logo
Advertisement

পেটব্যথা থেকে অ্যাপেনডিসাইটিস নাকি ক্যানসার, জানুন পার্থক্য

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
পেটব্যথা থেকে অ্যাপেনডিসাইটিস নাকি ক্যানসার, জানুন পার্থক্য
অ্যাপেন্ডিক্সে সমস্যা মানেই অ্যাপেন্ডিসাইটিস নয়। ছবি : সংগৃহীত

পেটের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা। সঙ্গে বমি বমি ভাব, খাওয়ার অরুচি বা জ্বর। এমন হলে সবার আগে যে সমস্যাটির কথা মনে আসে, সেটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস। অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দিতে হয়।

Advertisement

কিন্তু অ্যাপেন্ডিক্সে সমস্যা মানেই অ্যাপেন্ডিসাইটিস নয়। খুব বিরল হলেও এই ছোট অঙ্গটিতে ক্যানসারও হতে পারে। সমস্যা হলো, অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসারের কিছু লক্ষণ সাধারণ পেটের সমস্যা বা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের মতো হওয়ায় শুরুতে এটি আলাদা করে বোঝা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সন্দেহে অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণের পর টিস্যু পরীক্ষা করে ক্যানসার ধরা পড়ে।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার নিয়ে তাই মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এমন পাঁচটি ধারণা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।


অ্যাপেন্ডিসাইটিস আর অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার একই

দুটো একেবারেই এক না।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস হলো অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ। সাধারণত কোনো কারণে অ্যাপেন্ডিক্সের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে প্রদাহ বা সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার হয় যখন ওই অঙ্গের অস্বাভাবিক কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে।

তবে বিভ্রান্তির কারণ আছে। অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সন্দেহে অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দেওয়ার পর সেটি পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে কখনো কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে ক্যানসার ধরা পড়ে। অর্থাৎ অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেলা হয়েছে মানেই সেখানে ক্যানসার ছিল, এমন নয়। আবার শুধু বাইরে থেকে দেখে ক্যানসার নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। টিস্যু পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার শুধু বয়স্কদের হয়

এটিও ঠিক নয়।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার বিরল এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু বয়স্কদেরই এই রোগ হয়, এমন কোনো নিয়ম নেই। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় অ্যাপেন্ডিক্সের অ্যাডেনোকারসিনোমা তরুণ ও বয়স্ক, দুই বয়সগোষ্ঠীতেই বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে তরুণ কারও পেটে ব্যথা হলেই ক্যানসার পরীক্ষা করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পেটব্যথার কারণ অন্য কিছু। তবে বয়স কম বলে দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক উপসর্গকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার এক ধরনের

আসলে অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসারও এক ধরনের নয়।

অ্যাপেন্ডিক্সে বিভিন্ন ধরনের টিউমার হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মিউসিনাস টিউমার, অ্যাডেনোকারসিনোমা, নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার এবং গবলেট সেল টিউমার। প্রতিটির আচরণ, ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এবং চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।

কোন ধরনের টিউমার হয়েছে, সেটি জানা চিকিৎসার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ছোট, ধীরে বাড়তে থাকা টিউমারের চিকিৎসা আর দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের চিকিৎসা এক হবে না।

এ কারণেই ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর শুধু ক্যানসার হয়েছে এতটুকু জানলেই যথেষ্ট নয়। কোন ধরনের ক্যানসার, কতটা আক্রমণাত্মক এবং শরীরের কোথায় ছড়িয়েছে, এসব তথ্যও জানা প্রয়োজন।

অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেললেই চিকিৎসা শেষ

কিছু ক্ষেত্রে অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু সব রোগীর ক্ষেত্রে নয়।

টিউমার যদি ছোট হয় এবং অ্যাপেন্ডিক্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শুধু অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচারই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু টিউমার বড় হলে, অ্যাপেন্ডিক্সের গোড়ার দিকে থাকলে, কোষের বৈশিষ্ট্য বেশি আক্রমণাত্মক হলে বা আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়লে আরও বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বৃহদান্ত্রের একটি অংশও বাদ দিতে হতে পারে। আবার ক্যানসার যদি পেটের ভেতরের আবরণে ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা আরও জটিল হতে পারে।

নির্বাচিত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সাইটোরিডাকটিভ সার্জারির সঙ্গে হাইপারথারমিক ইন্ট্রাপেরিটোনিয়াল কেমোথেরাপি বা হাইপেক দেওয়া হতে পারে। এতে অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতরে উত্তপ্ত কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়।

তাই অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেলার পর টিস্যু পরীক্ষার ফলাফল জানা এবং চিকিৎসকের পরবর্তী পরামর্শ অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার হলে আর বাঁচার আশা নেই

এটিও একটি ভুল ধারণা।

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার বিরল হলেও সব ধরনের ক্যানসারের পরিণতি এক নয়। রোগীর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, কোষের বৈশিষ্ট্য, রোগ কতটা ছড়িয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কতটা সম্পূর্ণভাবে তা বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে তার ওপর।

কিছু ধীরগতির ও কম আক্রমণাত্মক ক্যানসার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব। আবার বেশি আক্রমণাত্মক বা ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

তাই অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার ধরা পড়লেই সব শেষ, এমন ভাবার কারণ নেই। একই সঙ্গে রোগটি বিরল বলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক নয়।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসারের শুরুতে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। এ কারণেই রোগটি অনেক সময় অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের সময় ধরা পড়ে।

উপসর্গ দেখা দিলে এর মধ্যে থাকতে পারে-

  • পেটের ডান দিকে বা পেটের অন্য অংশে ব্যথা
  • পেট ফুলে থাকা বা পেটের আকার বাড়তে থাকা
  • পেটে কোনো চাকা বা অস্বাভাবিক অনুভূতি
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি
  • পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তন

তবে এসব লক্ষণ দেখলেই অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার হয়েছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। একই ধরনের উপসর্গ গ্যাস, বদহজম, সংক্রমণ, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ অনেক সাধারণ সমস্যাতেও হতে পারে।

পেট ফুলে গেলে কেন সতর্ক হতে হবে?

কিছু ধরনের অ্যাপেন্ডিক্সের টিউমার মিউসিন বা আঠালো ধরনের পদার্থ তৈরি করতে পারে। রোগটি পেটের ভেতরে ছড়িয়ে পড়লে এই পদার্থ জমে পেটের আকার বাড়তে পারে। এমন অবস্থাকে পসুডোমাইক্সোমা পেরিটোনাই বলা হয়।

তাই পেট ধীরে ধীরে অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি রয়েছে বা অল্প খাবারেই পেট ভরে যাচ্ছে, এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

একবার পেটব্যথা হলেই ক্যানসার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ব্যথা যদি বারবার হয়, কয়েক দিন ধরে থাকে বা আগের তুলনায় অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা উচিত।

বিশেষ করে পেটের আকার বাড়তে থাকা, দীর্ঘদিনের পেটফাঁপা, বারবার বমি, অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া বা পেটের মধ্যে কোনো চাকা অনুভূত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের মতো পরীক্ষা করতে পারেন। ক্যানসারের ধরন নিশ্চিত করার জন্য টিস্যু পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচারের পর কী করবেন?

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সন্দেহে অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণ করা হলে অনেকেই ভাবেন, চিকিৎসা শেষ। কিন্তু অপসারিত অ্যাপেন্ডিক্সের টিস্যু পরীক্ষার রিপোর্ট কী বলছে, সেটিও জানা গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসার দুর্ঘটনাক্রমে ধরা পড়তে পারে। তখন ক্যানসারের ধরন ও বিস্তারের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী চিকিৎসা ঠিক করা হয়।

তাই অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে টিস্যু পরীক্ষার রিপোর্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

ভয় নয়, সচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার খুবই বিরল। তাই পেটে ব্যথা হলেই ক্যানসারের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে শুধু গ্যাস বা বদহজম ভেবে তা এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপসর্গের ধরন ও স্থায়িত্ব খেয়াল করা। কোনো সমস্যা বারবার হলে বা স্বাভাবিকের তুলনায় আলাদা মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস আর অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার এক নয়। বয়স কম হলেও অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার হতে পারে, আবার এই ক্যানসারও এক ধরনের নয়। টিউমারের ধরন ও বিস্তারের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। কোথাও শুধু অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দেওয়াই যথেষ্ট হতে পারে, আবার কোথাও বড় অস্ত্রোপচার বা কেমোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।

তাই পেটে ব্যথা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তবে দীর্ঘদিনের বা অস্বাভাবিক পেটের সমস্যা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার বিরল হলেও, সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা রোগীর ভবিষ্যৎ অনেকটাই বদলে দিতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া