দাঁতে ক্যাভিটি ছাড়াও যে ৮ কারণে ব্যথা হতে পারে

দাঁতে ব্যথা হলেই অনেকের প্রথমে মনে হয়, নিশ্চয়ই দাঁতে গর্ত বা ক্যাভিটি হয়েছে। কিন্তু দাঁত পরীক্ষা করে ক্যাভিটি না পাওয়ার পরও যদি ব্যথা থাকে, তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ দাঁতের ব্যথার উৎস সব সময় দাঁতের দৃশ্যমান অংশে থাকে না। মাড়ি, দাঁতের ভেতরের স্নায়ু, দাঁতের সূক্ষ্ম ফাটল, দাঁত ঘষা বা এমনকি সাইনাসের সমস্যাও দাঁতে ব্যথা তৈরি করতে পারে।
কখনো ব্যথা হয় ঠান্ডা পানি বা মিষ্টি খাবার খেলে, কখনো শক্ত কিছু কামড়ালে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক ওপরের দাঁতে একই সঙ্গে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। তাই দাঁতে ক্যাভিটি নেই মানেই দাঁত পুরোপুরি সুস্থ, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
দাঁতের সংবেদনশীলতা
দাঁতে ক্যাভিটি না থাকার পরও ব্যথার একটি সাধারণ কারণ হতে পারে দাঁতের অতিসংবেদনশীলতা বা tooth sensitivity।
দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষয়ে গেলে কিংবা মাড়ি সরে গিয়ে দাঁতের গোড়া বা রুটের অংশ উন্মুক্ত হলে ভেতরের ডেন্টিনে থাকা সূক্ষ্ম নালিগুলো উদ্দীপনার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তখন ঠান্ডা, গরম, মিষ্টি বা টক খাবার খেলে হঠাৎ শিরশিরে বা তীক্ষ্ণ ব্যথা হতে পারে।
সাধারণত উদ্দীপনা সরিয়ে নেওয়ার পর ব্যথা দ্রুত কমে গেলে সংবেদনশীলতার সম্ভাবনা থাকে। তবে ব্যথা দীর্ঘ সময় থাকে বা ক্রমেই বাড়তে থাকলে শুধু সংবেদনশীলতা ধরে নিয়ে বসে থাকা ঠিক নয়।
মাড়ির সমস্যা
দাঁত দেখতে স্বাভাবিক হলেও মাড়িতে সমস্যা থাকলে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। মাড়ি সরে গেলে দাঁতের এমন অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায়, যা সাধারণত মাড়ির নিচে থাকার কথা। ফলে সেখানে ঠান্ডা বা গরমের সংবেদন বেশি হতে পারে।
মাড়ির প্রদাহ বা রোগের ক্ষেত্রে মাড়ি ফুলে যাওয়া, লাল হওয়া, ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়া এবং মুখে দুর্গন্ধের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
তাই দাঁতে গর্ত নেই দেখে শুধু দাঁতের ওপর নজর না দিয়ে মাড়ির অবস্থাও খেয়াল করা দরকার।
দাঁতে সূক্ষ্ম ফাটল
দাঁতের খুব ছোট ফাটল অনেক সময় খালি চোখে দেখা যায় না। এমনকি সাধারণ পরীক্ষাতেও তা ধরা কঠিন হতে পারে। কিন্তু সেই ফাটলের কারণে কামড় দেওয়ার সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে শক্ত খাবার খাওয়ার সময় ব্যথা হওয়া এবং কামড়ের চাপ ছেড়ে দেওয়ার সময় ব্যথা অনুভূত হওয়া দাঁতের ফাটলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
দাঁতে আঘাত লাগা, শক্ত খাবার কামড়ানো বা দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
দাঁতের গোড়ার ফাটল আরও গভীরে থাকলে সাধারণ এক্স-রেতেও সব সময় তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। প্রয়োজনে বিশেষ পরীক্ষা বা উন্নত ইমেজিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা বা চাপ দেওয়া
অনেকে ঘুমের মধ্যে অজান্তেই দাঁত ঘষেন বা শক্ত করে চেপে রাখেন। এই সমস্যাকে ব্রুক্সিজম বলা হয়।
দীর্ঘদিন দাঁত ঘষা বা চেপে রাখলে দাঁত ও চোয়ালের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে দাঁতে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে এবং চোয়ালের পেশিতে ব্যথা বা শক্তভাবও দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
ঘুম থেকে ওঠার পর দাঁত বা চোয়ালে ব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা চোয়ালে ক্লান্তির মতো অনুভূতি থাকলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো ভালো।
সাইনাসের সমস্যার কারণে দাঁতে ব্যথা
বিশেষ করে ওপরের পেছনের দাঁতগুলো সাইনাসের খুব কাছাকাছি। তাই সাইনাসে প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণে তৈরি চাপ অনেক সময় ওপরের দাঁতে ব্যথা হিসেবে অনুভূত হতে পারে।
এ ধরনের ব্যথায় একটি দাঁতের বদলে একসঙ্গে কয়েকটি ওপরের দাঁতে অস্বস্তি হতে পারে। সঙ্গে নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে সর্দি পড়া, মুখে চাপ বা মাথাব্যথার মতো সাইনাসের লক্ষণও থাকতে পারে।
তাই দাঁতে ক্যাভিটি না থাকলে এবং একই সঙ্গে সাইনাসের সমস্যা থাকলে ব্যথার উৎস দাঁতের বাইরে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হয়।
আক্কেল দাঁত ওঠার সমস্যা
বড়দের ক্ষেত্রে আক্কেল দাঁত ওঠার সময়ও ব্যথা হতে পারে। মুখে জায়গা কম থাকলে আক্কেল দাঁত ঠিকভাবে বের হতে না পেরে মাড়ির ভেতরে বা আংশিকভাবে আটকে থাকতে পারে।
এ অবস্থায় দাঁতের আশপাশের মাড়িতে প্রদাহ, ফোলা, ব্যথা এমনকি সংক্রমণও হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে pericoronitis বলা হয়।
তাই মুখের একেবারে পেছনের দিকে ব্যথা হলে সেখানে ক্যাভিটি না থাকলেও আক্কেল দাঁতের অবস্থান পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।
দাঁতের ভেতরের স্নায়ুতে প্রদাহ বা সংক্রমণ
দাঁতের বাইরের অংশে কোনো গর্ত চোখে না পড়লেও দাঁতের ভেতরের pulp বা স্নায়ুতে প্রদাহ হতে পারে। একে pulpitis বলা হয়।
আঘাত, দাঁতের ফাটল বা আগের কোনো বড় ধরনের দাঁতের চিকিৎসার পরও দাঁতের ভেতরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন দাঁতে নিজে থেকেই ব্যথা শুরু হতে পারে কিংবা গরম বা ঠান্ডা লাগার পর ব্যথা দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।
ব্যথা যদি কোনো উদ্দীপনা ছাড়াই হতে থাকে, রাতে বাড়ে বা ঠান্ডা-গরম সরিয়ে নেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় থাকে, তাহলে দ্রুত দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যে দাঁতে ব্যথা হচ্ছে, আসল সমস্যা সেখানে নাও থাকতে পারে
দাঁতের ব্যথার সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলোর একটি হলো referred pain বা অন্য জায়গার সমস্যা থেকে ব্যথা অনুভূত হওয়া।
একটি দাঁতে ব্যথা মনে হলেও আসল সমস্যা পাশের দাঁত, চোয়ালের পেশি, সাইনাস বা অন্য কোনো জায়গায় থাকতে পারে। ফলে শুধু যে দাঁতটি ব্যথা করছে সেটি দেখে কারণ বোঝা সব সময় সম্ভব হয় না।
কিছু ক্ষেত্রে চোয়ালের জয়েন্ট ও আশপাশের পেশির সমস্যাও দাঁতের ব্যথার মতো অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আবার খুব বিরল ক্ষেত্রে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার মতো স্নায়বিক সমস্যাও দাঁতের ব্যথা বলে মনে হতে পারে।
কখন দাঁতের ব্যথাকে গুরুত্ব দেবেন
হালকা ও সাময়িক সংবেদনশীলতা সব সময় গুরুতর সমস্যার লক্ষণ নয়। কিন্তু ব্যথা যদি বারবার হয়, ক্রমে বাড়ে বা নিজে থেকেই শুরু হয়, তাহলে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করাই ভালো-
- কামড় দেওয়ার সময় তীব্র ব্যথা
- মাড়ি বা মুখ ফুলে যাওয়া
- জ্বর বা কাঁপুনি
- দাঁতের ব্যথা ক্রমে বাড়তে থাকা
- ঠান্ডা বা গরম সরিয়ে নেওয়ার পরও ব্যথা দীর্ঘক্ষণ থাকা
- দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া
- মাড়ি থেকে রক্ত বা পুঁজ পড়া
- মুখে দুর্গন্ধ বা অস্বাভাবিক স্বাদ
তীব্র দাঁতের ব্যথার সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি বা মুখে উল্লেখযোগ্য ফোলা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। মুখের সংক্রমণ কখনো কখনো আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ক্যাভিটি নেই মানেই চিকিৎসা লাগবে না, এমন নয়
দাঁতে গর্ত না থাকা অবশ্যই ভালো খবর। কিন্তু দাঁতের ব্যথার কারণ শুধু ক্যাভিটি নয়। সংবেদনশীলতা, মাড়ি সরে যাওয়া, মাড়ির রোগ, দাঁতের ফাটল, দাঁত ঘষা, আক্কেল দাঁতের সমস্যা, দাঁতের ভেতরের স্নায়ুতে প্রদাহ এবং সাইনাসের সমস্যাও একই ধরনের ব্যথা তৈরি করতে পারে।
তাই আয়নায় দাঁত দেখে নিজে কারণ নির্ধারণের চেষ্টা না করে ব্যথার ধরন, কখন শুরু হয় এবং কীসে বাড়ে বা কমে, এসব তথ্য চিকিৎসককে জানানো বেশি কার্যকর। প্রয়োজনে দাঁতের পরীক্ষা ও এক্স-রের মাধ্যমে সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাঁতে ব্যথা হচ্ছে অথচ ক্যাভিটি নেই, এই দুই তথ্যকে পরস্পরবিরোধী মনে করার কারণ নেই। দাঁতের ব্যথা আসলে শরীরের একটি সংকেত। কারণটি খুঁজে বের করা গেলে সঠিক চিকিৎসাও সহজ হয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


