মানসিক চাপ কেন পেট খারাপ বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ, যা বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান

মানসিক চাপ বা উদ্বেগ যে শুধু মনকে প্রভাবিত করে, তা নয়। এর প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও পড়ে, বিশেষ করে পরিপাকতন্ত্রে। অনেকেই খেয়াল করেন, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা চাপের সময়ে পেট খারাপ হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় বা বারবার টয়লেটে যেতে হয়।
বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক একটি ব্যবস্থা, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল।
কেন স্ট্রেসে বদলে যায় হজম
জেনেটিসিস্ট ও সোভা হেলথের চিফ সায়েন্স অফিসার ম্যাক্স কুশনিরের মতে, মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে, যাকে বলা হয় ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স। হাজার হাজার বছর আগে মানুষের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল দুটি বিষয় - খাবার সংগ্রহ করা এবং হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে বাঁচা।
কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই জায়গা নিয়েছে অফিসের কাজ, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা নানা ধরনের মানসিক উদ্বেগ।
সমস্যা হলো, আমাদের শরীর এখনো এই দুই ধরনের বিপদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। শরীরের কাছে বাঘের আক্রমণ আর ব্যাংকের বকেয়া ঋণ - দুটোই বিপদের সংকেত।
স্ট্রেসের সময় শরীরে কী ঘটে?
যখন আমরা মানসিক চাপে থাকি, তখন শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়।
এই হরমোনগুলো শরীরকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে। ফলে কিছু অঙ্গের কার্যক্রম বাড়ে, আবার কিছু সাময়িকভাবে ধীর হয়ে যায়।
হজম প্রক্রিয়া এমনই একটি কাজ, যা তখন ধীর হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা যে খাবার খাই, তা হজম করতেই শরীরের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি ব্যয় হয়। তাই বিপদের সময় শরীর সেই শক্তি হজমে না খরচ করে পেশি ও মস্তিষ্কে ব্যবহার করতে চায়, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।
মলত্যাগে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে?
স্ট্রেসের কারণে হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- পাতলা পায়খানা
- বারবার মলত্যাগের তাগিদ
- পেট মোচড়ানো বা অস্বস্তি
- গ্যাস ও পেট ফাঁপা
- হজমে সমস্যা
তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। কারও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, আবার কারও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মন ও অন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞরা অন্ত্রকে অনেক সময় শরীরের 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক' বলেও উল্লেখ করেন। কারণ মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সারাক্ষণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। এ কারণে মানসিক অবস্থার পরিবর্তন সরাসরি অন্ত্রের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কীভাবে সমস্যা কমানো যায়?
যদি মানসিক চাপের সময় বারবার হজমের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে শুধু খাবারের দিকে নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য যা করতে পারেন—
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো
- নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা
- শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা মেডিটেশন করা
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
- দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ শুধু মনের ওপর নয়, অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই স্ট্রেসের সময়ে মলত্যাগের অভ্যাস বদলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
যদি এই সমস্যা বারবার হয় বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে সেটিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সুস্থ হজমের জন্য শুধু ভালো খাবারই নয়, সুস্থ মানসিক অবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি







