হঠাৎ ঘাড় ফুলছে, বদলে যাচ্ছে গলার স্বর? নারীর যেসব লক্ষণ গুরুত্বের

ঘাড়ের সামনের দিকে হঠাৎ একটু ফোলা দেখা দিয়েছে। গলার স্বরও যেন আগের মতো নেই। কখনো খাবার গিলতে অস্বস্তি হচ্ছে, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছে। এমন পরিবর্তন দেখা দিলে অনেক নারীই বিষয়টিকে মানসিক চাপ, বয়স, ঘুমের অভাব বা হরমোনের ওঠানামা বলে এড়িয়ে যান।
কিন্তু শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন বারবার দেখা দিলে সেটি খেয়াল করা জরুরি। বিশেষ করে ঘাড়ের সামনে কোনো গুটি বা ফোলা, দীর্ঘস্থায়ী গলার স্বর পরিবর্তন কিংবা গিলতে সমস্যা হলে বিষয়টি চিকিৎসকের কাছে বলা উচিত।
থাইরয়েড শরীরের বিপাক, শক্তি ব্যবহার, হৃদ্স্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। তাই থাইরয়েডে সমস্যা হলে লক্ষণ শুধু ঘাড়েই দেখা দেবে, এমন নয়। ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, গরম বা ঠান্ডার প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা মাসিকের অনিয়মও দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য অনেক কারণেও হতে পারে।
ঘাড়ের সামনের দিকে গুটি বা ফোলা
থাইরয়েড গ্রন্থি ঘাড়ের সামনের নিচের দিকে থাকে। এই গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে বা সেখানে কোনো গুটি তৈরি হলে ঘাড়ের সামনে ফোলা দেখা যেতে পারে।
নতুন কোনো গুটি দেখা দিলে সেটি ব্যথাহীন হলেও অবহেলা করা উচিত নয়। বেশির ভাগ থাইরয়েড গুটি ক্যানসার নয়, তবে গুটির কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী থাইরয়েডের আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে সূচের মাধ্যমে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হতে পারে।
গিলতে গেলে গলায় চাপ বা আটকে থাকার অনুভূতি
খাবার গিলতে গিয়ে মনে হচ্ছে গলায় কিছু আটকে আছে বা ঘাড়ের সামনের দিকে চাপ পড়ছে, এমন অনুভূতি দীর্ঘদিন থাকলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।
থাইরয়েড বড় হয়ে গেলে বা ঘাড়ের কোনো গঠন আশপাশের অংশে চাপ দিলে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। তবে গিলতে অস্বস্তির আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু এই একটি লক্ষণ দেখে থাইরয়েডের সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গলার স্বর বদলে গেলে
হঠাৎ গলার স্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে স্বর আগের মতো না থাকা শুধু সর্দি বা গলার সমস্যার কারণে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি ঘাড়ে গুটি বা ফোলা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
থাইরয়েডের বড় গুটি বা অন্যান্য সমস্যার ক্ষেত্রে আশপাশের গঠন ও স্বরযন্ত্রে চাপ পড়লে গলার স্বরে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার (National Health Service) তথ্য অনুযায়ী, তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গলার স্বর বদলে থাকা, গলা ব্যথা বা কাশি থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অকারণে সব সময় ক্লান্ত লাগছে?
থাইরয়েডের সমস্যা হলে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে থাইরয়েড হরমোন কম তৈরি হলে ক্লান্তি, ঠান্ডা বেশি লাগা, শুষ্ক ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য ও মন খারাপের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু ক্লান্তি থাকলেই থাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। ঘুমের ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক চাপ, অপুষ্টি কিংবা অন্য অনেক সমস্যাতেও দীর্ঘদিন ক্লান্ত লাগতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে শুধু হরমোনের সমস্যা বলে ধরে না নিয়ে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ওজন হঠাৎ বাড়ছে বা কমছে
খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক পরিশ্রমে বড় পরিবর্তন না থাকলেও ওজনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলে সেটি খেয়াল করা উচিত।
থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে শরীরের কার্যক্রম ধীর হতে পারে এবং ওজন বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আবার থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হলে ওজন কমতে পারে।
তবে ওজনের পরিবর্তনের পেছনে খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, মানসিক চাপ, অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যা ও বিভিন্ন রোগের ভূমিকা থাকতে পারে।
গরম বা ঠান্ডা সহ্য করতে সমস্যা
আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা থাইরয়েড হরমোন কম থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হলে অতিরিক্ত গরম লাগা বা ঘাম হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই লক্ষণগুলোও একা থাইরয়েড রোগের প্রমাণ নয়। তবে অন্য লক্ষণের সঙ্গে একসঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হচ্ছে?
থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হলে হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। এর সঙ্গে উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, হাত কাঁপা, দুর্বলতা ও ওজন কমার মতো লক্ষণও থাকতে পারে।
হঠাৎ হৃদ্স্পন্দন খুব বেড়ে গেলে, বুকব্যথা হলে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে, ত্বকও বদলে যাচ্ছে
থাইরয়েডের সমস্যায় চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা ত্বক শুষ্ক হওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড হরমোন কম থাকলে এসব লক্ষণের সঙ্গে ঠান্ডা লাগা, ক্লান্তি ও কোষ্ঠকাঠিন্যও থাকতে পারে।
তবে চুল পড়ার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, কিছু ওষুধসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু চুল পড়ছে বলে থাইরয়েড পরীক্ষা করতেই হবে, এমন নয়।
মাসিকের অনিয়মও কি থাইরয়েডের সঙ্গে সম্পর্কিত?
থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে থাইরয়েডের সমস্যায় কিছু নারীর মাসিকের স্বাভাবিক নিয়মে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে মাসিকের পরিবর্তনের সঙ্গে যদি অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, গরম বা ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা কিংবা চুল পড়ার মতো আরও লক্ষণ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।
গর্ভাবস্থা ও মেনোপজের সময় কেন বেশি নজর দরকার?
গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজে শরীরে উল্লেখযোগ্য হরমোন পরিবর্তন হয়। এই সময়ের কিছু শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিকও হতে পারে। কিন্তু সব সমস্যাকে শুধু হরমোনের ওঠানামা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ভারতীয় এক চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন, নারীদের জীবনের এসব পর্যায়ে থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে থাইরয়েডের রোগের ইতিহাস থাকলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো পরিবর্তন নতুনভাবে দেখা দিলে বা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-
- ঘাড়ের সামনে নতুন গুটি বা ফোলা
- গলার স্বর দীর্ঘদিন বদলে থাকা
- খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা
- ঘাড়ে চাপ বা কিছু আটকে থাকার অনুভূতি
- অকারণে দীর্ঘদিন ক্লান্তি
- কারণ ছাড়াই ওজন বাড়া বা কমা
- অস্বাভাবিক গরম বা ঠান্ডা লাগা
- হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া
- চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
- মাসিকের স্বাভাবিক নিয়মে পরিবর্তন
জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা বলছে, ঘাড়ে নতুন গুটি হলে, গুটি বড় হতে থাকলে বা গিলতে কিংবা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে থাইরয়েডের সমস্যা পরীক্ষা করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থা দেখবেন। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ঘাড়ে গুটি বা ফোলা থাকলে আলট্রাসনোগ্রাম করা হতে পারে। কোনো গুটি আরও পরীক্ষা করার প্রয়োজন হলে সূচের মাধ্যমে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা যায়।
থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়লেই অস্ত্রোপচার করতে হবে, এমন নয়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী শুধু পর্যবেক্ষণ, ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
ঘাড়ে সামান্য ফোলা, গলার স্বর বদলে যাওয়া বা অকারণে ক্লান্ত লাগাকে সবসময় গুরুতর রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এসব উপসর্গের অনেক সাধারণ কারণও থাকতে পারে। তবে নতুন কোনো পরিবর্তন যদি দীর্ঘদিন থাকে, ধীরে ধীরে বাড়ে বা একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে সেটিকে শুধু হরমোন বা মানসিক চাপের কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে ঘাড়ে নতুন গুটি, গিলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী গলার স্বর পরিবর্তনের মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
