logo
Advertisement

পিরিয়ডের আগে রাতে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে যে কারণে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
পিরিয়ডের আগে রাতে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে যে কারণে
ছবি: আইস্টক

মাসিক শুরুর কয়েক দিন আগে অনেক মেয়েদের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। কারও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, কারও ঘুমের সমস্যা হয়, আবার কারও হঠাৎ ক্ষুধা বেড়ে যায়। দিনের বেলায় সব ঠিক থাকলেও রাতে মিষ্টি, চকোলেট বা অন্য কোনো মিষ্টি খাবার খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা হতে পারে। অনেকেই এটিকে নিজের নিয়ন্ত্রণের অভাব বলে মনে করেন। কিন্তু সবসময় বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

মাসিকের আগে এমন খাবারের আকাঙ্ক্ষা প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পিএমএসে মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ, ক্ষুধার পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা ও হজমের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।


পিরিয়ডের আগে মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করে কেন?

মাসিকের আগে শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামার সঙ্গে মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। পিএমএসের উপসর্গের মধ্যে খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষুধার পরিবর্তনও রয়েছে। ফলে এই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি খেতে ইচ্ছে করতে পারে।

এ সময় কারও মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে, আবার কারও নোনতা বা অন্য ধরনের খাবার খেতে ইচ্ছে করে। অর্থাৎ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একই ধরনের খাবারের আকাঙ্ক্ষা দেখা যাবে, এমন নয়।

ভারতীয় পুষ্টিবিদ অঞ্জলি মুখার্জির মতে, পিরিয়ডের আগে রাতে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছাকে শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি মাসিক চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে।

শুধু ক্ষুধা নয়, ঘুমের সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে

পিরিয়ডের আগে অনেকের ঘুমের ধরনেও পরিবর্তন আসে। কেউ সহজে ঘুমাতে পারেন না, আবার কেউ ঘুমিয়েও পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান না। পিএমএসের পরিচিত উপসর্গের মধ্যেই ঘুমের সমস্যা রয়েছে।

রাতে জেগে থাকলে বা ঘুম কম হলে স্বাভাবিকভাবেই খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যদি মাসিকের আগের ক্ষুধার পরিবর্তন যোগ হয়, তাহলে রাতে মিষ্টি বা অন্য খাবার খাওয়ার ইচ্ছা আরও তীব্র মনে হতে পারে।

তাই প্রতিবার রাতে মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলেই সেটিকে শুধু মিষ্টির প্রতি আসক্তি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। মাসের কোন সময়ে এই আকাঙ্ক্ষা বেশি হচ্ছে, সেটিও লক্ষ্য করা দরকার।

পিএমএসে মেজাজের পরিবর্তনও হতে পারে

মাসিকের আগে শুধু শরীর নয়, মনেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। উদ্বেগ, বিরক্তি, মন খারাপ, মেজাজের ওঠানামা এবং মানসিক চাপ পিএমএসের পরিচিত উপসর্গ।

এ ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাবারের আকাঙ্ক্ষারও সম্পর্ক থাকতে পারে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ অঞ্জলি মুখার্জি জানিয়েছেন, যারা জানেন যে মাসিকের আগে তাদের উদ্বেগ বা অস্থিরতা বাড়ে, তারা আগে থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থাকলে সেই সময়ের পরিবর্তন সামলানো সহজ হতে পারে।

অর্থাৎ নিজের মাসিক চক্রের সঙ্গে উপসর্গগুলোর সম্পর্ক বুঝতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে সামলাবেন রাতের মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা

মাসিকের আগে খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা দেখা দিলে একেবারে না খেয়ে থাকার চেষ্টা সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। বরং নিয়মিত ও সুষম খাবার খাওয়ার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।

নিয়মিত খাবার খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর রাতে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগতে পারে। তাই দিনের খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। এনডিটিভির প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদও নিয়মিত ও সুষম খাবার খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

খাবারে শর্করার পাশাপাশি প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পর্যাপ্ত আঁশ রাখলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: পিরিয়ডের আগে শরীরে নানা পরিবর্তনের কারণে অনেকের অস্বস্তি বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করা সামগ্রিকভাবে শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। পুষ্টিবিদ অঞ্জলি মুখার্জিও এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে শুধু পানি খেলেই মিষ্টি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এটি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন: এনডিটিভির প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ অঞ্জলি মুখার্জি পিএমএসের সময়ে খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, এগুলো শরীরকে এই সময়ে সহায়তা করতে পারে এবং ঘুমের ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে।

দুধ ও দইয়ের মতো খাবার থেকে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। বাদাম, বীজ, ডাল ও কিছু শাকসবজিতেও ম্যাগনেশিয়াম থাকে।

মিষ্টি একেবারে নিষিদ্ধ করার দরকার নেই: পিরিয়ডের আগে মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করলে নিজেকে দোষারোপ করার প্রয়োজন নেই। বরং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবারের বদলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।

যেমন, বড় পরিমাণে মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার বদলে অল্প পরিমাণে পছন্দের খাবার খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ফল, দই, বাদাম বা অন্য পুষ্টিকর খাবারও রাখা যায়।

লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে খাবার বেছে নেওয়া, জোর করে ক্ষুধা বা খাবারের আকাঙ্ক্ষা দমন করা নয়।

প্রতি মাসে একই সময়ে এমন হলে কী করবেন?

একটি সহজ উপায় হলো মাসিক চক্রের সঙ্গে খাবারের আকাঙ্ক্ষা ও অন্যান্য উপসর্গের সম্পর্ক লিখে রাখা। কোন সময়ে মিষ্টি খেতে বেশি ইচ্ছে করছে, ঘুম কেমন হচ্ছে, মেজাজে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং মাসিক শুরু হলে সেগুলো কমছে কি না, তা লক্ষ্য করতে পারেন।

পিএমএসের উপসর্গ সাধারণত মাসিক শুরুর আগে দেখা দেয় এবং মাসিক শুরু হওয়ার পর কমে যায়।

এভাবে কয়েকটি চক্রের তথ্য রাখলে বোঝা সহজ হতে পারে যে রাতের মিষ্টি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সত্যিই মাসিকের আগের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাসিকের আগে ক্ষুধা বা মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হওয়া একাই সাধারণত বড় সমস্যার লক্ষণ নয়। কিন্তু এর সঙ্গে যদি তীব্র উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, ঘুমের মারাত্মক সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

বিশেষ করে প্রতি মাসে একই সময়ে উপসর্গ এতটাই তীব্র হলে যে কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক বা স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, তখন বিষয়টিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর পিএমএস বা প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বা পিএমডিডি থাকতে পারে, যার জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

মাসিকের আগে রাতে হঠাৎ মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করা তাই অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। শরীরের হরমোনগত পরিবর্তন, ক্ষুধা, মেজাজ ও ঘুমের পরিবর্তন একসঙ্গে এই আকাঙ্ক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের মাসিক চক্রের ধরন বুঝে নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে নজর দিলে এই সময়টি সামলানো সহজ হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি