বেশি পুষ্টি পেতে গাজর খাওয়ার সেরা উপায় কোনটি, জেনে নিন

গাজর মানেই চোখের জন্য উপকারী, এমন কথাই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। কিন্তু শুধু চোখের স্বাস্থ্য নয়, গাজরে থাকা বিটা-ক্যারোটিন, ফাইবার, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন সারা বছরই বাজারে গাজর পাওয়া যায়। ফলে প্রতিদিনের খাবারে এটি রাখা বেশ সহজ।
তবে গাজর খাওয়ার পদ্ধতি নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কাঁচা গাজর চিবিয়ে খেলে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়, নাকি সেদ্ধ বা ভাপিয়ে খেলে? আসলে দুই পদ্ধতিরই আলাদা সুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে গাজরে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীর কতটা শোষণ করতে পারছে, তার ওপর রান্নার পদ্ধতির প্রভাব রয়েছে।
গাজরে কী কী পুষ্টি রয়েছে?
গাজরের সবচেয়ে পরিচিত পুষ্টি উপাদান হলো বিটা-ক্যারোটিন। এটি প্রোভিটামিন এ ক্যারোটিনয়েড। শরীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিটা-ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তর করতে পারে। ভিটামিন এ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয়।
এ ছাড়া গাজরে ফাইবার, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য ক্যারোটিনয়েডও রয়েছে। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে গাজর রাখা যেতে পারে।
সেদ্ধ গাজরে বিটা-ক্যারোটিন বেশি শোষিত হতে পারে
গাজর সেদ্ধ বা রান্না করলে সব পুষ্টি নষ্ট হয়ে যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং রান্না করার ফলে গাজরের কোষের গঠন কিছুটা ভেঙে যায়, যার ফলে বিটা-ক্যারোটিন শরীরের জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথ (NIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, খাবার রান্না ও তাপ প্রয়োগ করলে বিটা-ক্যারোটিনের জৈবপ্রাপ্যতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ খাবারে থাকা উপাদানটি শরীর কতটা শোষণ ও ব্যবহার করতে পারছে, সেটি রান্নার মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে উন্নত হতে পারে।
মানুষের ওপর করা একটি গবেষণাতেও কাঁচা গাজরের তুলনায় রান্না করা ও পিউরি করা গাজর থেকে বেশি বিটা-ক্যারোটিন শোষিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আরেকটি গবেষণায় কাঁচা গাজরের তুলনায় রান্না করা গাজর থেকে বিটা-ক্যারোটিনের জৈবপ্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া যায়।
তাহলে কি কাঁচা গাজর খাওয়ার কোনো উপকার নেই?
অবশ্যই আছে। কাঁচা গাজরও পুষ্টিকর খাবার এবং সহজেই সালাদ বা নাশতার অংশ করা যায়।
কাঁচা গাজরে থাকা ফাইবার খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাজর ধুয়ে কেটে সরাসরি সালাদ হিসেবে খাওয়া যায়। তবে কাঁচা খাওয়ার আগে গাজর ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করা জরুরি, যাতে মাটি, ধুলোবালি ও সম্ভাব্য জীবাণু দূর হয়।
বেশি সময় রান্না করলেই বেশি উপকার নয়
গাজর রান্না করার অর্থ অনেকক্ষণ ধরে উচ্চ তাপে রান্না করা নয়। রান্নার সময় ও পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গাজর রান্না করলে ক্যারোটিনয়েডের জৈবপ্রাপ্যতা বাড়তে পারে। তবে রান্নার তীব্রতা ও সময়ের ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
অন্যদিকে, একটি গবেষণায় ১৫ মিনিট সেদ্ধ করার প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় রান্নার ফলে বিটা-ক্যারোটিনের বিভিন্ন রূপে পরিবর্তন দেখা গেছে। তাই গাজর অতিরিক্ত নরম হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রান্না না করে প্রয়োজনমতো সেদ্ধ বা ভাপানো ভালো।
ভাপানো গাজর ভালো বিকল্প হতে পারে
গাজর খাওয়ার ক্ষেত্রে হালকা ভাপানো একটি সহজ পদ্ধতি। এতে গাজর নরম হয় এবং খাওয়াও সহজ হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল বা মসলা যোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।
বিশেষ করে যারা কাঁচা গাজর ভালোভাবে চিবিয়ে খেতে পারেন না, তাদের জন্য হালকা ভাপানো গাজর সুবিধাজনক হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য কোনটি সুবিধাজনক?
কাঁচা গাজর তুলনামূলক শক্ত হওয়ায় ছোট শিশু বা যাদের চিবাতে সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি সব সময় সুবিধাজনক নয়। হালকা সেদ্ধ বা ভাপানো গাজর নরম হওয়ায় চিবিয়ে খাওয়া সহজ হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সেদ্ধ গাজর সহজে চিবানো ও হজম করার জন্য সহজ।
তবে শিশুদের ক্ষেত্রে খাবারের আকার ও টেক্সচার বয়স অনুযায়ী ঠিক করা জরুরি, যাতে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
গাজরের সঙ্গে সামান্য স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখলে কেমন হয়?
বিটা-ক্যারোটিনের মতো ক্যারোটিনয়েড চর্বিতে দ্রবণীয়। ফলে খাবারের সঙ্গে কিছু ফ্যাট থাকলে শরীরের ক্যারোটিনয়েড শোষণে সহায়তা করতে পারে। NIH-ও ক্যারোটিনয়েড শোষণের প্রক্রিয়ায় চর্বির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে।
তাই গাজরের সালাদে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর তেল, যেমন অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে। রান্না করা গাজরেও অতিরিক্ত তেল না দিয়ে পরিমিত স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখা যেতে পারে।
তবে শুধু বিটা-ক্যারোটিন শোষণ বাড়ানোর জন্য বেশি তেল ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই।
গাজর খাওয়ার কয়েকটি সহজ উপায়
গাজর প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্নভাবে রাখা যায়।
কাঁচা সালাদ: গাজর, শসা, টমেটো ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে মিশিয়ে সালাদ তৈরি করতে পারেন।
হালকা ভাপানো: অল্প সময় ভাপিয়ে নরম করে খেতে পারেন।
তরকারি: অন্যান্য সবজির সঙ্গে কম তেলে রান্না করা যায়।
স্যুপ: গাজর দিয়ে সবজি স্যুপ তৈরি করা যায়।
স্মুদি বা জুস: তবে জুস করলে ফাইবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে পুরো গাজর খাওয়াই ভালো।
তাহলে কাঁচা নাকি সেদ্ধ?
এক কথায় বললে, দুটিই ভালো। তবে উদ্দেশ্য অনুযায়ী পার্থক্য রয়েছে।
কাঁচা গাজর খেলে খাবারে ফাইবারসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় এবং এটি সহজ একটি স্বাস্থ্যকর নাশতা বা সালাদ হতে পারে। অন্যদিকে, হালকা রান্না করা গাজর থেকে বিটা-ক্যারোটিন শরীরে তুলনামূলক সহজে শোষিত হতে পারে। গবেষণায় রান্না করা গাজর থেকে ক্যারোটিনয়েডের জৈবপ্রাপ্যতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তাই প্রতিদিন একইভাবে না খেয়ে কখনো কাঁচা, কখনো হালকা ভাপানো বা রান্না করা গাজর খেতে পারেন। এতে খাবারে বৈচিত্র্যও থাকবে।
গাজরের সর্বোচ্চ উপকার পেতে হলে কাঁচা না সেদ্ধ, এই বিতর্কে একটি পদ্ধতিকে একমাত্র সঠিক মনে করার প্রয়োজন নেই। কাঁচা গাজর যেমন পুষ্টিকর, তেমনি হালকা রান্না করা গাজর থেকেও বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভালোভাবে শোষিত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গাজরকে অতিরিক্ত তেল, চিনি বা মসলা দিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবারে পরিণত না করা। কাঁচা সালাদ, হালকা ভাপানো বা কম তেলে রান্না করা গাজর, সবই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
সূত্র: টিভি ৯


