ইউনিসেফকে ইউনূসের সাবেক বিশেষ সহকারীর চ্যালেঞ্জ

টিকা সংকটের ফলে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার বৈঠকে সতর্ক ও পাঁচবার চিঠি দেওয়ার দাবি করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। তবে সংস্থাটির দেওয়া বক্তব্য অস্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।
বুধবার (২০ মে) রাতে ইউনিসেফের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আজকের সংবাদ সম্মেলনে হামের টিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি। ২০২৫ সালে হামের টিকার অভাবে কোনো মানুষ ফিরে গেছেন বলে জানা যায় না। এমনকি টিকার কাভারেজেও সেটা প্রতিফলিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষ ক্যাম্পেইন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ইন্টার-এজেন্সি কো-অর্ডিনেশন কমিটি কর্তৃক নেওয়া হয়, যেখানে ইউনিসেফ ও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকেন। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে করা যোগাযোগগুলোয় ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ নিয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ ছিল না।’
এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাবেক এই বিশেষ সহকারী।
এর আগে বুধবার (২০ মে) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে হামের রুটিন টিকার সংকট ছিল। ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারকে এ বিষয়ে ১০ বার সতর্ক ও পাঁচবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ের জেপিজি কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ বিষয়ক এ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
ইউনিসেফের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকার সংকট নিয়ে অন্তত ১০ বার বৈঠকে এবং পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ছিল, তবে পর্যাপ্ত ছিল না।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘বাংলাদেশে দুই ডোজ মিলে (এমআর১ ও এমআর২) প্রতি বছর হামের সাত কোটি টিকার চাহিদা রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ কোটি ৭৮ লাখ (১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন) ডোজ হামের টিকা আসে, যা দেশের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় রুটিন টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয় এবং বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। তবে টিকার এই ঘাটতি নতুন কিছু নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টিকার ঘাটতি নিয়ে ২০১৯ সালের পর থেকেই সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কারণ, কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। বিশেষ করে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সতর্ক সংকেত থাকে।’
এক প্রশ্নের রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘টিকা সরবরাহের বিষয়টি একটি নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের তিন বছরের চুক্তি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্তের কারণে ক্রয়-প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছিল। আমার মনে হয় না এর আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও ভালো বলতে পারবে।’
পরামর্শ দিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘টিকা সরবরাহের বিষয়টি একটি নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের তিন বছরের চুক্তি ছিল। সে অনুযায়ী হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদানে কোনো ধরনের বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘টিকা অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য হওয়ায় শুধু কম দামের বিষয়টি বিবেচনা করা যায় না। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে এই টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত, কার্যকর ও নিরাপদ। ইউনিসেফ বহু বছর ধরেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষে টিকা সংগ্রহ করে আসছে। বড় পরিসরে কেনাকাটা করার কারণে আমরা তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত টিকা সরবরাহ করতে পারি। বাংলাদেশ সরকার যদি মনে করে আমাদের কাছ থেকে না নিলেও আরও কম দামে মানসম্মত টিকা পাবে, তাহলে সেটি যেকোনো দেশই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই।’
ইউনিসেফের এই প্রতিনিধি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে চলতি বছরের মে মাসে আবার দেশে হামের রুটিন টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে। এখন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা, আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারে কাজ করছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।’
