logo

চা খাওয়ার ৭ ভুল অভ্যাস, অজান্তেই যে ক্ষতি করছেন শরীরের

চা খাওয়ার ৭ ভুল অভ্যাস, অজান্তেই যে ক্ষতি করছেন শরীরের
ছবি: মিস্টি মাউন্টেইন টি

সকালের শুরুতে এক কাপ চা, বিকেলে নাশতার সঙ্গে আর কাজের ফাঁকে আরও এক কাপ। চা অনেকের প্রতিদিনের অভ্যাসের অংশ। পরিমিত চা সাধারণত বেশির ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ। কিন্তু চা কীভাবে তৈরি করছেন, কখন খাচ্ছেন এবং তাতে কতটা চিনি বা দুধ দিচ্ছেন, তার ওপর এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে।

খালি পেটে চা খাওয়া, খুব ঘন করে চা বানানো, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া বা খাওয়ার পরপরই চা পান করার মতো কিছু অভ্যাস পেটের অস্বস্তি বা পুষ্টি শোষণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুম ও হজমে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। সাধারণভাবে পরিমিত চা পান করলেই লিভার নষ্ট হয়, এমন প্রমাণ নেই। বরং লিভারের ক্ষতির বিষয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা বিশেষ করে ঘনমাত্রার গ্রিন টি নির্যাস বা সম্পূরক গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশি দেখা গেছে।

খুব ঘন করে চা বানানো

অনেকে বেশি সময় ধরে চা পাতা বা চায়ের ব্যাগ পানিতে রেখে দেন। এতে চায়ে ক্যাফেইন ও ট্যানিনের পরিমাণ বাড়তে পারে। খুব ঘন চা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেটে অস্বস্তি, অম্বল বা বমি বমি ভাব তৈরি করতে পারে।

তাই চায়ের রং গাঢ় করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পাতা ফুটিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক মাত্রায় তৈরি চা পান করাই ভালো।

খালি পেটে চা খাওয়া

ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে সরাসরি চা পান করা অনেকের অভ্যাস। কিন্তু যাদের অম্বল বা পেটের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাসে পেটের অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে। চায়ের ক্যাফেইন ও অন্যান্য যৌগ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

তাই খালি পেটে চা খেয়ে যদি নিয়মিত অস্বস্তি হয়, আগে হালকা কিছু খাবার খেয়ে নেওয়া যেতে পারে।

চায়ে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া

এক কাপ চায়ে এক চামচ চিনি হয়তো খুব বেশি মনে হয় না। কিন্তু দিনে তিন বা চার কাপ চা পান করলে মোট চিনি দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে যারা প্রতিবার চায়ে বেশি চিনি দেন, তাদের ক্ষেত্রে দৈনিক অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন বেশি পরিমাণে যোগ করা চিনি গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি, বিপাকীয় সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।

তাই চায়ে চিনি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ভালো অভ্যাস। চায়ের স্বাদে অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কম চিনি দিয়েও পান করা সম্ভব।

চায়ে অতিরিক্ত দুধ দেওয়া

দুধ চায়ে দুধের পরিমাণ বেশি হলে অনেকের পেট ভার লাগতে পারে বা পেট ফাঁপার মতো অস্বস্তি হতে পারে। তবে দুধ নিজেই সবার জন্য ক্ষতিকর, এমন নয়।

যাদের দুধ হজমে সমস্যা হয় বা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বেশি দুধ দেওয়া চা পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই চা খাওয়ার পর বারবার পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি হলে দুধের পরিমাণ কমিয়ে দেখুন।

খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চা পান করা

ভাত, রুটি বা অন্য খাবার খাওয়ার পরপরই চা পান করার অভ্যাস অনেকের রয়েছে। কিন্তু চায়ে থাকা পলিফেনল বা ট্যানিন খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রনের ক্ষেত্রে এই প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।

যাদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা রক্তশূন্যতার ঝুঁকি আছে, তাদের খাবারের সঙ্গে বা খাবারের ঠিক পরেই চা পান না করাই ভালো।

চা ও খাবারের মধ্যে কিছুটা সময়ের ব্যবধান রাখা যেতে পারে।

দিনে অতিরিক্ত চা পান করা

চায়ে ক্যাফেইন থাকে। পরিমিত ক্যাফেইন বেশির ভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু অতিরিক্ত চা পান করলে মোট ক্যাফেইন গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।

এর ফলে কিছু মানুষের ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা বা অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা হতে পারে।

তাই শুধু চায়ের কাপ গুনলেই হবে না। দিনে কফি, কোমল পানীয় বা ক্যাফেইনযুক্ত অন্য পানীয়ও খেলে সেগুলো থেকে পাওয়া ক্যাফেইন হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

পানির বদলে শুধু চায়ের ওপর নির্ভর করা

চা তরল হিসেবে শরীরে পানি সরবরাহে অবদান রাখে। তাই সাধারণ পরিমাণে চা পান করলে শরীর পানিশূন্য হয়ে যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে চাকে পানির সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়াও উচিত নয়।

বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বা শরীরে পানির প্রয়োজন বেশি হলে পর্যাপ্ত সাধারণ পানিও খেতে হবে।

গ্রিন টি কি লিভারের জন্য ক্ষতিকর?

গ্রিন টি নিয়ে একটি আলাদা বিষয় রয়েছে। সাধারণভাবে তৈরি গ্রিন টি পান করা এবং ঘনমাত্রার গ্রিন টি নির্যাস বা সম্পূরক গ্রহণকে একভাবে দেখা উচিত নয়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন টি নির্যাসের কিছু উচ্চমাত্রার সম্পূরক গ্রহণের সঙ্গে লিভারের ক্ষতির ঘটনা যুক্ত হয়েছে। এনসিবিআইয়ের লিভারটক্স তথ্যভান্ডারও জানিয়েছে, গ্রিন টি নির্যাসের কারণে বিরল ক্ষেত্রে তীব্র লিভার ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে, একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘনমাত্রার ক্যাটেচিন সমৃদ্ধ গ্রিন টি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে লিভারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বেশি, কিন্তু সাধারণভাবে পানীয় হিসেবে তৈরি চায়ে এই ঝুঁকি একইভাবে দেখা যায়নি।

তাই ওজন কমানো বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত উদ্দেশ্যে নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রার গ্রিন টি নির্যাস বা সম্পূরক গ্রহণ করা ঠিক নয়।

চা খাওয়ার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস কেমন হতে পারে?

চা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি অভ্যাস মেনে চললেই অনেক অপ্রয়োজনীয় সমস্যা এড়ানো যায়।

  • খুব ঘন করে চা বানাবেন না
  • খালি পেটে চা খেলে অস্বস্তি হলে আগে হালকা কিছু খান
  • চায়ে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া কমান
  • দুধে সমস্যা হলে দুধের পরিমাণ কমিয়ে দেখুন
  • খাবারের সঙ্গে বা ঠিক পরেই চা পান না করাই ভালো, বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতি থাকলে
  • দিনে অতিরিক্ত চা পান করবেন না
  • চায়ের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সাধারণ পানি পান করুন
  • ওজন কমানো বা অন্য স্বাস্থ্যগত উদ্দেশ্যে উচ্চমাত্রার গ্রিন টি নির্যাসের সম্পূরক নিজের ইচ্ছায় খাবেন না

চা নিজে থেকেই ক্ষতিকর পানীয় নয়। সমস্যা তৈরি হতে পারে মূলত অতিরিক্ত পরিমাণ, খুব ঘন করে তৈরি করা, বেশি চিনি দেওয়া, খালি পেটে পান করা বা খাবারের সঙ্গে খাওয়ার মতো অভ্যাসে।

আর লিভারের ক্ষেত্রে সাধারণ চা ও গ্রিন টি নির্যাসকে এক করে দেখা উচিত নয়। সাধারণ চা পানকে সরাসরি লিভারের ক্ষতির কারণ বলার মতো প্রমাণ নেই। বরং উচ্চমাত্রার গ্রিন টি নির্যাসের ক্ষেত্রে বিরল হলেও লিভারের ক্ষতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

তাই চা ছাড়ার চেয়ে চা খাওয়ার অভ্যাসটিকে একটু স্বাস্থ্যকর করে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া