পুরুষদের স্বাস্থ্য কেন বেশি ঝুঁকিতে, জানুন কারণ ও সমাধান

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও সামাজিক যত্ন বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষদের মধ্যে অকালমৃত্যুর হার নারীদের তুলনায় বেশি। হৃদ্রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, লিভারের জটিলতা এবং দুর্ঘটনা - এই কয়েকটি কারণেই অনেক পুরুষ ৭৫ বছরের আগেই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু শরীরের নয় বরং জীবনযাপন, মানসিকতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, মাদক ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও কম শারীরিক সক্রিয়তা এবং উচ্চ রক্তচাপ ও অনিয়ন্ত্রণ কোলেস্টেরল।
এসব কারণ একত্রে হৃদ্রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অনাগ্রহ
গবেষণায় দেখা যায়, অনেক পুরুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও দেরিতে চিকিৎসা নেন বা অনেক সময় সমস্যা উপেক্ষা করেন।
এর পেছনে কিছু সামাজিক ধারণা কাজ করে। যেমন- ‘পুরুষদের শক্ত থাকতে হবে’ এমন ধারণা, অসুস্থতা প্রকাশে অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ের রোগ শনাক্ত হয় না, যা পরে জটিল আকার ধারণ করে।
নারীদের তুলনায় ব্যবধান কোথায়
নারীরা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি যুক্ত থাকেন। যেমন - গর্ভকালীন পরীক্ষা, সন্তান জন্মের পরবর্তী চিকিৎসা বা নিয়মিত ক্লিনিক ভিজিট।
অন্যদিকে অনেক পুরুষ কর্মজীবনের ব্যস্ততায় ৩০–৪০ বছর বয়স পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে খুব কম যান। এই দূরত্বও ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতা
পুরুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে মানসিক ও সামাজিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষেত্রের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চাপ অনেক সময় বিষণ্নতা বা উদ্বেগ তৈরি করলেও তা প্রকাশ পায় না।
বরং অনেকেই অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকেন, রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণ করেন এবং নিজেকে গুটিয়ে নেন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক সময় অচিহ্নিত থেকে যায়।
জীবনযাত্রার প্রভাব
অনিয়মিত জীবনযাপন পুরুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত ধূমপান বা মদ্যপান, ব্যায়ামের অভাব ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও লিভারের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সমাধান কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধান একক কোনো পদ্ধতিতে নয় বরং ব্যক্তিগত অভ্যাস ও সামাজিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে সম্ভব।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- ফ্লেক্সিবল টাইমে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ
- জীবনধারার পরিবর্তন
- ধূমপান ও অ্যালকোহল কমানো
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
- সুষম খাদ্য গ্রহণ
- মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া
- খোলামেলা আলোচনা
- কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে উৎসাহ
পুরুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
ছোট ছোট অভ্যাসগত পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, কোমরের মাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, দৈনন্দিন হাঁটা বা শরীরচর্চা করা ও শরীর বা মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন হলে দেরি না করে চিকিৎসা গ্রহণ করা।
পুরুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু শারীরিক নয়। এটি আচরণ, মানসিকতা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি
