হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ে যা জানা জরুরি

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, যা অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর শরীরের ভেতরে ক্ষতি করতে থাকে। তাই একে অনেকেই 'নীরব ঘাতক' বলে থাকেন। সময়মতো ধরা না পড়লে এটি হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
তবে সুখবর হলো, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
হাই ব্লাড প্রেশার কী?
রক্ত শরীরের ধমনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ধমনির দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি করে, তাকে রক্তচাপ বলা হয়। যখন এই চাপ দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়।
ধমনিগুলো সরু হয়ে গেলে বা রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হলে হৃদ্যন্ত্রকে বেশি জোরে রক্ত পাম্প করতে হয়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রক্তচাপ কত হলে স্বাভাবিক
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তচাপের মাত্রা সাধারণত এভাবে ভাগ করা হয়।
স্বাভাবিক: ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg)-এর নিচে
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়: সিস্টোলিক ১২০-১২৯ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg) এবং ডায়াস্টোলিক ৮০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg)-এর নিচে
স্টেজ ১ হাইপারটেনশন: ১৩০-১৩৯ / ৮০-৮৯ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg)
স্টেজ ২ হাইপারটেনশন: ১৪০/৯০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg) বা তার বেশি
হাইপারটেনসিভ ক্রাইসিস: ১৮০/১২০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg) বা তার বেশি
রক্তচাপ ১৮০/১২০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg)-এর বেশি হলে এবং এর সঙ্গে বুকব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
কেন হয় উচ্চ রক্তচাপ?
উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে।
প্রাথমিক বা প্রাইমারি হাইপারটেনশন
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে তৈরি হয়। এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো - পারিবারিক ইতিহাস, বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা, ডায়াবেটিস বা মেটাবলিক সিনড্রোম, অতিরিক্ত মদ্যপান, দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন।
এ ধরনের উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে হয়। যেমন—
- কিডনির রোগ
- স্লিপ অ্যাপনিয়া
- থাইরয়েড বা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হাই ব্লাড প্রেশারের লক্ষণ কী?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ মানুষের কোনো উপসর্গই থাকে না। তবে রক্তচাপ অনেক বেশি বেড়ে গেলে তীব্র মাথাব্যথা, বমিভাব বা বমি, চোখে ঝাপসা দেখা, বুক বা পিঠে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও/বা মাথা ঘোরা দেখা দিতে পারে।
তাই কোনো লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি।
চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন -
- স্ট্রোক
- হার্ট অ্যাটাক
- হার্ট ফেইলিওর
- কিডনি বিকল
- চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
- যৌন সমস্যা
- স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, শিশুর ওজন কম হতে পারে এবং প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন খুবই কার্যকর। যেমন - খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন, প্রতিদিন পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি খান। পাশাপাশি শস্য জাতীয় খাবার, মাছ, ডাল ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন বেছে নিন, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান এবং চিনি ও কোমল পানীয় কমিয়ে দিন। এছাড়া -
নিয়মিত ব্যায়াম করুন: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করার চেষ্টা করুন। যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম বড় কারণ। ওজন কমাতে পারলে রক্তচাপও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে আসে।
ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল হৃদ্রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিক চাপ কমান: পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি নিয়মিত রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg) বা তার বেশি থাকে, অথবা হঠাৎ খুব বেশি বেড়ে যায় এবং এর সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথাব্যথা বা ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি সমস্যা, যা অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ক্ষতি করতে পারে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করলেই নয়, সুস্থ থাকলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে হাই ব্লাড প্রেশার সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সূত্র: হেলথলাইন






