logo
Advertisement

শরীরের কোন অঙ্গ সহজে নিজেকে সারাতে পারে না, জানুন বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
শরীরের কোন অঙ্গ সহজে নিজেকে সারাতে পারে না, জানুন বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
ছবি: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

মানুষের শরীরের অসাধারণ ক্ষমতার একটি হলো নিজেকে সারিয়ে তোলার ক্ষমতা। কেটে গেলে ত্বক ধীরে ধীরে জোড়া লাগে, হাড় ভাঙার পর নতুন হাড় তৈরি হয়, আবার লিভারের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অবশিষ্ট অংশ থেকে অঙ্গটি অনেকটা আগের আকারে ফিরে আসতে পারে।

কিন্তু শরীরের সব অঙ্গের ক্ষেত্রে গল্পটা এক নয়। কিছু টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীর তা সামলানোর চেষ্টা করলেও আগের মতো নতুন কোষ ও টিস্যু তৈরি করা কঠিন। বিশেষ করে হার্ট, মস্তিষ্ক, স্পাইনাল কর্ড ও জয়েন্টের কার্টিলেজের পুনর্গঠনের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর পেছনে কোষের বিভাজন ক্ষমতা, রক্ত সরবরাহ, টিস্যুর গঠন এবং ক্ষতির ধরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চিকিৎসকদের মতামত তুলে ধরে এই বিষয়টি নিয়ে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো।

ক্ষত সারা আর টিস্যু পুনর্গঠন এক নয়

শরীরের কোনো জায়গায় আঘাত লাগার পর ক্ষত বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ব্যথা কমে যাওয়া দেখে মনে হতে পারে জায়গাটি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কিন্তু সবসময় তা হয় না।

অনেক ক্ষেত্রে শরীর ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে সামলাতে নতুন টিস্যু তৈরি করে বা সেখানে দাগের টিস্যু তৈরি হয়। ফলে অঙ্গের কাজ কিছুটা ফিরে এলেও আগের মতো একই কোষ, গঠন ও কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে নাও আসতে পারে।

অন্যদিকে regeneration বা পুনর্জন্ম বলতে বোঝায় ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর কোষ ও গঠনকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে তা আগের মতো কাজ করতে পারে। মানুষের বিভিন্ন টিস্যুর এই ক্ষমতা এক রকম নয়।

হার্টের পেশি কেন সহজে নতুন হয় না?

হার্টের পেশি শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিস্যুগুলোর একটি। প্রতিমুহূর্তে এটি সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে সারা শরীরে রক্ত পাম্প করে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হার্টের পেশির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলোকে আগের মতো নতুন কার্যকর কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার ক্ষমতা সীমিত।

হার্ট অ্যাটাকের সময় কোনো ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের একটি অংশ অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়। দীর্ঘ সময় অক্সিজেন না পেলে ওই এলাকার হৃদ্‌পেশির কোষ মারা যেতে পারে।

সমস্যা হলো, মৃত হৃদ্‌পেশির জায়গায় শরীর সবসময় নতুন সুস্থ হৃদ্‌পেশি তৈরি করতে পারে না। সেখানে অনেক সময় fibrous scar tissue বা দাগের টিস্যু তৈরি হয়। ফলে হার্টের সেই অংশের স্বাভাবিক সংকোচন ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে হার্ট অ্যাটাকের পর কোনো উন্নতি সম্ভব নয়। দ্রুত চিকিৎসা, ওষুধ, জীবনযাপনে পরিবর্তন ও cardiac rehabilitation-এর মাধ্যমে অবশিষ্ট হৃদ্‌পেশির কার্যক্ষমতা রক্ষা ও উন্নত করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু হার্টের হারিয়ে যাওয়া বড় অংশের পেশি হুবহু পুনর্গঠন করা এখনো বড় চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।

মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি কেন গুরুতর?

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরন অত্যন্ত বিশেষায়িত কোষ। তারা একে অন্যের সঙ্গে জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এই নেটওয়ার্কের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

মস্তিষ্কের বড় ধরনের আঘাত বা স্ট্রোকের পর কিছু নিউরন মারা যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অনেক নিউরনের পুনর্জন্মের ক্ষমতা খুব সীমিত। তাই ক্ষতির পর পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসা সবসময় সম্ভব হয় না।

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মস্তিষ্ক শুধু নতুন নিউরন তৈরি করেই সুস্থ হয় না। neuroplasticity বা স্নায়ুতন্ত্রের অভিযোজন ক্ষমতার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কিছু অংশ নতুন সংযোগ তৈরি করে বা পুরোনো সংযোগের ব্যবহার পরিবর্তন করে হারানো কিছু কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে।

এই কারণেই স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের আঘাতের পর rehabilitation বা পুনর্বাসন এত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ হুবহু তৈরি না হলেও নতুন স্নায়বিক পথ তৈরি বা পুরোনো পথের কার্যকারিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কিছু কাজ আবার শেখা সম্ভব হতে পারে।

স্পাইনাল কর্ডের আঘাত কেন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে এবং শরীর থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো spinal cord বা সুষুম্নাকাণ্ড। এতে গুরুতর আঘাত লাগলে স্নায়ুর সংকেত চলাচল ব্যাহত হতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্পাইনাল কর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুতন্তু কার্যকরভাবে পুনরায় বেড়ে ওঠার ক্ষমতা সীমিত। তাই গুরুতর spinal cord injury-এর পর পক্ষাঘাতসহ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এখন বিজ্ঞানীরা spinal cord repair নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে গবেষণা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুকোষকে আরও ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, axon regeneration উৎসাহিত করা, cell-based therapy, bioengineered scaffold এবং neuroplasticity কাজে লাগানো। তবে এগুলোর অনেক ক্ষেত্র এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।

কার্টিলেজের ক্ষত সারতে এত সময় লাগে কেন?

হাঁটু, কোমরসহ বিভিন্ন জয়েন্টে থাকা cartilage বা তরুণাস্থি হাড়ের প্রান্তকে মসৃণভাবে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে এবং চাপ শোষণ করে।

কিন্তু আর্টিকুলার কার্টিলেজের (articular cartilage) একটি বড় সমস্যা হলো এতে স্বাভাবিক রক্তনালির নেটওয়ার্ক নেই। ফলে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন, পুষ্টি ও ক্ষত সারানোর সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদান সরাসরি সেখানে পৌঁছানো কঠিন। পুষ্টি মূলত diffusion-এর মাধ্যমে কার্টিলেজে পৌঁছায়।

এই কারণেই কার্টিলেজের নিজস্ব healing capacity সীমিত। ক্ষতির গভীরতা, অবস্থান এবং ব্যক্তির বয়সের ওপরও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নির্ভর করে। কিছু ক্ষত তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামলানো গেলেও বড় বা গভীর ক্ষত নিজে থেকে আগের মতো কার্টিলেজ তৈরি করতে পারে না।

কার্টিলেজের ক্ষতি দীর্ঘদিন থাকলে জয়েন্টের কার্যক্ষমতায় সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং osteoarthritis-এর মতো সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

তাহলে লিভার কীভাবে এতটা পুনর্গঠন করতে পারে?

শরীরের অন্যান্য অনেক অঙ্গের তুলনায় লিভার একেবারেই আলাদা। ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্ত্রোপচারে লিভারের একটি বড় অংশ বাদ দেওয়ার পরও অবশিষ্ট লিভারের কোষ বিভাজিত হয়ে হারানো ভর অনেকটা পূরণ করতে পারে।

NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, লিভারের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা অপসারণ করা হলে অবশিষ্ট অংশ বড় হয়ে আগের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লিভারের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ অপসারণের পরও অবশিষ্ট অংশ স্বাভাবিক আকারের দিকে ফিরে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক গবেষণাতেও লিভারের এই অসাধারণ regenerative capacity-এর কথা উঠে এসেছে। লিভারের differentiated cells বা hepatocyte নিজেরাই বিভাজিত হয়ে টিস্যু পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই কারণেই living donor liver transplantation সম্ভব। একজন সুস্থ মানুষ তার লিভারের একটি অংশ দান করলে দাতার অবশিষ্ট লিভার এবং গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপিত অংশ উভয়ই সময়ের সঙ্গে বড় হয়ে প্রয়োজনীয় আকারের দিকে যেতে পারে।

তবে লিভারও অজেয় নয়। দীর্ঘদিনের গুরুতর রোগ বা ব্যাপক ক্ষতি হলে তার পুনর্গঠনের ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

হাড়ের মজ্জাও কিছুটা আলাদা

শরীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু হলো bone marrow বা অস্থিমজ্জা। এর ভেতরে থাকা রক্ত তৈরির stem ও progenitor cells নিয়মিত নতুন রক্তকণিকা তৈরি করে।

কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসায় অস্থিমজ্জার রক্ত তৈরির ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে bone marrow বা stem cell transplantation-এর মাধ্যমে রক্তকণিকা তৈরির ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এটি কোনো ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গকে হুবহু নতুন করে গড়ে তোলার মতো regeneration নয়। বরং অস্থিমজ্জার নিজস্ব রক্ত তৈরির ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়।


কেন কিছু টিস্যু সহজে সারে, কিছু টিস্যু নয়?

এর পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

কোষের বিভাজন ক্ষমতা: কিছু টিস্যুর কোষ প্রয়োজন হলে দ্রুত বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করতে পারে। আবার কিছু বিশেষায়িত কোষের এই ক্ষমতা খুব সীমিত।

রক্ত সরবরাহ: ক্ষত সারাতে অক্সিজেন, পুষ্টি ও বিভিন্ন সংকেত প্রয়োজন। যেসব টিস্যুতে রক্ত সরবরাহ কম বা নেই, সেখানে healing কঠিন হতে পারে।

টিস্যুর জটিল গঠন: মস্তিষ্ক বা স্পাইনাল কর্ডের মতো অঙ্গ শুধু কিছু নতুন কোষ তৈরি করলেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। সঠিক জায়গায় সঠিক কোষের সংযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।

ক্ষতির মাত্রা: একই অঙ্গে ছোট ও বড় ক্ষতির ফল এক নয়। ক্ষতির গভীরতা এবং কোথায় ক্ষতি হয়েছে, তার ওপরও পুনরুদ্ধার নির্ভর করে।

ভবিষ্যতে কি এসব টিস্যু পুরোপুরি পুনর্গঠন সম্ভব?

এ নিয়ে regenerative medicine বা পুনর্জন্মভিত্তিক চিকিৎসায় ব্যাপক গবেষণা চলছে। stem cell therapy, cell transplantation, tissue engineering, bioengineered scaffolds এবং growth-promoting approaches নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন।

বিশেষ করে স্পাইনাল কর্ডের ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্তুর পুনরায় বৃদ্ধি এবং নতুন সংযোগ তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। হার্টের ক্ষেত্রেও ক্ষতিগ্রস্ত হৃদ্‌পেশি পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে গবেষণাগারে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া এবং সেগুলো নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে নিয়মিত ব্যবহারের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

শরীরের এই সীমাবদ্ধতা আমাদের কী শেখায়?

মানবদেহ নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষমতারও সীমা আছে। কোথাও শরীর হারানো টিস্যু পুনর্গঠন করতে পারে, কোথাও দাগের টিস্যু তৈরি করে ক্ষত সামলায়, আবার কোথাও অবশিষ্ট কোষ ও স্নায়বিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

তাই হার্ট, মস্তিষ্ক, স্পাইনাল কর্ড বা কার্টিলেজের মতো টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর শুধু শরীর নিজে থেকেই সব ঠিক করে দেবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং এসব অঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষতি প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে লিভারের অসাধারণ পুনর্গঠনের ক্ষমতা আমাদের দেখায়, একই মানবদেহের বিভিন্ন টিস্যুর regenerative capacity কতটা আলাদা হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন সেই রহস্যই আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন, যাতে ভবিষ্যতে যেসব টিস্যু আজ সীমিতভাবে সারে, সেগুলোকেও আরও কার্যকরভাবে মেরামত করা যায়।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া