চোখের এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত চিকিৎসায় ফিরতে পারে দৃষ্টি
-b910e4-720x405.webp)
অন্ধত্ব মানেই সব সময় দৃষ্টি আর ফেরানো যাবে না, এমন নয়। চোখের কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা। অপটিক নার্ভ বা রেটিনার কিছু গুরুতর রোগে ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু চোখের সামনের স্বচ্ছ স্তর কর্নিয়ায় সংক্রমণ, আঘাত বা দাগের কারণে দৃষ্টি কমে গেলে কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টি অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এই কারণেই কর্নিয়াল অন্ধত্বকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর এমন একটি কারণ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সময়মতো চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্নিয়াল অন্ধত্বের সব কারণ সমানভাবে চিকিৎসাযোগ্য নয়। ক্ষতির ধরন, গভীরতা এবং কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
কর্নিয়া কী?
কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ, গম্বুজাকৃতির অংশ। বাইরে থেকে দেখলে চোখের কালো বা রঙিন অংশের ওপর যে স্বচ্ছ আবরণ দেখা যায়, সেটিই কর্নিয়া।
আলো চোখের ভেতরে প্রবেশ করার পর রেটিনায় সঠিকভাবে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কর্নিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি আলোকে বাঁকিয়ে রেটিনার দিকে ফোকাস করতেও সাহায্য করে। কর্নিয়ায় দাগ, ঘোলাভাব বা গুরুতর ক্ষতি হলে আলো স্বাভাবিকভাবে চোখের ভেতরে যেতে পারে না। ফলে দৃষ্টি ঝাপসা থেকে শুরু করে গুরুতর দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো সমস্যা হতে পারে।
কর্নিয়াল অন্ধত্ব কী?
কর্নিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়ে যখন দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাকে সাধারণভাবে কর্নিয়াল অন্ধত্ব বলা হয়। সংক্রমণ, আঘাত, কর্নিয়ায় আলসার, রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতি এবং কিছু কর্নিয়াজনিত রোগ এর কারণ হতে পারে।
কর্নিয়ায় সমস্যা হলে চোখের ভেতরের রেটিনা বা অপটিক নার্ভ সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনটা না। এ কারণেই কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কর্নিয়ার ক্ষত সারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করার সুযোগ থাকে।
শুধু বয়স্কদেরই হয় না
কর্নিয়াল অন্ধত্বকে অনেকেই বয়সজনিত চোখের সমস্যা মনে করেন। বাস্তবে এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে।
চোখে সংক্রমণ, চোখে আঘাত, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ, কর্নিয়ার আলসার কিংবা দুর্ঘটনায় চোখের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তরুণ বয়সেও গুরুতর দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে রাসায়নিক পদার্থ বা যন্ত্রপাতির সঙ্গে কাজ করা মানুষদের চোখের সুরক্ষার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কর্নিয়াল অন্ধত্বের প্রধান কারণ কী?
বিভিন্ন কারণে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-
- চোখে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমণ
- কর্নিয়ায় আলসার
- চোখে আঘাত বা দুর্ঘটনা
- রাসায়নিক পদার্থ চোখে পড়া
- চোখে কোনো বিদেশি বস্তু ঢুকে যাওয়া
- কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারে অনিয়ম ও সংক্রমণ
- কিছু কর্নিয়াজনিত রোগ
- দীর্ঘদিনের কিছু চোখের প্রদাহ বা অন্যান্য সমস্যা
কর্নিয়াল অন্ধত্বের কারণগুলোর মধ্যে সংক্রমণ ও আঘাত গুরুত্বপূর্ণ। কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের ভুল পদ্ধতিও গুরুতর কর্নিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চোখে আলসার হলে কেন এত দ্রুত চিকিৎসা দরকার?
কর্নিয়াল আলসার হলো কর্নিয়ার ওপর তৈরি হওয়া ক্ষত। এটি অনেক সময় সংক্রমণের কারণে হয়। প্রথম দিকে চোখ লাল হওয়া, ব্যথা, আলো সহ্য না হওয়া, পানি পড়া বা দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সমস্যাটি অবহেলা করলে আলসার গভীরে যেতে পারে এবং কর্নিয়ায় স্থায়ী দাগ তৈরি করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে চোখের গঠনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চোখে ব্যথা, লালচে ভাব ও দৃষ্টির দ্রুত অবনতি হলে নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার না করে দ্রুত চক্ষু চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।
সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে কিছু কর্নিয়াল সংক্রমণ ও আলসারের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব।
কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চোখের কিছু সমস্যা সামান্য মনে হলেও দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে অপেক্ষা করা উচিত নয়-
- হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া
- চোখে তীব্র ব্যথা
- চোখ অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া
- আলো সহ্য না হওয়া
- চোখ থেকে অস্বাভাবিক পানি বা পুঁজের মতো স্রাব বের হওয়া
- চোখে আঘাত লাগার পর দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া
- রাসায়নিক পদার্থ চোখে পড়া
- কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের পর চোখে ব্যথা বা দৃষ্টি কমে যাওয়া
এসব লক্ষণ বিশেষ করে চোখের সংক্রমণ বা আঘাতের পর দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সব কর্নিয়াল অন্ধত্ব কি পুরোপুরি ভালো হয়?
না। এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিছু ক্ষেত্রে কর্নিয়ার ক্ষতি চিকিৎসায় পুরোপুরি বা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হতে পারে। আবার গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিতে কর্নিয়ায় স্থায়ী দাগ তৈরি হলে শুধু ওষুধে দৃষ্টি স্বাভাবিক নাও হতে পারে।
কর্নিয়ার ক্ষতির পাশাপাশি রেটিনা বা অপটিক নার্ভেও সমস্যা থাকলে শুধু কর্নিয়ার চিকিৎসা করলেই দৃষ্টি পুরোপুরি ফিরে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই কর্নিয়াল অন্ধত্বকে পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য বলা ঠিক নয়। বরং বলা যায়, এর কিছু কারণ সময়মতো চিকিৎসা করলে প্রতিরোধ বা চিকিৎসার মাধ্যমে দৃষ্টি রক্ষা কিংবা ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে।
কখন কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়?
কর্নিয়া এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলে যে ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসায় দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের কথা বিবেচনা করা হতে পারে।
কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে কেরাটোপ্লাস্টিও বলা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পুরোটা বা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশ বদলে দাতা কর্নিয়ার টিস্যু ব্যবহার করা হয়।
আগে পুরো কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি বেশি ব্যবহৃত হলেও এখন রোগের ধরন অনুযায়ী কর্নিয়ার শুধু ক্ষতিগ্রস্ত স্তর প্রতিস্থাপনের বিভিন্ন পদ্ধতিও রয়েছে।
সব সময় পুরো কর্নিয়া বদলাতে হয় না
আধুনিক কর্নিয়া সার্জারিতে রোগের কোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটি দেখে চিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করা হয়।
DALK পদ্ধতিতে কর্নিয়ার সামনের ক্ষতিগ্রস্ত স্তরগুলো প্রতিস্থাপন করা যায়, যখন গভীরের অংশ তুলনামূলকভাবে সুস্থ থাকে।
আবার কর্নিয়ার সবচেয়ে ভেতরের এন্ডোথেলিয়াল স্তরে সমস্যা হলে DSAEK বা DMEK-এর মতো পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্তর প্রতিস্থাপন করা যায়।
এর ফলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে নিজের সুস্থ কর্নিয়ার অংশ যতটা সম্ভব রেখে চিকিৎসা করা যায়।
কর্নিয়া দানের প্রয়োজন কেন?
কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের জন্য দাতা কর্নিয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক দেশেই প্রয়োজনের তুলনায় দাতা কর্নিয়ার সংখ্যা কম।
ভারতেও কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চাহিদা এবং দাতা কর্নিয়ার প্রাপ্যতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও দেশটিতে প্রয়োজনের তুলনায় কম কর্নিয়া প্রতিস্থাপন হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত হলেও দাতা কর্নিয়া না থাকলে অনেক রোগী সেই চিকিৎসার সুযোগ পান না।
চোখ দান করলে কী হয়?
মৃত্যুর পর দান করা চোখের কর্নিয়া উপযুক্ত হলে অন্য রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি দাতার চোখের টিস্যু একাধিক রোগীর চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে, টিস্যুর অবস্থা ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী।
তাই চোখ দান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো কর্নিয়াল অন্ধত্ব মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কর্নিয়াকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন?
কিছু সহজ অভ্যাস কর্নিয়ার গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে পারে।
কাজের সময় সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করুন: রাসায়নিক পদার্থ, ধাতুর কণা, কাঠের গুঁড়া বা অন্য কোনো বস্তু চোখে ঢোকার ঝুঁকি থাকলে সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করুন।
কন্টাক্ট লেন্সে সতর্ক থাকুন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার না করা এবং লেন্স পরিষ্কার ও সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
চোখ ঘষবেন না: চোখে ধুলা বা কোনো কণা ঢুকলে বারবার ঘষলে কর্নিয়ায় আঁচড় লাগতে পারে।
রাসায়নিক পদার্থ চোখে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিন: রাসায়নিক পদার্থ চোখে পড়লে দেরি না করে প্রচুর পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
চোখের সংক্রমণ অবহেলা করবেন না: লাল চোখ বা সামান্য অস্বস্তি মনে হলেও যদি ব্যথা, আলো সহ্য না হওয়া বা দৃষ্টি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কর্নিয়ায় ক্ষতি হলে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া গুরুতর বিষয় হলেও সব ক্ষেত্রে সেটি স্থায়ী অন্ধত্বের সমান নয়। কর্নিয়ার কিছু সংক্রমণ ও আঘাত দ্রুত চিকিৎসা করলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আবার গুরুতর ক্ষতির ক্ষেত্রে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টি উন্নত করার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। চোখে ব্যথা, লালচে ভাব, আলো সহ্য না হওয়া, স্রাব বা হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়াকে সাধারণ চোখ ওঠা বা সামান্য আঘাত ভেবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে অনেক ক্ষেত্রে কর্নিয়ার স্থায়ী ক্ষতি এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


