logo
Advertisement

হার্টের যত্ন নিচ্ছেন, তবু এই ভুলগুলোতে বাড়ছে ঝুঁকি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হার্টের যত্ন নিচ্ছেন, তবু এই ভুলগুলোতে বাড়ছে ঝুঁকি
ছবি: জেটি ইমেজ

হৃদ্‌যন্ত্রের যত্ন বলতে অনেকেই শুধু তেল-চর্বি কম খাওয়া বা নিয়মিত হাঁটার কথাই ভাবেন। কিন্তু হার্টের সুস্থতা আসলে একাধিক অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও চিনি, ধূমপান, ঘুমের অনিয়ম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিংবা রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা না করার মতো বিষয়গুলোও দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম, ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা ও তামাক ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে।

অনেক সময় এসব ভুলের কোনো তাৎক্ষণিক লক্ষণ দেখা যায় না। তাই দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস এখনই খেয়াল করা জরুরি।

দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা

অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, বাসায় ফিরে টিভি দেখা বা মোবাইল ব্যবহার করতে গিয়ে আবার বসে থাকা, সব মিলিয়ে দিনের বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয়ভাবে কেটে যেতে পারে।

শরীরচর্চার জন্য প্রতিদিন জিমে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে দিনের মধ্যে যতটা সম্ভব বসে থাকার সময় কমিয়ে নড়াচড়া করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই একটানা কয়েক ঘণ্টা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা বা হালকা স্ট্রেচিংয়ের অভ্যাস করা যেতে পারে।

খাবারে অতিরিক্ত লবণ

খাবারে বেশি লবণ খাওয়ার অভ্যাস রক্তচাপ বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। আর উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।

শুধু রান্নায় দেওয়া লবণ নয়, প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে। তাই নুডলস, চিপস, সস, প্রক্রিয়াজাত মাংস বা অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবার নিয়মিত খেলে লবণের মোট পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন দিনে ২৩০০ মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম না খাওয়ার পরামর্শ দেয়, আর বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য আদর্শ লক্ষ্য হিসেবে ১৫০০ মিলিগ্রামের কথা উল্লেখ করে।

চিনি বেশি খাওয়া

চিনি শুধু ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়। বিশেষ করে চিনি দেওয়া কোমল পানীয়, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি খাবার ও অতিরিক্ত মিষ্টান্ন নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

২০২৬ সালের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনায় পানীয় ও খাবারে যোগ করা চিনি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিশোধিত শস্য ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বেশি পুষ্টিকর ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শুধু কোলেস্টেরল নয়, কী ধরনের ফ্যাট খাচ্ছেন সেটিও দেখুন

কোলেস্টেরল নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি হলেও শুধু খাবারে কোলেস্টেরলের পরিমাণ দেখলেই হবে না। কোন ধরনের ফ্যাট বেশি খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্য নির্দেশনায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎসকে খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

তাই অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে মাছ, বাদাম, বীজ, ডাল ও উদ্ভিজ্জ উৎসের স্বাস্থ্যকর ফ্যাটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

ধূমপানকে ছোট বিষয় মনে করা

ধূমপান হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। শুধু ধূমপানকারী ব্যক্তি নন, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে ধূমপান বন্ধ করা এবং পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেয়।

তাই দিনে অল্প কয়েকটি সিগারেট খেলেও সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ঘুমকে অবহেলা করা

ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত কম ঘুমানোকে অনেকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ মনে করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম হৃদ্‌স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রাপ্তবয়স্কদের গড়ে প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দেয়। নিয়মিত ঘুমের সময় তৈরি করা এবং ঘুমের আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার কমানোও ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপকে গুরুত্ব না দেওয়া

প্রতিদিনের কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা থেকে তৈরি মানসিক চাপ শরীরেও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং ধূমপান, অতিরিক্ত খাওয়া বা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার মতো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে উৎসাহিত করতে পারে।

তাই মানসিক চাপ কমানোর জন্য হাঁটা, ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, বই পড়া বা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো স্বাস্থ্যকর উপায় বেছে নেওয়া যেতে পারে।

রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা না করা

উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। ফলে নিজেকে সুস্থ মনে হলেও এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সূচক পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

বিশেষ করে পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিংবা ওজন বেশি হলে চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু একটি অভ্যাস বদলালেই হবে না

হার্ট ভালো রাখার ক্ষেত্রে কোনো একটি খাবার বা একটি অভ্যাসের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম, ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা এবং তামাক থেকে দূরে থাকার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের খাদ্য নির্দেশনাতেও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, বেশি শাকসবজি ও ফল খাওয়া, গোটা শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন বেছে নেওয়া, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও যোগ করা চিনি কমানো এবং সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হার্টের সমস্যা একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে চলা খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, ঘুমের অনিয়ম, মানসিক চাপ এবং নিয়ন্ত্রণ না করা উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বড় পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই শুরু করা যেতে পারে। বেশি হাঁটা, খাবারে লবণ ও যোগ করা চিনি কমানো, পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: হেল্থ