ওজন কমাতে নাশতা বাদ দিচ্ছেন, জানুন এতে আসলে কী হয়

সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেকেরই প্রথম কাজ নাশতা করা। আবার ব্যস্ততার কারণে কেউ নাশতা না করেই কাজে বেরিয়ে যান। কেউ কেউ ওজন কমানোর জন্যও ইচ্ছা করে সকালের খাবার এড়িয়ে চলেন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, নাশতা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। নাশতা বাদ দিলে নাকি বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, পরে বেশি খিদে পায় এবং শেষ পর্যন্ত ওজন বেড়ে যায়।
কিন্তু বিষয়টি আসলে এতটা সরল নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু নাশতা বাদ দেওয়ার কারণে ওজন বাড়বেই, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। আবার নাশতা খেলেই বিপাকক্রিয়া দ্রুত হয়ে যাবে, এমন দাবিরও যথেষ্ট ভিত্তি নেই। বরং একজন মানুষ সারাদিন কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং তার সামগ্রিক জীবনযাপন কেমন, সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাশতা খাওয়া মানুষেরা কি বেশি সুস্থ?
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত নাশতা করেন, তারা অনেক সময় তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন। তাদের ওজন বেশি হওয়ার প্রবণতা কম এবং খাদ্যাভ্যাসেও আঁশ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি বেশি থাকতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এসব গবেষণা থেকে বলা যায় না যে নাশতা খাওয়ার কারণেই তারা বেশি সুস্থ।
কারণ নিয়মিত নাশতা করা ব্যক্তিরা হয়তো অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও অনুসরণ করেন। যেমন তারা বেশি ব্যায়াম করতে পারেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারেন বা ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলতে পারেন। ফলে তাদের ভালো স্বাস্থ্যের পেছনে শুধু নাশতা নয়, সামগ্রিক জীবনযাপনও ভূমিকা রাখতে পারে।
নাশতা খেলেই কি বিপাকক্রিয়া দ্রুত হয়?
এটি নাশতা নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি। সকালে খাবার খেলে নাকি শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় হয়ে যায় এবং সারাদিন বেশি ক্যালরি পোড়ে।
বাস্তবে গবেষণায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
খাবার হজম করার সময় শরীর কিছু শক্তি ব্যবহার করে। তবে সারাদিনে মোট কত খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিই বিপাক ও শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দিনের শুরুতে খাওয়া হচ্ছে, নাকি কয়েক ঘণ্টা পরে খাওয়া হচ্ছে, শুধু এই সময়ের পার্থক্যের কারণে ২৪ ঘণ্টায় মোট ক্যালরি খরচে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
অর্থাৎ নাশতা না করলেই শরীরের বিপাকক্রিয়া হঠাৎ ধীর হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
নাশতা বাদ দিলে কি ওজন বাড়ে?
এই প্রশ্নের উত্তরও সরাসরি ‘হ্যাঁ’ না। নাশতা না করলে দুপুরে ক্ষুধা কিছুটা বেশি লাগতে পারে এবং তখন অন্য সময়ের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়া হতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, দুপুরে বাড়তি খাবার খেলেও অনেক ক্ষেত্রে সকালের বাদ দেওয়া খাবারের পুরো ক্যালরি পূরণ হয় না। কিছু গবেষণায় নাশতা বাদ দেওয়ার ফলে দিনের মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যাওয়ার কথাও দেখা গেছে।
একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় থাকা ৩০৯ জন প্রাপ্তবয়স্ককে চার মাস ধরে নাশতা খাওয়ার বা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। চার মাস পর দুই দলের ওজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
তাই শুধু ওজন কমানোর জন্য নাশতা বাদ দেওয়া কোনো নিশ্চিত কৌশল নয়।
তাহলে নাশতা না খাওয়া কি সবার জন্য নিরাপদ?
এখানে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য রয়েছে।
কেউ সকালে খুব ক্ষুধার্ত থাকেন এবং নাশতা না করলে দুর্বল বোধ করেন। আবার কেউ সকালে খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না এবং দুপুর পর্যন্ত না খেলেও স্বাভাবিক থাকেন।
নাশতা বাদ দেওয়া কিছু মানুষের খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। যেমন সময় নির্দিষ্ট করে খাবার খাওয়ার পদ্ধতিতে অনেকেই রাতের খাবারের পর দীর্ঘ সময় না খেয়ে পরদিন দুপুরে প্রথম খাবার খান। এতে সকালের নাশতা বাদ পড়ে।
তবে এই পদ্ধতি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। কারও মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, রক্তে শর্করা কমে যাওয়া বা মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। এমন হলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা তার জন্য উপযোগী নাও হতে পারে।
নাশতা করলে কী খাবেন?
সকালে খেলে শুধু পেট ভরানোর দিকে নজর না দিয়ে পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
ডিম, দই, দুধ, ওটস, ডাল, আটার রুটি, বাদাম ও ফলের মতো খাবার থেকে প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ নাশতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে শুধু মিষ্টি বিস্কুট, চিনিযুক্ত পানীয় বা অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভর করলে নাশতা পুষ্টিকর নাও হতে পারে।
ডায়াবেটিস থাকলে কী করবেন?
ডায়াবেটিস থাকলে নিজের ইচ্ছায় নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়া ঠিক নয়। কারণ খাবারের সময়ের সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা এবং কিছু ওষুধের কার্যকারিতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে যারা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে থাকলে পরবর্তী খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়ার ধরনেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই ডায়াবেটিস থাকলে অন্যের খাদ্যাভ্যাস দেখে নিজের খাবারের সময় ঠিক করা উচিত নয়।
সকালে ক্ষুধা না লাগলে কী করবেন?
প্রতিদিন সকালে নাশতা করতেই হবে, এমন কঠোর নিয়ম নেই।
যদি সকালে ক্ষুধা না লাগে এবং পরে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন, তাহলে কিছুটা দেরিতে প্রথম খাবার খাওয়া অনেকের জন্য সমস্যা নাও হতে পারে। তবে সারাদিনের খাদ্যতালিকা যেন সুষম হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
অন্যদিকে সকালে ক্ষুধা লাগলে শুধু ওজন বাড়ার ভয় থেকে খাবার এড়িয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণমতো পুষ্টিকর নাশতা খাওয়া যেতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নাশতা বাদ দেওয়ার গবেষণার ফল শিশুদের ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের শরীর তখনও বেড়ে ওঠে এবং তাদের পুষ্টির চাহিদাও আলাদা।
তাই শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। নাশতা বাদ দিয়ে ওজন কমানোর মতো কোনো খাদ্যাভ্যাস শিশুদের জন্য অনুসরণ করা উচিত নয়।
নাশতা বাদ দেওয়ার চেয়ে কী বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
একটি খাবার খাওয়া হলো কি না, তার চেয়ে পুরো দিনের খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সারাদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরি গ্রহণ করা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থাৎ সকালে নাশতা করেছেন কি না, সেটিকে আলাদা করে দেখার বদলে পুরো দিনের খাবারের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
তাহলে নাশতা খাবেন, নাকি বাদ দেবেন?
এর উত্তর ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
সকালে ক্ষুধা লাগলে নাশতা করুন। তবে নাশতাটি যেন পুষ্টিকর হয়। আর সকালে ক্ষুধা না লাগলে এবং পরে সুষম খাবার খেতে পারলে নাশতা কিছুটা দেরিতে করাও অনেকের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তবে নাশতা বাদ দেওয়ার পর যদি প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে এবং দুপুর বা রাতে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়, তাহলে এই পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত নয়।
একইভাবে নাশতা বাদ দিয়ে যদি মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে খাবারের সময়সূচি বদলানো প্রয়োজন হতে পারে।
সকালের নাশতাকে দীর্ঘদিন ধরে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার হিসেবে বলা হলেও গবেষণা থেকে এখন এমন কোনো পরিষ্কার প্রমাণ নেই যে প্রত্যেক মানুষের জন্য নাশতা করতেই হবে। একইভাবে নাশতা বাদ দিলেই ওজন বাড়বে বা বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যাবে, এমন প্রমাণও নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নাশতা অপ্রয়োজনীয়। যারা সকালে ক্ষুধা অনুভব করেন, তাদের জন্য পুষ্টিকর নাশতা দিনের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনি কখন খাচ্ছেন তার পাশাপাশি কী খাচ্ছেন এবং সারাদিনে মোট কতটা খাচ্ছেন। নিজের শরীরের প্রয়োজন, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে খাবারের সময় ঠিক করাই সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: হেল্থলাইন



-b6cbc5.jpg)