logo

কেন পুরুষের চেয়ে নারীদের মাইগ্রেন বেশি হয়

কেন পুরুষের চেয়ে নারীদের মাইগ্রেন বেশি হয়
ছবি: হেল্থ বাউন্ড হেল্থ নেটওয়ার্ক

অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকা, মাথার ভেতর নিরবচ্ছিন্ন ও তীব্র ব্যথা, সঙ্গে আলো বা শব্দে অস্বস্তি। মাইগ্রেনে ভোগা অনেক মানুষের কাছে এমন অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, মাইগ্রেনের কারণে কাজ, সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

মাইগ্রেন বিশেষভাবে নারীদের বেশি প্রভাবিত করে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনের আক্রমণের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।

কিন্তু মাইগ্রেনের আক্রমণ কেন হয়? নারীদের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি হওয়ার পেছনে কি হরমোনের ভূমিকা রয়েছে? আর মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনযাপনে কী ধরনের পরিবর্তন আনা যেতে পারে?

মাইগ্রেনের উপসর্গ কী?

যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা মাইগ্রেন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি সাতজনের একজন মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন। অর্থাৎ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এক বিলিয়নেরও বেশি।

মাইগ্রেন একটি জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা। এটি মস্তিষ্ককে বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল মাইগ্রেন সেন্টারের মাইগ্রেন বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাটি মনরো বলেন, কিছু মানুষের শরীরে মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন থাকলেও কখনো তা সক্রিয় নাও হতে পারে। ফলে তারা কোনো সমস্যা ছাড়াই জীবন কাটাতে পারেন।

তবে অন্যদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাহ্যিক কারণ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুপথ সক্রিয় করে দিতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়ে মাইগ্রেনের উপসর্গ তৈরি করতে পারে।

মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি, মাথা ঘোরা এবং ব্রেন ফগ বা চিন্তা ও মনোযোগে সাময়িক অস্পষ্টতাও হতে পারে।

ডা. মনরো বলেন, একজন মানুষের প্রতিবার একই ধরনের উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উপসর্গের ধরন আলাদা হতে পারে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তা পরিবর্তিত হতে পারে।


মাইগ্রেনের আক্রমণের কারণ কী?

মাইগ্রেনের আক্রমণের পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। বরং ছোট ছোট বিভিন্ন উদ্দীপক বা পরিবর্তন একসঙ্গে মিলে একজন ব্যক্তির সহনসীমা অতিক্রম করলে আক্রমণ শুরু হতে পারে।

এর মধ্যে হরমোনের পরিবর্তন, রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা এবং কম বা অনিয়মিত ঘুমের মতো বিষয় থাকতে পারে।

মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু মানসিক চাপের সময়ই নয়, দীর্ঘ সময়ের চাপের পর হঠাৎ শান্ত পরিবেশেও কারও কারও মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হতে পারে।

হরমোনের দ্রুত পরিবর্তনও মাইগ্রেনকে আরও খারাপ করতে পারে। ছবি: বিবিসি
হরমোনের দ্রুত পরিবর্তনও মাইগ্রেনকে আরও খারাপ করতে পারে। ছবি: বিবিসি

ডা. মনরোর মতে, নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা যায়। পরিবারের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলানো, একসঙ্গে অনেক কাজ করা এবং পরিবারের সদস্যদের সময়সূচির দিকে নজর রাখার মতো বিষয়ও চাপ বাড়াতে পারে।

আবহাওয়ার পরিবর্তন, যেমন তাপমাত্রা, বায়ুচাপ ও আর্দ্রতার পরিবর্তনও কিছু মানুষের মাইগ্রেনের উদ্দীপক হতে পারে। এর সঙ্গে পানিশূন্যতার মতো বিষয়ও যুক্ত থাকতে পারে।

এ ছাড়া শরীরে আয়রনের ঘাটতি, সিলিয়াক রোগ বা থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গেও মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে।

সিলিয়াক রোগ একটি অটোইমিউন অবস্থা। এতে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা গ্লুটেনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কখনো কখনো ক্ষুদ্রান্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।


হরমোনের প্রভাব কী?

প্রায় ১০ শতাংশ শিশুর মাইগ্রেন হতে পারে এবং ছোট বয়সে ছেলে ও মেয়ে প্রায় সমানভাবেই আক্রান্ত হয়।

তবে বয়ঃসন্ধিতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে মেয়েদের মাসিক শুরু হওয়ার পর মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়তে পারে।

ডা. মনরো বলেন, হরমোনের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। মাসিক শুরুর ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ার কারণে এ সময় মাইগ্রেনের আক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে।

পেরিমেনোপজে, অর্থাৎ মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগের পরিবর্তনের সময়ে, হরমোনের দ্রুত ওঠানামাও মাইগ্রেনকে আরও তীব্র করতে পারে।

ডা. মনরোর ভাষায়, পেরিমেনোপজের সময় অনেক নারীর জন্য মাইগ্রেন বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিষয়টি শুধু হরমোনের পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের এই পর্যায়ে অনেক নারীকে একই সঙ্গে কিশোর সন্তান, বয়স্ক বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে হয়। মেনোপজের উপসর্গের কারণে ঘুমের সমস্যাও হতে পারে। এসব বিষয়ও মাইগ্রেনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়ে গেলে কিছু নারীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণের সংখ্যা ও তীব্রতা কমে আসতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন আপনার মাইগ্রেন হচ্ছে?

মাইগ্রেনের আক্রমণ সাধারণত কয়েকটি ধাপে দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপ বা একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না।

প্রথম ধাপ হলো প্রোড্রোম বা পূর্বাভাস ধাপ। এ সময় মস্তিষ্কে পরিবর্তন শুরু হওয়ার সঙ্গে হাই তোলা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘাড়ে ব্যথার মতো সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে।

এরপর কারও কারও অরা দেখা দেয়। এটি সাধারণত এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ সময় চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা, ঝলকানি বা সাদা দাগের মতো দৃশ্যগত পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাইগ্রেন রোগীর অরা হতে পারে।

এরপর শুরু হয় মাথাব্যথার পর্যায়। এটি চার ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ সময় বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে।

ছবি: বিবিসি বাংলা
ছবি: বিবিসি বাংলা

শেষ ধাপটি হলো পোস্ট-ড্রোমাল পর্যায়, যাকে অনেকে মাইগ্রেনের হ্যাংওভার পর্যায়ও বলেন। মাথাব্যথা কমে যাওয়ার পরও আরও এক বা দুই দিন ক্লান্তি বা স্বাভাবিক কাজে মনোযোগের সমস্যা থাকতে পারে।

ডা. মনরো এই পর্যায়কে এমন একটি অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেন শরীরের ওপর দিয়ে একটি ভারী রোলার চলে গেছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও এ সময় কাজে ফিরে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।

জীবনযাপনে কী পরিবর্তন মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক?

মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় কফি বা চকলেটের মতো সম্ভাব্য উদ্দীপক খাবার এড়িয়ে চলতে বলা হয়। তবে ডা. মনরোর মতে, নির্দিষ্ট কিছু খাবার বাদ দেওয়ার পাশাপাশি যতটা সম্ভব নিয়মিত জীবনযাপন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাইগ্রেন গোয়েন্দার মতো নিজের অভ্যাস পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন। আক্রমণ শুরু হওয়ার আগের দুই বা তিন দিনে কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা খেয়াল করলে সম্ভাব্য উদ্দীপক শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

তবে সব সময় জীবন পরিকল্পনামাফিক চলে না। তাই কোনো অভ্যাস ঠিকভাবে ধরে রাখতে না পারলে নিজেকে দোষারোপ না করে যতটা সম্ভব নিয়মিত জীবনযাপনের চেষ্টা করা উচিত।

নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে না থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার চেষ্টা করা এবং সম্ভব হলে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জেগে ওঠার অভ্যাস করা ভালো।

ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি

ব্যায়ামও উপকারী। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রম মাইগ্রেনের উদ্দীপক হতে পারে। তাই ব্যায়ামের আগে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি গ্রহণ করা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও রুটিনে বড় পরিবর্তন না আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন ছুটির দিনে অনেক দেরিতে ঘুমানো, নিয়মিতের চেয়ে বেশি সময় না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত মদ্যপান কারও কারও ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

কোন ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট সাহায্য করতে পারে?

মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হলে কার্যকর চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ব্যথা খুব বেড়ে যাওয়ার পর ওষুধ খান। এতে চিকিৎসা করা কঠিন হতে পারে।

ডা. মনরো বমি প্রতিরোধক ওষুধের পাশাপাশি ব্যথানাশক হিসেবে আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিনের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে কোন ওষুধ কার জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত, তা ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও অন্যান্য ওষুধের ওপর নির্ভর করে। তাই নিয়মিত বা ঘন ঘন মাইগ্রেন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

প্যারাসিটামল কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে কোডিনজাতীয় ওষুধ অতিরিক্ত ব্যবহারে মাথাব্যথা আরও ঘন ঘন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মাইগ্রেনের চিকিৎসায় ট্রিপটান নামে বিশেষ ধরনের ওষুধও ব্যবহার করা হয়। এগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হয়।

ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২-এর মতো কিছু সাপ্লিমেন্ট মাইগ্রেনের আক্রমণের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে কিছু গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

যেসব নারীর মাসিকের সময় মাইগ্রেন হয়, তাদের ক্ষেত্রে হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা কিছু পরিস্থিতিতে উপকারী হতে পারে। পেরিমেনোপজের সময় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপিও কিছু নারীর জন্য বিবেচনা করা হয়। তবে এসব চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু করা উচিত নয়।

মাইগ্রেনের আরও কী চিকিৎসা আছে?

বিজ্ঞানীরা মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন নিউরোকেমিক্যাল শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে সিজিআরপি নামের একটি পেপটাইড কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে সিজিআরপির কার্যক্রম প্রতিরোধ করে এমন কিছু চিকিৎসাও রয়েছে।

মাইগ্রেন প্রতিরোধে বোটক্সও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া আকুপাংচার, যোগব্যায়াম, তাই চি ও ব্যথা ব্যবস্থাপনার মতো কিছু পদ্ধতিও কিছু মানুষের উপকারে আসতে পারে।

তবে মাইগ্রেন সবার ক্ষেত্রে একইভাবে দেখা দেয় না। কারও জন্য যে চিকিৎসা কার্যকর, অন্যের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। তাই বারবার মাইগ্রেন হলে নিজের উপসর্গ ও সম্ভাব্য উদ্দীপক সম্পর্কে তথ্য রাখা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেন দীর্ঘস্থায়ী হলেও এটি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তাই বারবার তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টির পরিবর্তন, বমি বা অন্যান্য উপসর্গ হলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: বিবিসি বাংলা