে পারে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস
ডায়াবেটিস না থাকলেও অতিরিক্ত তেষ্টা ও প্রস্রাবের একটি বিরল কারণ হলো ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। নামের মধ্যে ডায়াবেটিস থাকলেও এটি সাধারণ ডায়াবেটিসের মতো রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার রোগ নয়। এটি শরীরের পানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই অবস্থায় শরীর পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে পারে না। ফলে অনেক বেশি পরিমাণে পাতলা প্রস্রাব হতে পারে এবং তার সঙ্গে তীব্র তৃষ্ণাও দেখা দিতে পারে। এর পেছনে ভ্যাসোপ্রেসিন নামের হরমোনের ঘাটতি বা এই হরমোনের প্রতি কিডনির স্বাভাবিক সাড়া না দেওয়ার মতো কারণ থাকতে পারে।
এটি বিরল সমস্যা হলেও দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক তেষ্টা ও অতিরিক্ত প্রস্রাব হলে চিকিৎসকের মাধ্যমে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতার প্রভাব
শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে একাধিক হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব হরমোনের কার্যক্রমে সমস্যা হলে তেষ্টা ও প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসের ক্ষেত্রে পানি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই রক্তে শর্করা স্বাভাবিক থাকার পরও যদি উপসর্গ থেকে যায়, চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন ও শরীরের পানি-লবণের ভারসাম্য পরীক্ষা করতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপের ওষুধেও হতে পারে কারণ
কিছু উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ শরীর থেকে অতিরিক্ত লবণ ও পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করতে সাহায্য করে। এসব ওষুধকে ডিউরেটিক বা পানি বের করে দেওয়ার ওষুধ বলা হয়। ফলে ওষুধ ব্যবহারের পর প্রস্রাবের পরিমাণ বা বারবার প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়তে পারে।
তাই নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর যদি এই ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়, নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা উচিত।
কিডনি রোগের সঙ্গে আর কী লক্ষণ থাকতে পারে?
অতিরিক্ত তেষ্টা ও ঘন ঘন প্রস্রাবের সঙ্গে যদি অন্য কিছু উপসর্গও থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। যেমন - অস্বাভাবিক ক্লান্তি, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া বা প্রস্রাবের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে এসব লক্ষণ কোনো নির্দিষ্ট একটি রোগের প্রমাণ নয়। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় এগুলো দেখা যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
কয়েক দিন ধরে কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত তেষ্টা লাগলে এবং বারবার প্রস্রাব হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও তেষ্টা না কমলে বা ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। NHS-ও কয়েক দিন বেশি তরল পান করার পর তেষ্টা না কমলে এবং তার সঙ্গে ঘন ঘন প্রস্রাব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেছে।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা, কিডনির কার্যক্ষমতা, প্রস্রাব, ইলেকট্রোলাইট এবং হরমোনের পরীক্ষা করতে পারেন। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা উপসর্গ ও ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করবে।
শুধু ডায়াবেটিস ভেবে বসে থাকবেন না
অতিরিক্ত তেষ্টা ও ঘন ঘন প্রস্রাব অবশ্যই ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে। রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে। এর সঙ্গে পানি বেরিয়ে যাওয়ায় শরীরে পানিশূন্যতা ও তৃষ্ণা তৈরি হতে পারে।
তবে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকার পরও একই সমস্যা চলতে থাকলে অন্য কারণ খুঁজে দেখা দরকার। অতিরিক্ত পানি বা ক্যাফেইন গ্রহণ, কিছু ওষুধ, কিডনির সমস্যা এবং ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসের মতো অবস্থাও এর পেছনে থাকতে পারে।
বারবার পানি খাওয়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়াকে সবসময় সাধারণ অভ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আবার শুধু এই দুটি লক্ষণ দেখেই ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ হয়েছে বলেও ধরে নেওয়া উচিত নয়। আপনার পানি ও ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ, ওষুধের ব্যবহার এবং অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না, সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।
ডায়াবেটিসের পরীক্ষা স্বাভাবিক হলেও সমস্যা যদি কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে, বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক তেষ্টা, ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি বা শরীর ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
