ভুলে যাওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে, যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন

মোবাইল কোথায় রেখেছেন, চাবি কোথায় রাখলেন কিংবা পরিচিত কারও নাম হঠাৎ মনে না পড়া, এমন ঘটনা প্রায় সবার জীবনেই ঘটে। ব্যস্ততা, মানসিক চাপ বা বয়সের কারণে মাঝেমধ্যে কিছু ভুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এই ভুলে যাওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে থাকে, একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকেন অথবা দৈনন্দিন কাজ করতেও সমস্যা হয়, তাহলে বিষয়টি আর সাধারণ ভুলে যাওয়া নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তন অনেক সময় আলঝেইমার্স রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। তাই স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া আর রোগজনিত স্মৃতিভ্রংশের মধ্যে পার্থক্য জানা জরুরি।
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া বলতে কী বোঝায়?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের তথ্য মনে করার গতি কিছুটা কমে যায়। তাই কোনো নাম বা তথ্য মনে করতে একটু বেশি সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়।
নিচের বিষয়গুলো সাধারণত স্বাভাবিক ভুলে যাওয়ার মধ্যেই পড়ে।
- পরিচিত কারও নাম মুহূর্তের জন্য ভুলে যাওয়া, পরে মনে পড়ে যাওয়া
- মাঝে মাঝে চশমা, মোবাইল বা চাবি কোথায় রেখেছেন তা ভুলে যাওয়া
- কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভুলে গেলেও পরে মনে পড়ে যাওয়া
- নতুন প্রযুক্তি বা নতুন কোনো কাজ শিখতে একটু বেশি সময় লাগা
এ ধরনের ভুলে যাওয়ার কারণে সাধারণত দৈনন্দিন জীবন বা কাজের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে না।
কখন ভুলে যাওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে?
যখন স্মৃতিশক্তির সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে শুরু করে, তখন সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
একই প্রশ্ন বা একই কথা বারবার বলা
আলঝেইমার্সের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো একই প্রশ্ন বা একই তথ্য বারবার বলা। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তি মনে রাখতে পারেন না যে তিনি কিছুক্ষণ আগেই একই বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
নতুন ঘটনা সহজেই ভুলে যাওয়া
আজ সকালে কী খেয়েছেন, কার সঙ্গে কথা বলেছেন বা কিছুক্ষণ আগে কী ঘটেছে, এসব বিষয় দ্রুত ভুলে যাওয়া আলঝেইমার্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।
পরিচিত কাজ করতেও সমস্যা হওয়া
দীর্ঘদিন ধরে করে আসা কাজ, যেমন রান্না করা, ব্যাংকের হিসাব রাখা, বিল পরিশোধ করা বা নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার বিষয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
মনে করিয়ে দিলেও কিছুই মনে না পড়া
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য ইঙ্গিত দিলে বিষয়টি মনে পড়ে যায়। কিন্তু আলঝেইমার্সে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমনটি অনেক সময় হয় না। যতই মনে করিয়ে দেওয়া হোক, তথ্যটি আর মনে আসে না।
সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হওয়া
আজ কী বার, কোন মাস চলছে বা পরিচিত কোনো জায়গায় গিয়েও কোথায় আছেন তা বুঝতে সমস্যা হলে সেটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া
অনেক সময় সাধারণ শব্দও মনে আসে না। ফলে কথোপকথনের মাঝখানে থেমে যাওয়া বা একই কথা বারবার বলার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
জিনিসপত্র অস্বাভাবিক জায়গায় রেখে ভুলে যাওয়া
চাবি ফ্রিজে রাখা, মোবাইল রান্নাঘরের আলমারিতে রেখে পরে সেটি খুঁজে না পাওয়া, এমন ঘটনা বারবার ঘটলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
অর্থের হিসাব রাখতে সমস্যা, অপ্রয়োজনীয় খরচ করা বা সহজ সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধায় পড়া অনেক সময় স্মৃতিশক্তির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন
আলঝেইমার্স শুধু স্মৃতিশক্তি নয়, আচরণেও পরিবর্তন আনে। যেমন -
- হঠাৎ রেগে যাওয়া
- অস্থির বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া
- মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া
- আগের পছন্দের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন আসা
পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই এসব পরিবর্তন প্রথমে লক্ষ্য করেন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি ভুলে যাওয়ার কারণে নিজের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে শুরু করে, পরিবারের সদস্যরা আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন অথবা স্মৃতিশক্তির সমস্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে দেরি না করে একজন নিউরোলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং মানসিক সহায়তার মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি কিছুটা ধীর করা সম্ভব। একই সঙ্গে রোগী ও পরিবারের জন্য ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করাও সহজ হয়।
ভুলে যাওয়া কমাতে যেসব অভ্যাস সাহায্য করতে পারে
আলঝেইমার্স পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় না থাকলেও কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মস্তিষ্ককে ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
- বই পড়া, ধাঁধা সমাধান বা নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখুন।
- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটান এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
সব ভুলে যাওয়া আলঝেইমার্সের লক্ষণ নয়। তবে যদি স্মৃতিশক্তির সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, একই কথা বারবার বলতে শুরু করেন, পরিচিত কাজও কঠিন হয়ে যায় কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক হবে না।
সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও যত্ন শুরু করা সহজ হয় এবং রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া




