logo

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটাচ্ছেন, এই ভুলটিই মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটাচ্ছেন, এই ভুলটিই মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে
ছবি: এআই জেনারেটেড

হঠাৎ করে কেউ অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লে বেশিরভাগ মানুষই দৌড়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসেন আর অজ্ঞান ব্যক্তির চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে শুরু করেন। বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, মুখে পানি ছিটালেই বোধহয় জ্ঞান ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই বহুল প্রচলিত অভ্যাসটি আসলে আপনার প্রিয় মানুষটির জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে?

চিকিৎসকরা এই প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, অজ্ঞান হওয়ার আসল কারণ না জেনে মুখে পানি ছিটানো মানে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলা, যা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে।

কেন মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, শরীরে পানির মারাত্মক অভাব বা ডিহাইড্রেশন, রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া বা রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার কারণে মানুষ কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারায়।

এছাড়া গরম আবহাওয়া, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ, অতিরিক্ত কাশি বা হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের কোনো জটিলতার কারণেও এমনটি হতে পারে। অনেক সময় অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা তীব্র দুশ্চিন্তার কারণেও মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়।

দীর্ঘক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, রক্ত বা কোনো অস্বস্তিকর দৃশ্য দেখা, হঠাৎ করে শুয়ে বা বসে থাকা অবস্থা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়াও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটানো কেন ক্ষতি করতে পারে?

অজ্ঞান হওয়ার আসল কারণ না জেনে মুখে পানি ছিটানো মারাত্নক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসকের মতে, একজন মানুষ যখন পুরোপুরি অচৈতন্য বা অজ্ঞান অবস্থায় থাকে, তখন তার শ্বাসনালী খোলা থাকে। এই অবস্থায় যদি তার মুখে পানি ঢেলে দেওয়া হয় বা পানির ঝাপটা দেওয়া হয়, তবে সেই পানি সোজা শ্বাসনালীতে ঢুকে যেতে পারে। এর ফলে দম আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘চোকিং’ বলা হয়। ফুসফুসে পানি চলে গেলে নিউমোনিয়া বা বড় ধরনের ইনফেকশন দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

তাছাড়া, মুখে পানি ছিটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে মানুষ আসল জরুরি পরিস্থিতিটাই বুঝতে দেরি করে ফেলেন। যেমন ধরুন, ঘটনাটি যদি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ হয়ে থাকে, তবে দেরি হয়ে গেলে জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মানুষের গায়ে পানি ছিটানো, হাত-পায়ে থাপ্পড় মারা, স্যান্ডেল দিয়ে আঘাত করা কিংবা চিল্লাচিল্লি করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ছবি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
ছবি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

কেউ আবার অজ্ঞান ব্যক্তিকে শরবত খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, এটা মারাত্মক ভুল। অজ্ঞান অবস্থায় মানুষের গিলে খাওয়ার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কাজ করে না। এ সময় যদি জোর করে মুখে পানি, জুস বা শরবত ঢেলে দেওয়া হয়, তবে তা পেটে যাওয়ার বদলে সোজা ফুসফুসে চলে যেতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘অ্যাসপিরেশন’ বলা হয়। এটি ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।

কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করবেন?

আপনার আশপাশে যদি কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়, তবে মুখে পানি না ছিটিয়ে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি-

চিৎ করে শুইয়ে দিন: রোগীকে নিরাপদ ও সমতল স্থানে চিৎ করে শুইয়ে দিন। তবে নারী গর্ভবতী হলে (বিশেষ করে ২৮ সপ্তাহের বেশি গর্ভকাল হয়) তাকে চিত না করে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিন।

পা উঁচুতে রাখুন: তার পা দুটি সামান্য উঁচুতে (যেমন বালিশ বা ব্যাগ জাতীয় কিছুর উপর) তুলে দিন। এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে।

পোশাক ঢিলে করুন: গলা বা বুকের কাছের টাইট জামাকাপড় কিছুটা ঢিলে করে দিন। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।

শ্বাস-প্রশ্বাস খেয়াল রাখুন: রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন। যদি রোগীর শ্বাস সচল থাকে আর তার শরীরে মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা না থাকে, তবে তাকে সাবধানে একপাশে শুইয়ে দিন। এতে মুখ দিয়ে লালা বা বমি বের হয়ে গেলে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না

বিশ্রাম দিন: জ্ঞান ফেরার পর তাকে তাড়াহুড়ো করে উঠতে দেবেন না। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে বা বসে বিশ্রাম নিতে দিন। পুরোপুরি সুস্থ বোধ না করা পর্যন্ত একা উঠে দাঁড়াতে দেবেন না।

কখন দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে?

কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত-

ছবি: গেট লাইসেন্সড
ছবি: গেট লাইসেন্সড

• যদি রোগী এক মিনিটের মধ্যে স্বাভাবিক জ্ঞানে ফিরে না আসে।

• পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলে বা শরীর থেকে রক্তপাত হলে।

• রোগীর ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা খিঁচুনির সমস্যা থাকলে।

• রোগী গর্ভবতী হলে বা তার বয়স ৫০ বছরের বেশি হলে।

• ব্যায়াম করার সময় বা শুয়ে থাকা অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে গেলে।

• অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে যদি প্রচণ্ড বুক ধড়ফড় করতে থাকে।

• ওই ব্যক্তির যদি আগে থেকেই হার্ট বা হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা থেকে থাকে।

যে ভুলগুলো একদমই করবেন না

মুখে কোনো খাবার বা পানি দেবেন না: অজ্ঞান অবস্থায় ব্যক্তির মুখে পানি, জুস বা কোনো খাবার ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে খাবার শ্বাসনালীতে ঢুকে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।

মুখে পানি ছিটানো বা থাপ্পড় দেওয়া থেকে বিরত থাকুন: সিনেমা বা নাটকের মতো অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে পানি ছিটানো বা থাপ্পড় মেরে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা বিজ্ঞানসম্মত না।

মাথার নিচে বালিশ দেবেন না: অজ্ঞান ব্যক্তির মাথার নিচে বালিশ দিলে শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে যেতে পারে, তাই সমতল জায়গায় শুয়ে দিন।

একা ছেড়ে যাবেন না: রোগীকে কখনোই একা ফেলে রাখবেন না, সবসময় তার পাশে থাকুন। জ্ঞান ফিরলেও একা উঠতে দেবেন না।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে ঘরে বসে দেরি না করে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া উচিত। অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে চড় মারা, ঝাঁকানো বা মুখে পানি ছিটানোর মতো সংস্কারগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্র:

Health direct: Fainting

Medicine plus: Unconsciousness - first aid

Healthwise: Don’t fan, slap or pour water on someone who has fainted

Indian express: Why you should never splash water on someone who has fainted