অস্ত্রোপচারে ধরা পড়ে পুরুষের যে বিরল রোগ

পুরুষের শরীরে জরায়ু বা ফ্যালোপিয়ান টিউব থাকার কথা শুনলে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি অত্যন্ত বিরল জন্মগত অবস্থা রয়েছে, যেখানে বাহ্যিকভাবে পুরুষের মতো দেখতে এবং সাধারণত ৪৬, XY ক্রোমোজোমযুক্ত ব্যক্তির শরীরের ভেতরে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো মুলেরিয়ান অঙ্গ থেকে যেতে পারে।
এই অবস্থার নাম পারসিস্টেন্ট মুলারিয়ান ডাক্ট সিনড্রোম (Persistent Müllerian Duct Syndrome) বা পিএমডিএস (PMDS)। এটি একটি বিরল জেনেটিক অবস্থা, যেখানে ভ্রূণের বিকাশের সময় মুলেরিয়ান নালি স্বাভাবিক নিয়মে বিলীন হয় না। ফলে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো অঙ্গ শরীরের ভেতরে থেকে যেতে পারে।
এটি সাধারণ কোনো রোগ নয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির বাহ্যিক যৌনাঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক পুরুষের মতোই থাকে। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছোটবেলায় বোঝাও যায় না। কখনো অন্য কোনো কারণে অস্ত্রোপচারের সময় ঘটনাটি ধরা পড়ে।
পিএমডিএস কী?
ভ্রূণের বিকাশের সময় শরীরে বিভিন্ন প্রজনন অঙ্গ তৈরি হওয়ার একটি জটিল প্রক্রিয়া চলে। পুরুষ ভ্রূণের ক্ষেত্রে মুলেরিয়ান নালি সাধারণত অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন বা এএমএইচের প্রভাবে বিলীন হয়ে যায়।
কিন্তু পিএমডিএস-এর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হয়। শরীর পর্যাপ্ত অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন তৈরি করতে না পারলে অথবা সেই হরমোনের সংকেত গ্রহণকারী রিসেপ্টর ঠিকমতো কাজ না করলে মুলেরিয়ান নালির কিছু অংশ থেকে যেতে পারে। এর ফলে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো অঙ্গ শরীরের ভেতরে তৈরি বা অবস্থান করতে পারে।
অর্থাৎ, এটি পরে জীবনে তৈরি হওয়া কোনো রোগ নয়। জন্মের আগেই ভ্রূণের বিকাশের সময় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
পুরুষের শরীরে জরায়ু থাকার অর্থ কী?
পিএমডিএসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাধারণত বাহ্যিকভাবে পুরুষ হিসেবেই দেখা যায়। অনেকের পুরুষের স্বাভাবিক যৌনাঙ্গ ও পুরুষালি শারীরিক বৈশিষ্ট্য থাকে।
কিন্তু শরীরের ভেতরে জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং কখনো মুলেরিয়ান নালির অন্যান্য অবশিষ্ট কাঠামো থাকতে পারে। গবেষণায় ৪৬,XY ক্রোমোজোমযুক্ত এবং বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক পুরুষের শরীরে এসব কাঠামোর উপস্থিতির কথা পাওয়া গেছে।
তাই শুধু শরীরের বাইরে দেখে এই অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়।
কেন এই সমস্যা হয়?
পিএমডিএস মূলত অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন বা তার রিসেপ্টরের সঙ্গে সম্পর্কিত জেনেটিক সমস্যার কারণে হয়।
ভ্রূণের বিকাশের সময় পুরুষ প্রজনন ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে এএমএইচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এএমএইচের উৎপাদন কমে গেলে অথবা এর রিসেপ্টর ঠিকমতো কাজ না করলে মুলেরিয়ান নালি বিলীন হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
এই রোগটি সাধারণত অটোসোমাল রিসেসিভ পদ্ধতিতে বংশগত হতে পারে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট জিনের দুই কপিতেই ক্ষতিকর পরিবর্তন থাকলে রোগটি প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পিএমডিএসের লক্ষণ কী?
এই রোগের একটি বিশেষ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। বরং অন্য কোনো সমস্যা পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের সময় এটি ধরা পড়ে।
তবে কিছু লক্ষণ চিকিৎসকদের পিএমডিএস সম্পর্কে সন্দেহ করতে সাহায্য করতে পারে।
অণ্ডকোষ নিচে না নামা
পিএমডিএসের সঙ্গে undescended testis বা অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে না নামার সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাভাবিক অবস্থায় ভ্রূণের বিকাশের শেষ দিকে অণ্ডকোষ ধীরে ধীরে শরীরের ভেতর থেকে অণ্ডথলিতে নেমে আসে। পিএমডিএসের ক্ষেত্রে মুলেরিয়ান কাঠামো এবং অণ্ডকোষের অস্বাভাবিক অবস্থানের কারণে এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।
একটি বা দুটি অণ্ডকোষই অণ্ডথলিতে না নামতে পারে।
কুঁচকিতে হার্নিয়া
কিছু ক্ষেত্রে পিএমডিএস আক্রান্ত ব্যক্তির কুঁচকিতে হার্নিয়া দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে শিশুর কুঁচকির হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা কখনো জরায়ু বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো মুলেরিয়ান কাঠামো দেখতে পান। এ কারণেই পিএমডিএস অনেক সময় অস্ত্রোপচারের সময় প্রথমবার শনাক্ত হয়।
বন্ধ্যাত্ব
কিছু প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অণ্ডকোষ অস্বাভাবিক অবস্থানে থাকলে বা দীর্ঘদিন অণ্ডথলিতে না নামলে শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গবেষণায় পিএমডিএস আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রাথমিক বন্ধ্যাত্বের ঘটনাও পাওয়া গেছে।
তবে পিএমডিএস থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তি অবশ্যই বন্ধ্যাত্বে ভুগবেন, এমন নয়।
কীভাবে রোগটি শনাক্ত করা হয়?
পিএমডিএস শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর শারীরিক ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যবহার করতে পারেন।
আল্ট্রাসনোগ্রাম: আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে জরায়ু বা অন্য মুলেরিয়ান কাঠামো রয়েছে কি না এবং অণ্ডকোষের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এমআরআই: কিছু ক্ষেত্রে এমআরআই ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের প্রজনন অঙ্গগুলোর অবস্থান আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। গবেষণায় আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এমআরআই দিয়ে মুলেরিয়ান কাঠামো শনাক্ত করার তথ্য পাওয়া গেছে।
হরমোন পরীক্ষা: অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন এবং অন্যান্য হরমোন পরীক্ষা রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
জেনেটিক পরীক্ষা: প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট জিনে পরিবর্তন রয়েছে কি না, তা জানার জন্য জেনেটিক পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ল্যাপারোস্কপি: কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে শরীরের ভেতরের কাঠামো সরাসরি দেখা হয়। বিশেষ করে অণ্ডকোষের অবস্থান নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পিএমডিএসের চিকিৎসা কী?
পিএমডিএসের চিকিৎসা সবার জন্য একরকম নয়। রোগীর বয়স, অণ্ডকোষের অবস্থান, প্রজনন ক্ষমতা, মুলেরিয়ান কাঠামোর অবস্থান এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।
অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার অন্যতম লক্ষ্য হলো অণ্ডকোষকে উপযুক্ত অবস্থানে আনা, ভবিষ্যৎ প্রজনন ক্ষমতা যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমানো।
অণ্ডকোষ যদি শরীরের ভেতরে থেকে যায়, চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটিকে অণ্ডথলিতে নামানোর অস্ত্রোপচার বা orchidopexy বিবেচনা করতে পারেন।
মুলেরিয়ান কাঠামো অপসারণ করা হবে কি না, সেটিও প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ এসব কাঠামো সরাতে গিয়ে অণ্ডকোষের রক্তনালি বা শুক্রবাহী নালির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দলের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারের ঝুঁকি আছে কি?
পিএমডিএসের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ শরীরের স্বাভাবিক অবস্থানের বাইরে থাকায় অণ্ডকোষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকে। কিছু গবেষণায় পিএমডিএসের সঙ্গে অণ্ডকোষের টিউমারের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
মুলেরিয়ান অবশিষ্ট কাঠামোতেও বিরল ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলোচনা রয়েছে। তবে এই ঝুঁকি কতটা, তা নিয়ে গবেষণায় ভিন্নতা রয়েছে। তাই রোগীকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে রাখা এবং ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এটি কি ছোঁয়াচে রোগ?
না। পিএমডিএস কোনো সংক্রমণজনিত রোগ নয়। এটি জন্মগত ও জেনেটিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিরল অবস্থা। তাই একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য কারও এই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়?
বর্তমানে পিএমডিএস প্রতিরোধ করার কোনো নির্দিষ্ট উপায় নেই। কারণ এটি ভ্রূণের বিকাশের সময় জেনেটিক ও হরমোন-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার সমস্যার কারণে তৈরি হয়।
তবে ছোটবেলায় অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে না নামলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ undescended testis শুধু পিএমডিএসের সঙ্গে নয়, আরও বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
শিশুর অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে না থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কুঁচকিতে বারবার ফোলা বা হার্নিয়ার সমস্যা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অণ্ডথলিতে অণ্ডকোষ না থাকা, কুঁচকির অস্বাভাবিক ফোলা বা দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্বের মতো সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের সমস্যার কারণ PMDS হবেই, এমন নয়। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষের শরীরে জরায়ু থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর একটি বিরল ব্যাখ্যা রয়েছে। পিএমডিএসের ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশের সময় মুলেরিয়ান নালি স্বাভাবিকভাবে বিলীন না হওয়ায় জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো কাঠামো শরীরের ভেতরে থেকে যেতে পারে।
এই অবস্থায় বাহ্যিকভাবে ব্যক্তিকে সাধারণ পুরুষের মতোই দেখা যেতে পারে। অনেক সময় অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে না নামা, কুঁচকির হার্নিয়া বা বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা করতে গিয়ে রোগটি শনাক্ত হয়।
PMDS অত্যন্ত বিরল এবং এর চিকিৎসা রোগীভেদে আলাদা। তাই এমন কোনো লক্ষণ থাকলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ইউরোলজি, পেডিয়াট্রিক সার্জারি বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
