logo

কিডনি রোগ মানেই কি কিডনি নষ্ট, জানুন কোন ধারণাগুলো ভুল

কিডনি রোগ মানেই কি কিডনি নষ্ট, জানুন কোন ধারণাগুলো ভুল
ছবি: টিভি ৯

কিডনি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত থেকে শুরু করে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল বের করে দেওয়া, শরীরে পানি ও বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণসহ নানা কাজে আমাদের কিডনি ভূমিকা রাখে। অথচ এই কিডনি নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে নানান ভুল ধারণা। কেউ কেউ মনে করেন, কিডনির সামান্য সমস্যা মানেই কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কারো কারো ধারণা, একবার ডায়ালিসিস শুরু হলে সারা জীবন তা করে যেতে হবে।

বাস্তবতা হলো কিডনি রোগের ধরন, কারণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কিছু কিডনি সমস্যা দ্রুত চিকিৎসা পেলে পুরোপুরি বা অনেকটাই ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে এবং এর জন্য নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য মতে, অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরির ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পেলে তা রিভার্স হয়েও যেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ সাধারণত ধীরে ধীরে তরি হয় এবং গুরুতর পর্যায়ে গেলে কিডনি প্রতিস্থাপন বা ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হতে পারে।

চলুন কিডনি রোগ নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা এবং সেগুলো নিয়ে বাস্তব সত্য জেনে নেওয়া যাক।

ভুল ধারণা ১: কিডনির সব রোগই ভয়ংকর

বাস্তব সত্য: কিডনির সব রোগ এক রকম হয় না। কিছু রোগের সাময়িক এবং সঠিক চিকিৎসায় ভালো হতে পারে। যেমন অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি হঠাৎ করে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, তবে এ সমস্যা ঘটার কারণ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা পেলে অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি আবার স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছি ফিরতে পারে। রোগ

অন্যদিকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকে। তাই শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

ভুল ধারণা ২: কিডনি ফেলিওর হলে একটি কিডনি নষ্ট হয়

বাস্তব সত্য: কিডনি ফেলিওর বলতে সাধারণত এমন অবস্থাকে বোঝায় যখন কিডনির সামগ্রিক কার্যক্ষমতা শরীরের প্রয়োজন মেটানোর মতো অবস্থায় থাকে না। মানুষের দুটি কিডনি থাকলেও একটি সুস্থ কিডনি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব শারীরিক কাজ করতে পারে।

তাই একটি কিডনিতে পাথর, টিউমার, সংক্রমণ বা প্রস্রাবের পথে বাধা থাকলেও আরেকটি কিডনি যদি ভালোভাবে কাজ করে, তবে রক্তে বর্জ্য জমে কিডনি ফেলিওরের মতো পরিস্থিতি তৈরি নাও হতে পারে।

তবে মনে রাখবেন, একটি কিডনি আক্রান্ত হলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ আরেকটি কিডনির কার্যক্ষমতা যদি কমে যায়, তবে সমস্যা গুরুতর হয়ে যেতে পারে।


ভুল ধারণা ৩: শরীর ফুলে গেলেই কিডনি ফেলিওর হয়েছে

বাস্তব সত্য: শরীরের ফোলাভাব বা এডিমা সাধারণত কিডনি রোগের একটি লক্ষণ মাত্র। কিন্তু শুধু ফোলাভাব দেখেই কিডনি ফেলিওর হয়েছে তা বলার সুযোগ নেই।

শরীর থেকে অতিরিক্ত লবণ ও পানি যদি কিডনি ঠিকভাবে বের করতে না পারে, তাহলে পা, গোড়ালি বা শরীরের অন্য অংশে পানি জমতে পারে। আবার প্রস্রাবের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হয়ে গেলেও শরীরে ফোলাভাব দেখা দেয়।

তাই শরীর ফুলে গেলে কিডনি পরীক্ষা করার পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাব্য কারণও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার।

ভুল ধারণা ৪: কিডনি ফেলিওর হলেই সবারস ক্ষেত্রে শরীর ফুলে যাবে

বাস্তব সত্য: কিডনি ফেলিওরের রোগীর শরীরে ফোলাভাব হতে পারে, তবে সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টা এমন হবে তা না। কিডনি রোগের মাত্রা, শরীরে পানি জমার পরিমাণ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর এ লক্ষণ নির্ভর করে।

কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গই দেখা দেয় না। তাই খেয়াল রাখতে হবে, শুধু শরীর ফুলছে কি না দেখেই কিডনির অবস্থা বোঝা যায় না।

ভুল ধারণা ৫: উপসর্গ কমলেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া যায়

বাস্তব সত্য: চিকিৎসার পর উপসর্গ কমে গেলেই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে, অনেকেই এমনটা ধরে নেন যা একদমই ঠিক না। বিশেষ করে ক্রনিক কিডনি রোগের ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসার লক্ষ্য অনেক সময় রোগের অগ্রগতিকে ধীর করা এবং জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

নিজ ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করলে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বা অন্য কোনো ঝুঁকির নিয়ন্ত্রণও যে নষ্ট হতে পারে, তা বোঝা জরুরি। তাই ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

ভুল ধারণা ৬: ক্রিয়েটিনিন সামান্য বেশি তবে শরীরে আর কোনো সমস্যা নেই, তাই চিকিৎসার দরকার নেই

বাস্তব সত্য: কিডনি রোগের শুরুতে অনেকের ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই শরীর ভালো লাগছে বলেই কিডনি ভালো আছে, এমনটা ভেবে নেওয়া ঠিক না।

রক্তের ক্রিয়েটিনিন কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ক্রিয়েটিনিনের সংখ্যা দেখে কিডনির অবস্থা নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। চিকিৎসকেরা সাধারণত ক্রিয়েটিনিন থেকে হিসাব করা eGFR, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিন, বয়স, অন্যান্য রোগ এবং আগের পরীক্ষার ফলও দেখে থাকেন।

বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা কিডনি রোগের ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করা জরুরি।

ভুল ধারণা ৭: ক্রিয়েটিনিন ৫ বা ৮ হলে নির্দিষ্ট পরিমাণে কিডনি নষ্ট হয়েছে

বাস্তব সত্য: ক্রিয়েটিনিনের একটি নির্দিষ্ট মাত্রাকে ধরে কিডনি কত শতাংশ নষ্ট হয়েছে সরাসরি তা বলা যায় না। একই ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা এক এক জন মানুষের বয়স, লিঙ্গ, শরীরের গঠন ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

মনে রাখবেন, কিডনির কার্যক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে eGFR একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ক্রনিক কিডনি রোগ শনাক্ত করার জন্য eGFR এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মতো পরীক্ষাও করা হয়।

তাই ক্রিয়েটিনিন বাড়লে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।

ভুল ধারণা ৮: একবার ডায়ালিসিস করালে সারাজীবন তা করতে হয়

বাস্তব সত্য: সবসময় বা সবার ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন নয়। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরির ক্ষেত্রে কিডনির কার্যক্ষমতা যদি সাময়িকভাবে কমে যায় তাহলে কোনো কোনো রোগীর জন্য কিছু সময় ডায়ালিসিস প্রয়োজন হতে পারে। মূল রোগের চিকিৎসার পর কিডনি আবার কাজ শুরু করলে ডায়ালিসিসও বন্ধ করা যেতে পারে।

তবে ক্রনিক কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে কিডনি যখন শরীরের প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে না, সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন হতে পারে।

তাই ডায়ালিসিস লাগবে কি না বা লাগলেও কতদিন লাগবে, তা রোগের ধরন ও কিডনির কার্যক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে।

ভুল ধারণা ৯: কিডনি প্রতিস্থাপনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কিডনি দিতে পারবেন না

বাস্তব সত্য: উপযুক্ত চিকিৎসা মূল্যায়ন এবং আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জীবিত ব্যক্তি কিডনি দান করতে পারেন। দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক, চিকিৎসাগত উপযোগিতা এবং অন্যান্য বিষয় এক্ষেত্রে যাচাই করা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে জীবিত দাতার কাছ থেকে অঙ্গ গ্রহণের বিধান রাখা আছে। আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী নিকট আত্মীয়ের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে নিঃস্বার্থবাদী দাতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হতে পারে।

ভুল ধারণা ১০: কিডনি দান করলে স্বাভাবিক জীবন বা যৌনজীবন নষ্ট হয়ে যায়

বাস্তব সত্য: সুস্থ ও যথাযথভাবে নির্বাচিত জীবিত দাতার একটি কিডনি অপসারণের পরও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। তবে কিডনি দানের আগে দাতার শারীরিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন।

অস্ত্রোপচারের মতো যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতিরই কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই কিডনি দানের সিদ্ধান্ত কখনোই ব্যক্তিগতভাবে বা শুধু অন্যের কথায় নেওয়া উচিত নয়। অনুমোদিত ট্রান্সপ্লান্ট কেন্দ্রের চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ভুল ধারণা ১১: কিডনি কেনাবেচা করে প্রতিস্থাপন করা যায়

বাস্তব সত্য: কিডনি বা অন্য কোনো মানব অঙ্গের বাণিজ্যিক কেনাবেচা আইনসম্মত নয়। বাংলাদেশের বর্তমান মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী মানব অঙ্গ কেনাবেচা বা এর বিনিময়ে সুবিধা নেওয়া এবং এ উদ্দেশ্যে প্রচারণা নিষিদ্ধ।

তাই কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সবসময় অনুমোদিত হাসপাতাল ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগোতে হবে।

ভুল ধারণা ১২: কিডনি পুরুষদের শরীরেই থাকে

বাস্তব সত্য: নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই সাধারণত দুটি কিডনি থাকে। এগুলো পেটের ভেতরের পেছনের দিকে, মেরুদণ্ডের দুই পাশে অবস্থান করে।

পুরুষের যৌনাঙ্গের থলিতে থাকা দুটি অঙ্গ কিডনি নয়। সেগুলো হলো শুক্রাশয় বা টেস্টিস, যা প্রজনন ব্যবস্থার অংশ।

ভুল ধারণা ১৩: রক্তচাপ এখন স্বাভাবিক, তাই ওষুধ বন্ধ করা যায়

বাস্তব সত্য: রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকা অনেক সময় নিয়মিত ওষুধ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের ফল। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করলে রক্তচাপ আবার বেড়ে যেতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উচ্চ রক্তচাপকে কিডনি রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

ভুল ধারণা ১৪: বেশি পানি খেলেই কিডনি রোগ ভালো হয়ে যায়

বাস্তব সত্য: বেশি পানি পান করা সব কিডনি রোগের চিকিৎসা নয়। বরং কিছু কিডনি রোগে অতিরিক্ত পানি শরীরে জমে সমস্যা বাড়াতে পারে।

কিডনি কতটা কাজ করছে, দিনে কতটা প্রস্রাব হচ্ছে, শরীরে পানি জমছে কি না, হৃদ্‌যন্ত্রের অবস্থা এবং রোগের ধরন অনুযায়ী দৈনিক কতটা তরল পান করা উচিত তা নির্ধারণ করা হয়। ডায়ালিসিস নেওয়া অনেক রোগীর ক্ষেত্রেও তরল গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে।

তাই কিডনি রোগ থাকলে নিজের মতো করে অতিরিক্ত পানি পান না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি পান করা ভালো।

ভুল ধারণা ১৫: কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ওষুধ এক-দুদিন বাদ দেওয়া যায়

বাস্তব সত্য: কিডনি প্রতিস্থাপনের পর দেওয়া ওষুধ নিয়ম মেনে খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন কিডনিকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাতে আক্রমণ না করে, সে জন্য ইমিউনোসাপ্রেসিভ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।

এসব ওষুধ নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করলে প্রতিস্থাপিত কিডনি প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কোনো ডোজ ভুলে গেলে বা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করে দ্রুত ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: খাবার ঠিক রাখলেই ক্রিয়েটিনিন বাড়া বন্ধ হয়ে যাবে?

খাদ্যাভ্যাস কিডনি রোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগের ধরন অনুযায়ী খাবারে লবণ, পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ও তরলের পরিমাণে পরিবর্তন আনা হতে পারে। তবে শুধু খাদ্যতালিকা ঠিক রাখলেই সব ক্ষেত্রে ক্রনিক কিডনি রোগের অগ্রগতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খাওয়া, ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা কিডনি সুস্থ রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিডনি প্রতিস্থাপন করলেই কি সমস্যা চিরতরে শেষ?

কিডনি প্রতিস্থাপন কিডনি ফেলিওরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হলেও এটি এমন কোনো চিকিৎসা নয় যার পর আর কোনো চিকিৎসা বা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন থাকে না। প্রতিস্থাপনের পরও নিয়মিত চিকিৎসা, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়।

প্রতিস্থাপিত কিডনি প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপন ডায়ালিসিসের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপনের সুযোগ দিতে পারে।

ডায়ালিসিস মানেই বেশি দিন বাঁচবেন না, বিষয়টা এমনও না

ডায়ালিসিস প্রয়োজন এমন রোগীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা যায় না। রোগীর বয়স, কিডনি রোগের কারণ, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, সংক্রমণসহ অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।

ডায়ালিসিস কিডনি পুরোপুরি সারিয়ে তোলে না। এটি কিডনির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিকল্প হিসেবে রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল অপসারণে সাহায্য করে। কিডনি ফেলিওরের চিকিৎসার দুটি প্রধান পদ্ধতি হলো ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন।

কিডনি সুস্থ রাখতে কী মনে রাখা জরুরি

কিডনি রোগ অনেক সময় নীরবে এগোয়। তাই শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা উচিত।

নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা, অতিরিক্ত পানি পান করা, ডায়ালিসিস নিয়ে ভয় পাওয়া কিংবা একটি পরীক্ষার ফল দেখে কিডনির অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কিডনি রোগ নিয়ে ভয় এবং ভুল ধারণা দুটোই রোগীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিডনির সমস্যা ধরা পড়লেই কিডনি ফেলিওর হয়েছে, এমন নয়। আবার কোনো উপসর্গ নেই বলেই কিডনি পুরোপুরি সুস্থ, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

সময়মতো পরীক্ষা, রোগের সঠিক কারণ শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপই কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কিডনি নিয়ে কোনো সন্দেহ বা পরীক্ষার ফল অস্বাভাবিক হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নেফ্রোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

তথ্যসূত্র

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Kidney disease

NIDDK, Chronic Kidney Disease

NIDDK, Kidney Failure

National Kidney Foundation, Dialysis and Kidney Failure

National Kidney Foundation, Living Donor Kidney Transplant

NHS Blood and Transplant, Kidney Transplant Medicines

বাংলাদেশের আইন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন