logo

ঘুম থেকে উঠেই খালি পেটে কফি পান করছেন, জানুন উপকার ও ঝুঁকি

এআই প্রতিবেদক
ঘুম থেকে উঠেই খালি পেটে কফি পান করছেন, জানুন উপকার ও ঝুঁকি
ছবি: মিরর

অনেকের সকাল সকাল এক কাপ গরম কফি না খেলে যেন দিনটাই শুরু হয় না। ঘুম ঘুম ভাব কাটাতে, কাজে মনোযোগ বাড়াতে বা দিনের শুরুতে একটু সতেজ অনুভব করতে কফির ওপর নির্ভর করা মানুষের সংখ্যা কম না।

কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠেই, খালি পেটেই নাশতা খাওয়ার আগে কফি পান করেন। কিন্তু খালি পেটে কফি পান করলে শরীরে কী ঘটে, তা কি জানেন?

ভারতীয় এ ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালি পেটে কফি পান করা সবার জন্য ক্ষতিকর না। তবে কিছু মানুষের এর ফলে বুকজ্বালা, পেটে অস্বস্তি, অস্থিরতা বা বারবার শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব নির্ভর করে শরীরের ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা, হজমের অবস্থা এবং আগে থেকে থাকা স্বাস্থ্য সমস্যার ওপর।

তাই কফি খাওয়ার অভ্যাস বদলানোর আগে বুঝে নেওয়া দরকার, এটি শরীরে কীভাবে কাজ করে এবং কারা খালি পেটে কফি পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন।

খালি পেটে কফি পান করলে শরীরে কী ঘটে?

পাকস্থলীতে অ্যাসিডের উৎপাদন বাড়তে পারে

কফি পান করলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের উৎপাদন বাড়তে পারে। খাবার হজমের জন্য এই অ্যাসিড প্রয়োজনীয় হলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর কারণে পেটে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

বিশেষ করে যাদের পাকস্থলী সংবেদনশীল, তাদের খালি পেটে কফি পান করার পর অস্বস্তি হতে পারে। তবে কফি খেলেই পাকস্থলীর ক্ষতি হয়, এমন কোনো প্রমাণ নেই। অধিকাংশ মানুষই কোনো সমস্যা ছাড়াই কফি পান করতে পারেন।

বুকজ্বালা ও অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়তে পারে

কফি পান করার পর কারও কারও বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া হয় বা মুখে টক স্বাদ অনুভূত হয়। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো অ্যাসিড রিফ্লাক্স। এই অবস্থায় পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসে।

কফি ও ক্যাফেইন খাদ্যনালির নিচের দিকে থাকা পেশির বলয়ের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই পেশি সাধারণত পাকস্থলীর খাবার ও অ্যাসিডকে খাদ্যনালিতে উঠে আসতে বাধা দেয়। এর কার্যকারিতা কমে গেলে রিফ্লাক্সের উপসর্গ বেড়ে যায়।

যাদের আগে থেকেই অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা রয়েছে, তাদের খালি পেটে কফি পান করলে অস্বস্তি বাড়ছে কি না, তা খেয়াল রাখা দরকার।

অস্থিরতা ও উদ্বেগ বাড়তে পারে

কফিতে থাকা ক্যাফেইন সাধারণত মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে ঘুম ভাব কমে এবং সতর্কতা বাড়ে। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অতিরিক্ত হতে পারে।

খালি পেটে কফি খেলে এর ক্যাফেইন দ্রুত শোষিত হতে পারে। ফলে কারও কারও হাত কাঁপা, অস্থির লাগা, বিরক্তি, উদ্বেগ বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

যারা আগে থেকেই উদ্বেগের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ ও সময়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

বারবার শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে

কফি পান করার পর অনেকের মলত্যাগের বেগ অনুভূত হয়। কফির কিছু উপাদান হজমতন্ত্রের কার্যক্রমকে উদ্দীপ্ত করে। ক্যাফেইনও অন্ত্রের চলাচলে প্রভাব ফেলে।

তাই সকালে কফি পান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই কারও কারও শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে খালি পেটে কফি পান করলেই যে এই প্রতিক্রিয়া ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়। ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব আলাদা হয়।

যাদের কফি পান করার পর পাতলা পায়খানা বা পেটে মোচড় দেওয়ার সমস্যা হয়, তারা কফি খেলেও এর পরিমাণ কমিয়ে দেখতে পারেন।

শরীর সাময়িকভাবে বেশি সতেজ লাগতে পারে

কফির ক্যাফেইন ঘুমঘুম ভাব কমিয়ে মনোযোগ ও সতর্কতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। এ জন্য সকালে কফি পান করলে অনেকে দ্রুত সজাগ বোধ করেন।

তবে মনে রাখবেন, কফি কখনই শরীরের ঘুমের প্রয়োজন পূরণ করে না। পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প হিসেবেও কফিকে ব্যবহার করা উচিত না। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে বরং রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে, যা পরের দিনের ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

খালি পেটে কফি পান করলে কি কর্টিসল হরমোন বাড়ে

কর্টিসলকে অনেক সময় স্ট্রেস হরমোন বলা হয়। এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ এবং ঘুম থেকে জেগে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় স্বাভাবিকভাবেই শরীরে কর্টিসলের মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে, যা দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে।

ক্যাফেইন সাময়িকভাবে কর্টিসলের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। যারা নিয়মিত কফি পান করেন, তাদের শরীরের প্রতিক্রিয়া নতুন কফি পানকারীদের তুলনায় আলাদা হতে পারে।

খালি পেটে কফি পান করলেই কর্টিসল বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যায় বা দীর্ঘমেয়াদি হরমোনের সমস্যা তৈরি হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা দেয়নি। তাই শুধু কর্টিসল বেড়ে যাওয়ার ভয়ে কফি পান বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।


যারা খালি পেটে কফি পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন

কফি পান করার পর নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিলে খালি পেটে কফি পান না করাই ভালো হতে পারে।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালা: কফি পান করলে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর বা খাদ্যনালিতে জ্বালাপোড়া বাড়লে খাবারের সঙ্গে কফি পান করে দেখুন, অথবা পরিমাণ কমান।

উদ্বেগ বা প্যানিকের সমস্যা: ক্যাফেইন অস্থিরতা, হাত কাঁপা কিংবা বুক ধড়ফড় বাড়াতে পারে।

সংবেদনশীল পাকস্থলী: কফির পর পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি হলে নিজের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী অভ্যাস পরিবর্তন করুন।

ঘুমের সমস্যা: বিকেল বা সন্ধ্যায় কফি পান করলে রাতে ঘুমাতে অসুবিধা হলে দিনের আগের ভাগেই কফি পান করুন।

হৃদস্পন্দন বা রক্তচাপের সমস্যা: ক্যাফেইন কিছু মানুষের হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। আগে থেকে সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যাফেইন গ্রহণ করুন।

কফি পান করার সঠিক নিয়ম কী?

কফি পান করার জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে অভ্যাস গড়ে তোলাই ভালো। কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে পারেন।

  • খালি পেটে কফি পান করলে অস্বস্তি হলে আগে হালকা নাশতা করে নিন।
  • নাশতায় ডিম, দই, ওটস বা আটার রুটির মতো খাবার রাখতে পারেন। এগুলো পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করবে এবং খালি পেটে কফি পান করার প্রয়োজনও কমাবে।
  • কফিতে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি সিরাপ যোগ করা এড়িয়ে চলুন।
  • কফি পান করার পর বুকজ্বালা বা অস্থিরতা বাড়লে পরিমাণ কমিয়ে দিন অথবা ক্যাফেইনমুক্ত কফি চেষ্টা করতে পারেন।
  • ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের শেষ ভাগে কফি পান এড়িয়ে চলুন।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন। কফি পান করলেও দিনের বাকি সময়ে শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করা জরুরি।

সুস্থ অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে মোট ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত এমন একটি সীমা, যা ক্ষতিকর প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে এটি সবার জন্য লক্ষ্য নয় বা নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত নিরাপদ মাত্রাও নয়। কফির ধরন ও কাপের আকার অনুযায়ী ক্যাফেইনের পরিমাণ অনেক বদলে যায়। গর্ভাবস্থায় ক্যাফেইন গ্রহণের সীমা আরও কম রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।

সকালে খালি পেটে কফি পান করা সবার জন্য ক্ষতিকর নয়। অনেকেই কোনো সমস্যা ছাড়াই এই অভ্যাস বজায় রাখতে পারেন। তবে কফি পান করার পর বুকজ্বালা, পেটে অস্বস্তি, অস্থিরতা কিংবা ঘুমের সমস্যা হলে নিজের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

কফি খাওয়ার পর শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বা তীব্র উপসর্গ দেখা দিলে শুধু কফিকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: এনডিটিভি