logo

গলার ক্যানসারের ৫ প্রাথমিক লক্ষণ, যেভাবে চিনবেন

গলার ক্যানসারের ৫ প্রাথমিক লক্ষণ, যেভাবে চিনবেন
ছবি: বিবিসি

সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা হলে বেশির ভাগ মানুষই ভাবেন, আবহাওয়া পরিবর্তন কিংবা সাধারণ সংক্রমণের কারণে এমনটা হচ্ছে। অনেক সময় বিশ্রাম ও সাধারণ চিকিৎসায় এসব সমস্যাও সেরে যায়।

তবে গলাব্যথা যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, কণ্ঠস্বর বদলে যায় বা খাবার গিলতে অসুবিধা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক না। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ গলার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

ভারতীয় এক প্রতিবেদনে গলার ক্যানসারের পাঁচটি প্রাথমিক লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে অনেকে সাধারণ সর্দি-কাশি বা গলার সংক্রমণ বলে ধরে নেন। তবে মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, বিষয়টা এমন নয়।

সংক্রমণ, অ্যালার্জি, অ্যাসিড রিফ্লাক্সসহ নানা কারণেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

গলার ক্যানসার কী?

গলার ক্যানসার বলতে গলার বিভিন্ন অংশে, যেমন গলবিল বা ফ্যারিংক্স এবং স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংক্সে ক্যানসার হওয়াকে বোঝানো হয়। রোগটি গলার কোন অংশে তৈরি হয়েছে, তার ওপর উপসর্গের ধরন নির্ভর করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। আবার কিছু লক্ষণ সাধারণ অসুস্থতার মতো হওয়ায় মানুষ সহজেই সেগুলো উপেক্ষা করেন। তাই শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে তার কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।

গলার ক্যানসারের ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ

দীর্ঘদিন গলাব্যথা থাকা

সর্দি-কাশি বা গলার সংক্রমণের কারণে গলাব্যথা হওয়া খুবই সাধারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সমস্যা কমে আসে। কিন্তু গলাব্যথা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গলার ক্যানসারের ক্ষেত্রে কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, গলায় অস্বস্তি কিংবা গিলতে গেলে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ চিকিৎসায় সমস্যা না কমলে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

তবে শুধু দীর্ঘদিন গলাব্যথা থাকার অর্থ ক্যানসার নয়। সংক্রমণ, অ্যালার্জি ও অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।

কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া

কণ্ঠস্বর হঠাৎ ভেঙে যাওয়া, স্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলার সময় আগের মতো স্বর না পাওয়া গলার আরেকটি সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে স্বরযন্ত্র বা স্বরতন্ত্রীর আশপাশে সমস্যা হলে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

সাধারণ সর্দি-কাশি বা অতিরিক্ত কথা বলার কারণেও কণ্ঠস্বর বসে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত সময়ের সঙ্গে উন্নতি হয়। কিন্তু কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন তিন সপ্তাহের কাছাকাছি সময় ধরে থাকলে, বিশেষ করে কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ধূমপান করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

খাবার বা পানি গিলতে অসুবিধা

খাবার গিলতে গিয়ে ব্যথা হওয়া, গলায় খাবার আটকে থাকার অনুভূতি কিংবা গিলতে কষ্ট হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিসফ্যাজিয়া বলা হয়। গলার বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি গলার ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রথমে শক্ত খাবার গিলতে অসুবিধা হতে পারে। পরে সমস্যা বাড়লে নরম খাবার বা পানীয় গিলতেও কষ্ট হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে এমন ধারাবাহিকতা দেখা যায় না।

গিলতে অসুবিধা হলে নিজে থেকে দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শ্বাস নিতে সমস্যা হলে বা লালা পর্যন্ত গিলতে না পারলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

গলায় বা ঘাড়ে গাঁট দেখা দেওয়া

ঘাড়ে নতুন কোনো গাঁট বা ফোলা দেখা দিলে সেটি অবহেলা করা উচিত নয়। গলার ক্যানসারসহ মাথা ও ঘাড়ের কিছু ক্যানসার ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে গাঁট তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের গাঁট কখনো ব্যথাহীন হতে পারে এবং দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকতে পারে। তবে ঘাড়ের গাঁটের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে সংক্রমণজনিত লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়াও রয়েছে। তাই শুধু গাঁট দেখে ক্যানসার নির্ণয় করা যায় না।

গাঁট বড় হতে থাকলে, কয়েক সপ্তাহেও না কমলে, শক্ত মনে হলে কিংবা এর সঙ্গে গলাব্যথা বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অকারণে ওজন কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত ক্লান্তি

খাবার বা শরীরচর্চার অভ্যাসে পরিবর্তন না এনেও ওজন কমতে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। গলার ক্যানসারের ক্ষেত্রে গিলতে অসুবিধা বা খাবার খেতে ব্যথার কারণে খাওয়ার পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেয়ে ওজন হারাতে পারে।

ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে। তবে ওজন কমে যাওয়া ও ক্লান্তির পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা এবং অন্যান্য কারণও থাকতে পারে।

তাই অকারণে ওজন কমতে থাকলে বা দীর্ঘদিন ক্লান্ত লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।

গলার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কোন বিষয়গুলো?

গলার ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে কয়েকটি বিষয় জড়িত। এর মধ্যে আছে-

  • ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার
  • জর্দা, গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার
  • অতিরিক্ত মদ্যপান, বিশেষ করে তামাকের সঙ্গে
  • হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভির সংক্রমণ, বিশেষ করে গলার কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে

তবে ঝুঁকির কারণ না থাকলেও কারও ক্যানসার হতে পারে। আবার এসব ঝুঁকির কোনো একটি থাকলেই যে ক্যানসার হবে, তাও নয়। তাই উপসর্গের স্থায়িত্ব ও ধরনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

গলার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ রোগের মতো হওয়ায় উপসর্গের স্থায়িত্বের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন-

  • গলাব্যথা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
  • কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহেও না কমলে
  • খাবার বা পানি গিলতে অসুবিধা হলে
  • ঘাড়ে নতুন গাঁট দেখা দিলে
  • অকারণে ওজন কমতে থাকলে
  • কানে ব্যথার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গলাব্যথা থাকলে

শ্বাস নিতে তীব্র অসুবিধা হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। এসব লক্ষণের কারণ জানতে চিকিৎসক গলা ও ঘাড় পরীক্ষা করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, এন্ডোস্কোপি, ইমেজিং বা বায়োপসি করা হতে পারে।

গলার ক্যানসার প্রতিরোধে কী করবেন?

সব ধরনের গলার ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

প্রথমত, ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন। দ্বিতীয়ত, মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। এইচপিভির সংক্রমণ প্রতিরোধে উপযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

গলাব্যথা, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, গিলতে অসুবিধা, ঘাড়ে গাঁট কিংবা অকারণে ওজন কমে যাওয়া, এসব লক্ষণ সব সময় গলার ক্যানসারের কারণে হয় না। তবে সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়।

লক্ষণ দেখা দিলেই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া