রাতের খাবার কখন খাওয়া সবচেয়ে ভালো, জানুন সঠিক সময়

রাতের খাবার কখন খাওয়া উচিত, এ নিয়ে অনেকেরই আলাদা আলাদা অভ্যাস আছে। কেউ সন্ধ্যা নামার আগেই খেয়ে নেন, আবার কেউ কাজ শেষ করে রাত ৯টা বা ১০টার পর খাবার খান। কিন্তু শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন খাচ্ছেন, সেটিও শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে খাবারের সময় ও শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় আগ্রহ বেড়েছে। আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা ২৪ ঘণ্টার জৈবিক ঘড়ি ঘুম, হরমোন নিঃসরণ, ক্ষুধা ও বিপাকক্রিয়াসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। দিনের শেষ দিকে এই ছন্দের সঙ্গে খাবারের সময়ের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাহলে রাতের খাবারের সবচেয়ে ভালো সময় কখন?
সবার জন্য একই নির্দিষ্ট সময়কে আদর্শ বলা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট, ঘুমানোর খুব কাছাকাছি সময়ে রাতের খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো।
সাধারণভাবে ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অর্থাৎ রাত ১০টায় ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে রাত ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে খাবার শেষ করা সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে এটি কঠোর নিয়ম নয়। কারও কাজের সময়, ঘুমের রুটিন, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর খাবারের সময় নির্ভর করতে পারে।
রাতে দেরিতে খেলে সমস্যা কোথায়?
দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীর খাবার থেকে শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। আমাদের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে বিপাকক্রিয়ারও সম্পর্ক রয়েছে। দিনের শেষ দিকে শরীর ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।
এ সময় ভারী খাবার খেলে শরীরকে হজমের কাজ চালিয়ে যেতে হয়, যখন ঘুমের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি খাবার খেলে অস্বস্তি, বদহজম বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
দেরিতে খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘদিন চললে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। কিছু গবেষণায় দিনের তুলনায় রাতে খাবার গ্রহণের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের পার্থক্য দেখা গেছে। তবে শুধু খাবারের সময়ই এসব সমস্যার একমাত্র কারণ নয়। খাবারের পরিমাণ, গুণগত মান, শারীরিক সক্রিয়তা ও ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।
রাতের খাবার এগিয়ে আনলে কী উপকার হতে পারে?
সন্ধ্যার দিকে রাতের খাবার শেষ করার সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো ঘুমানোর আগে খাবার হজমের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া। এতে পেট ভার লাগা বা খাবারের পর অস্বস্তির সম্ভাবনা কমতে পারে।
এ ছাড়া দিনের তুলনামূলক আগের সময়ে খাবার গ্রহণ শরীরের সার্কাডিয়ান রিদমের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। গবেষণায় খাবারের সময়ের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকক্রিয়ার সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে রাতের খাবার কয়েক ঘণ্টা এগিয়ে নিলেই ওজন কমবে বা সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাবারের মোট ক্যালরি, পুষ্টিগুণ ও জীবনযাত্রার অন্যান্য বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাত ৯টা বা ১০টায় খেতে হলে কী করবেন?
অনেকের কাজ, যাতায়াত বা পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে সন্ধ্যায় খাওয়া সম্ভব হয় না। তাই বাস্তব জীবনে সবাইকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করতে হবে, এমন নয়।
যদি দেরিতে খেতেই হয়, তাহলে খাবার তুলনামূলক হালকা রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে খাওয়ার পরপরই বিছানায় না যাওয়াই ভালো। যতটা সম্ভব ঘুমানোর আগে দুই থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধান রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রতিদিন একই সময়ে খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু তাড়াতাড়ি খাওয়াই নয়, নিয়মিত সময়ে খাওয়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কখনো সন্ধ্যা ৭টায়, আবার কখনো রাত ১১টায় খাওয়ার বদলে কাছাকাছি সময়ে রাতের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা ভালো।
নিয়মিত খাবারের সময় শরীরের দৈনন্দিন ছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। খাবারের সময়কে ঘুম ও জাগরণের রুটিনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার বিষয়টি ক্রোনোনিউট্রিশন বা খাবারের সময়ভিত্তিক পুষ্টিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।
রাতের খাবারে কী খাবেন?
রাতের খাবারের সময়ের পাশাপাশি খাবারের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। খুব বেশি তেল, চর্বি বা অতিরিক্ত পরিমাণের খাবার ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে খেলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
রাতের খাবারে শাকসবজি, পরিমিত পরিমাণে ভাত বা রুটি এবং মাছ, ডিম, ডাল বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। অতিরিক্ত মিষ্টি, ভারী ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
সবার জন্য কি একই সময় উপযুক্ত?
না। একজনের জন্য সন্ধ্যা ৭টা উপযুক্ত হলেও অন্য কারও কাজ বা ঘুমের সময়ের কারণে তা সম্ভব নাও হতে পারে। যারা রাতের শিফটে কাজ করেন, তাদের খাবারের সময়ও আলাদা হতে পারে।
তাই ঘড়ির একটি নির্দিষ্ট সময়কে সবার জন্য আদর্শ ধরে নেওয়ার চেয়ে নিজের ঘুমের সময়, ক্ষুধা, কাজের রুটিন এবং স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন বিবেচনা করা বেশি বাস্তবসম্মত। বিশেষ কোনো রোগ বা খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের সময় ঠিক করা উচিত।
রাতের খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমানোর একেবারে আগে না খাওয়া। সম্ভব হলে ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে খাবার শেষ করা ভালো। পাশাপাশি প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে খাওয়া, পরিমাণমতো খাবার গ্রহণ এবং রাতের খাবার তুলনামূলক হালকা রাখার অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
তবে সুস্থ থাকার জন্য শুধু খাবারের সময়ের দিকে নজর দিলেই হবে না। কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, কতটা শরীরচর্চা করছেন এবং পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না, সবকিছু মিলিয়েই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন তৈরি হয়।
সূত্র: বিবিসি




