খাবারের ভুল ছাড়াও বারবার ডায়রিয়া হওয়ার পেছনে থাকতে পারে এই কারণ

বারবার পেট খারাপ, ডায়রিয়া, বদহজম বা দুর্বলতার মতো সমস্যা হলে অনেকেই প্রথমে খাবার বা দূষিত পানিকে দায়ী করেন। কখনও সংক্রমণ বা খাদ্যাভ্যাসের কারণেই এমন হতে পারে। তবে সমস্যা যদি বারবার ফিরে আসে, তখন শরীরে প্রয়োজনীয় কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ হলো জিঙ্ক। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, ক্ষত সারানো, কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন এবং স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে জিঙ্ক প্রয়োজন। এর ঘাটতি হলে বিশেষ করে শিশুদের ডায়রিয়া ও বৃদ্ধির সমস্যার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা জানাচ্ছে, জিঙ্কের ঘাটতির সঙ্গে বদহজম, ডায়রিয়া ও বারবার পেটের গোলমালের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের ডায়রিয়ার একমাত্র কারণ জিঙ্কের ঘাটতি নয়। সংক্রমণ, খাদ্য অসহিষ্ণুতা, অন্ত্রের বিভিন্ন রোগ ও কিছু ওষুধও দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।
জিঙ্ক শরীরের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
জিঙ্ক এমন একটি প্রয়োজনীয় খনিজ, যা শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। খাবারের মাধ্যমে এটি পেতে হয়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখা, ডিএনএ ও প্রোটিন তৈরি, কোষের বৃদ্ধি ও ক্ষত সারানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে জিঙ্ক অংশ নেয়।
শরীরে জিঙ্কের পরিমাণ কমে গেলে এর প্রভাব শুধু একটি অঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে না। ত্বক, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, পরিপাকতন্ত্র, স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি এবং শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জিঙ্কের ঘাটতি হলে পেটের সমস্যা কেন হতে পারে?
জিঙ্ক অন্ত্রের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, জিঙ্কের ঘাটতির সঙ্গে অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে ডায়রিয়া হতে পারে।
এখানে আবার একটি উল্টো সম্পর্কও রয়েছে। দীর্ঘদিন ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে জিঙ্কের ক্ষতি বাড়তে পারে। ফলে জিঙ্কের ঘাটতি আরও বাড়ে। অর্থাৎ জিঙ্কের ঘাটতি ও ডায়রিয়া কখনও একে অন্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই কারণেই দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যা থাকলে শুধু ডায়রিয়া বন্ধ করার দিকে নজর না দিয়ে এর পেছনে পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো রোগ আছে কি না, সেটিও খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ডায়রিয়া নয়, আরও যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
জিঙ্কের ঘাটতির লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে একই হয় না। বয়স ও ঘাটতির মাত্রার ওপরও উপসর্গ নির্ভর করতে পারে।
সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ হলো-
- বারবার ডায়রিয়া বা পেটের গোলমাল
- ক্ষুধা কমে যাওয়া
- ঘন ঘন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া
- ক্ষত সারতে দেরি হওয়া
- চুল পড়া
- ত্বকে র্যাশ বা অন্যান্য সমস্যা
- স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
- নখে সাদা দাগ বা নখ দুর্বল হয়ে যাওয়া
জিঙ্কের ঘাটতিতে এসব লক্ষণের কয়েকটি দেখা দিতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব লক্ষণ শুধু জিঙ্কের ঘাটতির কারণে হয় না। তাই উপসর্গ দেখেই নিজে থেকে জিঙ্কের ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ঘন ঘন সংক্রমণও কি জিঙ্কের ঘাটতির ইঙ্গিত?
জিঙ্ক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘদিন জিঙ্কের ঘাটতি থাকলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জিঙ্কের ঘাটতির সঙ্গে সংক্রমণ ও ডায়রিয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে ঘন ঘন ঠান্ডা লাগা বা সংক্রমণ হলেই জিঙ্কের ঘাটতি হয়েছে, এমন বলা যায় না। ঘুমের ঘাটতি, পুষ্টির সামগ্রিক অবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রোগসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
কারা জিঙ্কের ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি?
কিছু মানুষের শরীরে জিঙ্কের ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পরিপাকতন্ত্রের কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, অন্ত্রের অস্ত্রোপচার হয়েছে এমন মানুষ, নিরামিষ বা নিরামিষভোজী খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারী ব্যক্তি, গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারী এবং অ্যালকোহল ব্যবহারের সমস্যা রয়েছে এমন মানুষ।
বিশেষ করে ক্রোন্স রোগ, আলসারেটিভ কোলাইটিস বা সিলিয়াক রোগের মতো অন্ত্রের সমস্যায় জিঙ্ক শোষণ কমে যেতে পারে বা শরীর থেকে এর ক্ষতি বাড়তে পারে।
খাবার থেকেই কি জিঙ্ক পাওয়া যায়?
হ্যাঁ। অনেক সাধারণ খাবারেই জিঙ্ক রয়েছে। মাংস, মাছ, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার জিঙ্কের ভালো উৎস। পাশাপাশি ডাল, ছোলা, বাদাম, বীজ ও বিভিন্ন শস্য থেকেও জিঙ্ক পাওয়া যায়।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে রাজমা, মুগ, ছোলা, কাবুলিচানা, মাছ, মুরগি, বাদাম ও বীজের মতো খাবার খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উদ্ভিজ্জ খাবার থেকেও জিঙ্ক পাওয়া যায়, তবে কিছু উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা ফাইটেট জিঙ্কের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী।
ডায়রিয়া হলেই কি জিঙ্কের ওষুধ খেতে হবে?
না। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বারবার ডায়রিয়া হলেই নিজের সিদ্ধান্তে জিঙ্কের ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।
শিশুদের তীব্র ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জিঙ্কের ঘাটতি বেশি দেখা যায় এমন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জিঙ্ক ব্যবহারের সুপারিশ রয়েছে। তবে বয়স অনুযায়ী মাত্রা ও ব্যবহারের সময় আলাদা এবং এটি চিকিৎসা নির্দেশনার অংশ।
অন্যদিকে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত জিঙ্ক নিলে শরীরে তামার ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজন না থাকলে জিঙ্কের পরিপূরক গ্রহণ করা উচিত নয়।
দীর্ঘদিন ডায়রিয়া হলে শুধু জিঙ্কের কথা ভাববেন না
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। সংক্রমণ, খাবারে অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতা, সিলিয়াক রোগ, ক্রোন্স রোগ, আলসারেটিভ কোলাইটিস, অগ্ন্যাশয়ের সমস্যা, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিন কিছু ওষুধ ব্যবহারের কারণেও এমন হতে পারে।
তাই বারবার ডায়রিয়া হলে শুধু জিঙ্কের ওষুধ খেয়ে সমস্যাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
ডায়রিয়া কয়েক দিন ধরে চলতে থাকলে, বারবার ফিরে এলে বা এর সঙ্গে ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর বা পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বারবার ডায়রিয়া হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া যেমন জিঙ্কের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তেমনই জিঙ্কের ঘাটতিও ডায়রিয়ার সমস্যা দীর্ঘায়িত করতে পারে।
পেটের সমস্যার পেছনে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি
বারবার পেট খারাপ হলেই খাবার খারাপ ছিল বা পানি দূষিত ছিল, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জিঙ্কের মতো প্রয়োজনীয় খনিজের ঘাটতিও শরীরের বিভিন্ন কাজে প্রভাব ফেলতে পারে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে জিঙ্কের ঘাটতিকে সব ধরনের দীর্ঘস্থায়ী পেটের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। সুষম খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: আনন্দবাজার


