স্বাস্থ্যনীতি শক্তিশালী করতে ‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’-এর যাত্রা শুরু

এশিয়া পোস্ট নিউজ
স্বাস্থ্যনীতি শক্তিশালী করতে ‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’-এর যাত্রা শুরু
ছবি: সংগৃহীত

দেশের স্বাস্থ্যখাতে নাগরিক অংশগ্রহণ, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে ‘ডায়ালগ অন হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ ২০২৬’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

Advertisement

শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বাংলা মোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এ সংলাপে দেশের স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষাবিদ, তরুণ নেতৃত্ব এবং ২০টিরও বেশি স্বাস্থ্যবিষয়ক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. রাজিকুল হাসান এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের গভর্নিং বডির সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান রাজিব।

গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ডা. হালিদা হানুম আখতার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন নাহিন শিমুল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ প্রোগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. আসিফ ইকবাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. মোহাম্মদ জাকারিয়া রানা, সেরাক-বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক এস. এম. শাইকাত, ইটস হিউনিটি ফাউন্ডেশন -এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. আদনান হোসাইন, ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অফ বাংলাদেশ -এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. মোহাম্মদ মাসুমুল হক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশ -এর ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট (কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য) ডা. এ.এন.এম. এহতেশাম কবির।

অনুষ্ঠানে ‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি নাগরিকভিত্তিক স্বাস্থ্য সংলাপ প্ল্যাটফর্মের ধারণা, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির সদস্য মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্র, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং গবেষণালব্ধ তথ্যকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ৩০০ জন ‘হেলথ পার্লামেন্ট মেম্বার’ নিয়ে একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে। তারা নিজ নিজ এলাকার স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব সমস্যা, নাগরিকদের মতামত, স্থানীয় চাহিদা ও সেবার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ প্রণয়ন করবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও সরকারি সংস্থার কাছে উপস্থাপন করবেন। এর মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ আরও কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

আলোচকরা বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং তরুণদের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তারা মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায় থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলো গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা গেলে স্বাস্থ্যখাতে আরও কার্যকর ও টেকসই সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ সরকারের বিকল্প নয়; বরং সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে একটি সহায়ক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের পক্ষে প্রতিটি এলাকার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষুদ্র সমস্যা জানা সম্ভব হয় না। তাই স্থানীয় পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে তা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের জাতীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্মকে টেকসই করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ডা. হালিদা হানুম আখতার বলেন, বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও গবেষণার ঘাটতি নেই। দেশের গবেষকরা আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে নিয়মিত গবেষণা প্রকাশ করছেন। তবে গবেষণা, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ সেই ব্যবধান দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, এ উদ্যোগ সরকারের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ -ইউ এইচ সি) অর্জনের লক্ষ্য এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এস ডি জি -৩) বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত নীতি সংলাপ, স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্লেষণ, গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নাগরিকভিত্তিক স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য সমতা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আলোচকরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান। তাদের মতে, অংশীজনদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা, নিয়মিত গবেষণা এবং তথ্যভিত্তিক সুপারিশের মাধ্যমে হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ দেশের স্বাস্থ্যনীতি উন্নয়নে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

গোলটেবিল আলোচনা শেষে হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয় এবং এর লোগো উন্মোচন করা হয়। উপস্থিত অতিথিরা উদ্যোগটিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গবেষণাভিত্তিক ও নাগরিক-অংশগ্রহণমূলক জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানটি হেল্প দা ফিউচার-এর সহ-আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল স্টার্টআপ মাই ফার্মা লিমিটেড ছিল পাওয়ার্ড বাই পার্টনার। সহযোগী হিসেবে ছিল এডুড্রাইভ, আয়ুশকান্দি আই হসপিটাল এবং বিশ্বনাথ আই হসপিটাল। কমিউনিটি পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল জেসিআই ঢাকা ডিপ্লোমেটস, ডিজিটাল মিডিয়া ফোরাম (ডিএমএফ) এবং ইয়ুথ কানেক্ট।

অনুষ্ঠানে ডিজিটাল মিডিয়া ফোরাম (ডিএমএফ)-এর সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।