পায়ুপথের ক্যানসারের যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়

পায়ুপথের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল। তবে শুরুতে এর কিছু লক্ষণ পাইলস, ফিশার বা অন্য সাধারণ সমস্যার মতো মনে হতে পারে। ফলে অনেকেই উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন। অথচ পায়ুপথে রক্তপাত, অস্বাভাবিক গুটি বা মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পায়ুপথের ক্যানসার মূলত মলদ্বারের শেষ অংশের টিস্যুতে তৈরি হয়। এর সবচেয়ে সাধারণ ধরন স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা। মানব প্যাপিলোমাভাইরাস বা HPV সংক্রমণ এই ধরনের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ।
পায়ুপথের ক্যানসারের লক্ষণ কী?
সব রোগীর একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। আবার এসব উপসর্গ থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমনও নয়। পাইলস, ফিশারসহ অনেক সাধারণ সমস্যাতেও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে সমস্যা থাকলে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ুপথ দিয়ে রক্তপাত
মলত্যাগের সময় বা পরে পায়ুপথ দিয়ে রক্ত বের হওয়া অন্যতম লক্ষণ। অনেকেই এটিকে শুধু পাইলসের সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন। কিন্তু বারবার রক্তপাত হলে কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
পায়ুপথে গুটি বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
পায়ুপথের আশপাশে কোনো গুটি, শক্ত অংশ বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অনুভূত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সেটি ধীরে ধীরে বড় হলে বা দীর্ঘদিন থেকে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
পায়ুপথে ব্যথা বা অস্বস্তি
পায়ুপথে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি থাকতে পারে। তবে ব্যথা না থাকলেও ক্যানসার হতে পারে। তাই শুধু ব্যথা হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে রোগটি বোঝার চেষ্টা করা ঠিক নয়।
চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
পায়ুপথের আশপাশে দীর্ঘদিন চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকলেও কারণ খুঁজে দেখা দরকার। অবশ্য এ ধরনের সমস্যা সংক্রমণ, ত্বকের রোগ বা অন্যান্য সাধারণ কারণেও হতে পারে।
মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন
হঠাৎ কোষ্ঠকাঠিন্য, পাতলা পায়খানা, মলত্যাগের ধরন বদলে যাওয়া বা আগের তুলনায় মলত্যাগে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ধরনের পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
পায়ুপথ থেকে অস্বাভাবিক স্রাব
কখনো পায়ুপথ থেকে অস্বাভাবিক স্রাব বা তরল বের হতে পারে। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, তাই দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কুঁচকিতে গুটি বা লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
ক্যানসার কাছাকাছি লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে কুঁচকির এলাকায় গুটি বা ফোলা দেখা দিতে পারে। রোগ নির্ণয় ও ক্যানসারের বিস্তার বোঝার সময় চিকিৎসকেরা লসিকা গ্রন্থিও পরীক্ষা করেন।
কেন হয় পায়ুপথের ক্যানসার?
পায়ুপথের ক্যানসারের একটি বড় ঝুঁকির সঙ্গে এইচপিভি (HPV) সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। তবে এইচপিভি সংক্রমণ হলেই যে ক্যানসার হবে, এমন নয়। অধিকাংশ এইচপিভি সংক্রমণ ক্যানসারে রূপ নেয় না।
এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, HIV সংক্রমণ, ধূমপান এবং কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক ও চিকিৎসাগত পরিস্থিতি ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গেও ঝুঁকি বাড়ে।
পাইলস নাকি পায়ুপথের ক্যানসার?
এটি নিজে থেকে বোঝা কঠিন। পাইলসেও পায়ুপথ দিয়ে রক্তপাত, চুলকানি বা অস্বস্তি হতে পারে। একইভাবে পায়ুপথের ক্যানসারেও এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাই রক্তপাত হলেই ক্যানসার ধরে নেওয়ার যেমন কারণ নেই, তেমনি প্রতিবার এটিকে পাইলস ভেবে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। বিশেষ করে উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ ও স্বাস্থ্য ইতিহাস জানেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পায়ুপথ ও মলদ্বার পরীক্ষা করা হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের জন্য ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা, অ্যানোস্কপি বা প্রোক্টোস্কপির মতো পরীক্ষা করা হতে পারে। সন্দেহজনক কোনো অংশ পাওয়া গেলে বায়োপসি করা হয়। বায়োপসিতে টিস্যুর নমুনা নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে ক্যানসার কোষ আছে কি না দেখা হয়।
পায়ুপথের ক্যানসারের চিকিৎসা কি সম্ভব?
হ্যাঁ। রোগটি কোন পর্যায়ে ধরা পড়েছে, টিউমারের আকার, লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়েছে কি না এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।
প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী পর্যায়ের অনেক পায়ুপথের ক্যানসারে কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন থেরাপি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। কিছু ছোট টিউমারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারও করা হতে পারে। রোগটি ফিরে এলে বা প্রাথমিক চিকিৎসায় পুরোপুরি সাড়া না দিলে অন্য ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পায়ুপথের ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য, বিশেষ করে রোগটি তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-
- পায়ুপথ দিয়ে বারবার রক্তপাত
- পায়ুপথে নতুন কোনো গুটি বা শক্ত অংশ
- দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অস্বস্তি
- মলত্যাগের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন
- পায়ুপথ থেকে অস্বাভাবিক স্রাব
- কুঁচকিতে অস্বাভাবিক গুটি বা ফোলা
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা
ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় অন্য সাধারণ রোগের মতো হতে পারে। তাই কোনো একটি উপসর্গ দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলাও করা উচিত নয়।
পায়ুপথের ক্যানসার বিরল হলেও এর কিছু প্রাথমিক লক্ষণকে সাধারণ সমস্যা ভেবে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা ঠিক নয়। বিশেষ করে পায়ুপথে রক্তপাত বা অস্বাভাবিক গুটি দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত কারণ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করার সুযোগও বাড়ে।
সূত্র: নিউজ ১৮
.png)


