টাইপ ৩ ডায়াবেটিস কী, আলঝেইমার নিয়ে নতুন ধারণা

ডায়াবেটিস বললে সাধারণত টাইপ ১ ও টাইপ ২ রোগের কথাই মনে আসে। কিন্তু চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা ও গবেষণায় ‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ নামটিও দেখা যায়। এই শব্দটি মূলত মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতার সমস্যা এবং আলঝেইমার রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করেন কিছু গবেষক।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। টাইপ ৩ ডায়াবেটিস আলাদা কোনো স্বীকৃত রোগনির্ণয় না। আলঝেইমার রোগ ও ডায়াবেটিসের মধ্যে কিছু যোগসূত্র নিয়ে গবেষণা চলছে, কিন্তু আলঝেইমারকে সরাসরি ডায়াবেটিসের একটি ধরন বলা ঠিক না।
টাইপ ৩ ডায়াবেটিস বলতে কী বোঝায়?
সাধারণভাবে টাইপ ৩ ডায়াবেটিস বলতে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ও গ্লুকোজ ব্যবহারের সম্ভাব্য সম্পর্ককে বোঝানো হয়।
ইনসুলিন একটি হরমোন, যা রক্তের গ্লুকোজ শরীরের কোষে প্রবেশ করে শক্তি হিসেবে ব্যবহারে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের কোষও স্বাভাবিক কাজের জন্য শক্তি ব্যবহার করে। গবেষকেরা পরীক্ষা করে দেখছেন, মস্তিষ্কে ইনসুলিনের সংকেত আদান-প্রদানে সমস্যা হলে তা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু গবেষণায় আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ও কোষের শক্তি ব্যবহারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ কারণে কিছু গবেষক আলঝেইমারকে বোঝাতে টাইপ ৩ ডায়াবেটিস শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে এই ধারণা এখনও গবেষণার বিষয়, প্রতিষ্ঠিত রোগনির্ণয় না।
টাইপ ৩ ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য লক্ষণ কী?
যেহেতু টাইপ ৩ ডায়াবেটিস স্বীকৃত কোনো চিকিৎসাবিষয়ক রোগনির্ণয় না, তাই এর জন্য আলাদা ও নির্দিষ্ট লক্ষণের তালিকাও নেই। তবে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া: সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা বারবার ভুলে যাওয়া।
পরিকল্পনা করতে অসুবিধা: পরিচিত কোনো কাজের ধাপ মনে রাখতে বা সমস্যা সমাধান করতে সমস্যা হওয়া।
পরিচিত কাজ করতে সমস্যা: আগে সহজে করা কাজ সম্পন্ন করতে অসুবিধা হওয়া।
সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি: পরিচিত জায়গায় পথ চিনতে বা দিন-তারিখ মনে রাখতে সমস্যা হওয়া।
কথা বলা ও বোঝার সমস্যা: পরিচিত শব্দ খুঁজে পেতে কিংবা কথোপকথন অনুসরণ করতে অসুবিধা হওয়া।
আচরণ ও মেজাজে পরিবর্তন: আগ্রহ কমে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলা বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
এসব লক্ষণ মানেই আলঝেইমার হয়েছে, এমন না। ঘুমের সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, থাইরয়েডের সমস্যা ও ভিটামিনের ঘাটতিসহ নানা কারণেও স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে আলঝেইমারের সম্পর্ক কী?
গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আলঝেইমারসহ কিছু ধরনের ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ নিয়ে গবেষণা চলছে।
ইনসুলিনের কার্যকারিতায় সমস্যা: টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিতে পারে। মস্তিষ্কে ইনসুলিনের সংকেত আদান-প্রদানের পরিবর্তন স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
রক্তনালির ক্ষতি: দীর্ঘদিন রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো সমস্যাও এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি: শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং কোষের স্বাভাবিক শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন।
তবে টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলেই আলঝেইমার হবে, এমন কিন্তু না। আবার আলঝেইমার রোগের সব ঘটনাও ডায়াবেটিসের কারণে ঘটে না। মনে রাখতে হবে, বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য বিষয়ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে।
টাইপ ৩ ডায়াবেটিস কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
টাইপ ৩ ডায়াবেটিসের জন্য আলাদা কোনো স্বীকৃত পরীক্ষা নেই। চিকিৎসকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী আলঝেইমার রোগ এবং ডায়াবেটিসকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেন।
আলঝেইমার সন্দেহ হলে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা এবং শারীরিক ইতিহাস মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, মস্তিষ্কের স্ক্যান কিংবা নির্দিষ্ট বায়োমার্কার পরীক্ষা করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে উপবাসে রক্তের গ্লুকোজ, এইচবিএ১সি এবং প্রয়োজনে অন্যান্য পরীক্ষা আছে। এইচবিএ১সি পরীক্ষায় সাধারণত গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে গ্লুকোজের ধারণা পাওয়া যায়।
টাইপ ৩ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা আছে কি
টাইপ ৩ ডায়াবেটিস স্বীকৃত রোগনির্ণয় না বলে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাপদ্ধতিও নেই। চিকিৎসা নির্ভর করে ব্যক্তির প্রকৃত রোগ ও উপসর্গের ওপর।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করাও সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
আলঝেইমার রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ওষুধ, দৈনন্দিন কাজ সহজ করার ব্যবস্থা এবং পরিচর্যার পরামর্শ দিতে পারেন। ডায়াবেটিসের ওষুধ খেলে আলঝেইমার প্রতিরোধ বা নিরাময় হবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই। এই বিষয়ে গবেষণা চলছে।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিচের কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে-
- নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা করুন।
- শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য এবং স্বাস্থ্যকর খাবার রাখুন খাদ্যতালিকায়।
- পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- রক্তে গ্লুকোজ, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
- ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
- স্মৃতিশক্তি বা চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এসব অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো সমস্যার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তবে এগুলো আলঝেইমার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না।
টাইপ ৩ ডায়াবেটিস শব্দটি মূলত আলঝেইমার রোগ ও মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতার সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি এখনো স্বীকৃত কোনো আলাদা রোগ না। টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও এর কারণ এবং মস্তিষ্কে ইনসুলিনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শব্দটি দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা এবং স্মৃতিশক্তি বা চিন্তাভাবনায় স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র
- Samaa TV: Type 3 Diabetes Explained, Symptoms, Research and Facts
- Alzheimer’s Research UK: Diabetes and dementia risk
- Alzheimer’s Association: Alzheimer’s and memory loss myths
- National Institute on Aging: How is Alzheimer’s disease diagnosed?
- World Health Organization: Diabetes

