পেঁয়াজের গায়ে কালো দাগ, খাওয়া কতটা নিরাপদ

রান্নার আগে পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে হঠাৎ দেখা গেল, শুকনো খোসার ভেতরে বা স্তরের গায়ে কালো কালো দাগ। দেখে অনেকেই পুরো পেঁয়াজটি ফেলে দেন। আবার কেউ আক্রান্ত অংশটুকু কেটে বাদ দিয়ে বাকি পেঁয়াজ রান্নায় ব্যবহার করেন।
কিন্তু কালো দাগ দেখলেই কি পেঁয়াজ খাওয়া বিপজ্জনক? নাকি কিছু ক্ষেত্রে শুধু আক্রান্ত অংশ সরিয়ে নিলেই চলে?
বিষয়টি নির্ভর করে ছত্রাকটি কোথায় এবং কতটা ছড়িয়েছে তার ওপর। পেঁয়াজের বাইরের খোসায় অল্প পরিমাণ কালো ছত্রাক থাকলে আক্রান্ত খোসা সরিয়ে পেঁয়াজের ভালো অংশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পেঁয়াজের ভেতরের অংশ নরম হয়ে গেলে, পচন ধরলে বা ছত্রাক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সেটি ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
পেঁয়াজে কালো ছত্রাক কেন হয়?
পেঁয়াজে দেখা যাওয়া কালো ছত্রাক সাধারণত অ্যাসপারগিলাস নাইজার নামের ছত্রাকের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি মাটি ও পরিবেশে পাওয়া যায় এবং সংরক্ষণের সময় উপযুক্ত পরিবেশ পেলে পেঁয়াজে বাড়তে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পেঁয়াজের বাইরের আঁশে এই ধরনের কালো ছত্রাক দেখা যেতে পারে।
বিশেষ করে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে ছত্রাকের বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ে। পেঁয়াজে আঘাত বা ক্ষত থাকলেও সেখানে ছত্রাক ও পচন ধরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই বাজার থেকে পেঁয়াজ কেনার সময় অতিরিক্ত নরম, ভেজা, পচা বা ছত্রাকযুক্ত পেঁয়াজ না নেওয়াই ভালো। মার্কিন কৃষি বিভাগও ছত্রাক দেখা যায় এমন খাবার কেনা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।
কালো দাগ দেখলেই কি পেঁয়াজ ফেলে দিতে হবে?
সব ক্ষেত্রে না।
যদি পেঁয়াজের বাইরের শুকনো খোসায় অল্প পরিমাণ কালো ছত্রাক থাকে এবং ভেতরের অংশ শক্ত ও স্বাভাবিক থাকে, তাহলে আক্রান্ত খোসা সরিয়ে পেঁয়াজটি পরীক্ষা করা যায়। মার্কিন কৃষি বিভাগের নির্দিষ্ট নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পেঁয়াজের বাইরের আঁশে অল্প পরিমাণ কালো ছত্রাক থাকলে ঠান্ডা প্রবাহমান পানিতে ধুয়ে বা আক্রান্ত স্তর কেটে ফেলে ভালো অংশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধু কালো দাগটি চোখে না দেখলেই পেঁয়াজ নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই। পেঁয়াজের ভেতরেও যদি ছত্রাক বা পচনের লক্ষণ থাকে, তখন ব্যবহার না করাই ভালো।
কখন পুরো পেঁয়াজ ফেলে দেবেন
কয়েকটি লক্ষণ দেখলে আর ঝুঁকি নেওয়া উচিত না।
পেঁয়াজ নরম বা পিচ্ছিল হয়ে গেলে: স্বাভাবিক পেঁয়াজ শক্ত থাকে। চাপ দিলে অতিরিক্ত নরম মনে হলে পচন শুরু হয়ে থাকতে পারে।
ভেতরের স্তরেও ছত্রাক ছড়িয়ে পড়লে: শুধু বাইরের খোসা সরানোর পর যদি একাধিক স্তরে কালো, সবুজ বা অন্য রঙের ছত্রাক দেখা যায়, পুরো পেঁয়াজ ফেলে দেওয়া ভালো।
পচা গন্ধ থাকলে: অস্বাভাবিক গন্ধ পচনের লক্ষণ হতে পারে। খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করতে শুধু স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত নয়।
অনেকটা অংশ আক্রান্ত হলে: ছত্রাকের পরিমাণ বেশি হলে আক্রান্ত অংশ কেটে বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়ার চেষ্টা না করাই নিরাপদ। মার্কিন কৃষি বিভাগ সাধারণভাবে ছত্রাকযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়, কারণ ছত্রাকের সূক্ষ্ম শিকড় খাবারের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াও থাকতে পারে।
ছত্রাকের শুধু কালো অংশ কেটে ফেললেই কি সব সময় নিরাপদ?
সব খাবারের ক্ষেত্রে না।
খাবারের ধরন অনুযায়ী ছত্রাকের গভীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আলাদা। শক্ত ও কম আর্দ্রতার কিছু ফল ও সবজিতে ছোট ছত্রাকের দাগ থাকলে মার্কিন কৃষি বিভাগ অন্তত ১ ইঞ্চি বা প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার চারপাশ ও নিচের অংশ কেটে বাদ দেওয়ার অনুমতি দেয়। কিন্তু নরম ও বেশি আর্দ্র খাবারে ছত্রাক ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সেগুলো ফেলে দিতে বলা হয়।
পেঁয়াজ তুলনামূলকভাবে শক্ত সবজি হলেও কালো ছত্রাক শুধু চোখে দেখা দাগ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ কি না, তা সব সময় নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। তাই আক্রান্ত অংশ সামান্য এবং শুধু বাইরের স্তরে থাকলে পরিষ্কার করে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু পেঁয়াজের গঠন ও গন্ধে পরিবর্তন দেখা দিলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
রান্না করলে কি ছত্রাকের ঝুঁকি চলে যায়?
শুধু রান্না করলেই ছত্রাকযুক্ত খাবার নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক না।
কিছু ছত্রাক নির্দিষ্ট পরিবেশে মাইকোটক্সিন বা ছত্রাকজাত বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগ বলছে, কিছু ছত্রাক অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং কিছু ছত্রাক উপযুক্ত পরিবেশে মাইকোটক্সিন তৈরি করতে পারে।
তাই ছত্রাকযুক্ত পেঁয়াজ বেশি সময় রান্না করলে সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয়ে যাবে, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং পেঁয়াজের অবস্থা দেখে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের ছত্রাকে অ্যালার্জি আছে, তারা আরও সতর্ক থাকুন
সব মানুষের ক্ষেত্রে ছত্রাকের সংস্পর্শে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় না। কারও অ্যালার্জি বা শ্বাসতন্ত্রের সংবেদনশীলতা থাকলে ছত্রাকের স্পোর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (USDA) নির্দিষ্ট নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অ্যাসপারগিলাস নাইজারের (Aspergillus niger: একটি অতি পরিচিত ও সাধারণ ছত্রাক বা ফাঙ্গাস, যা আমরা সচরাচর পেঁয়াজের গায়ে কালো গুঁড়ো বা দাগ হিসেবে দেখতে পাই।) প্রতি যাদের অ্যালার্জি রয়েছে, তারা কালো ছত্রাকযুক্ত পেঁয়াজ ব্যবহার করবেন না।
তাই বাড়িতে এমন কারও থাকলে আক্রান্ত পেঁয়াজ ব্যবহার না করাই ভালো।
পেঁয়াজে ছত্রাক ধরার ঝুঁকি কমাবেন যেভাবে
পেঁয়াজ অনেক দিন ভালো রাখতে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যায়।
শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখুন। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ছত্রাক বৃদ্ধির সুযোগ বাড়াতে পারে।
পেঁয়াজ ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করুন। বাইরের খোসা, নরম অংশ, অস্বাভাবিক গন্ধ বা পচনের লক্ষণ আছে কি না দেখুন।
আঘাত পাওয়া পেঁয়াজ আলাদা রাখুন। একটি পেঁয়াজে পচন বা ছত্রাক দেখা দিলে কাছের পেঁয়াজগুলোও পরীক্ষা করুন। ছত্রাক এক খাবার থেকে অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ছত্রাকযুক্ত পেঁয়াজের গন্ধ নাকে নিয়ে পরীক্ষা করবেন না। মার্কিন কৃষি বিভাগ বলছে, ছত্রাকের কাছাকাছি গিয়ে গন্ধ নেওয়া শ্বাসতন্ত্রের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
পেঁয়াজ কাটার পর কীভাবে সংরক্ষণ করবেন?
একবার পেঁয়াজ কেটে ফেললে সংরক্ষণের নিয়মও বদলে যায়। কাটা পেঁয়াজ পরিষ্কার পাত্রে রেখে দ্রুত ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত। রান্না করা বা কাটা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়। মার্কিন কৃষি বিভাগ সাধারণভাবে পচনশীল খাবার দ্রুত ফ্রিজে রাখার পরামর্শ দেয়।
ফ্রিজে রাখা খাবারে ছত্রাক দেখা দিলেও সেটিকে শুধু ওপর থেকে পরিষ্কার করে আবার রেখে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ ছত্রাকের স্পোর আশপাশের খাবার ও সংরক্ষণস্থলেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
তাহলে কালো দাগযুক্ত পেঁয়াজ খাবেন কি?
সহজভাবে বললে, পেঁয়াজের শুধু বাইরের শুকনো খোসায় অল্প কালো ছত্রাক থাকলে আক্রান্ত খোসা সরিয়ে ভালো অংশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পেঁয়াজের ভেতরেও ছত্রাক ছড়িয়ে পড়লে, পেঁয়াজ নরম বা পচা হয়ে গেলে, অস্বাভাবিক গন্ধ থাকলে কিংবা আক্রান্ত অংশ অনেক বেশি হলে পুরো পেঁয়াজ ফেলে দিন।
অর্থাৎ পেঁয়াজের গায়ে ছোট কালো দাগ দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার শুধু দাগ কেটে ফেলে প্রতিটি পেঁয়াজ খাওয়াও নিরাপদ নিয়ম নয়। ছত্রাক কতটা ছড়িয়েছে এবং পেঁয়াজের ভেতরের অবস্থা কেমন, সেটিই মূল বিষয়।
খাবারের ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহ থাকলে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো। কারণ একটি পেঁয়াজ বাঁচানোর চেয়ে খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি এড়ানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এই সময় অনলাইন


