logo
Advertisement

হঠাৎ কিডনিতে পাথর নয়, দায়ী হতে পারে প্রতিদিনের এই অভ্যাসগুলো

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হঠাৎ কিডনিতে পাথর নয়, দায়ী হতে পারে প্রতিদিনের এই অভ্যাসগুলো
ছবি: ডা. নিশা গর

হঠাৎ একদিন কোমর বা পেটের পাশে এমন তীব্র ব্যথা শুরু হলো যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোই কঠিন। পরীক্ষা করে জানা গেল, কিডনিতে পাথর হয়েছে। অনেকের কাছেই বিষয়টি যেন হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। কিন্তু কিডনির পাথর সব সময় একেবারে আচমকা তৈরি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রস্রাবে থাকা বিভিন্ন খনিজ ও লবণ ধীরে ধীরে জমে ছোট স্ফটিক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বড় হয়ে পাথরে পরিণত হতে পারে।

সাম্প্রতিক ভারতীয় এক প্রতিবেদনে ইউরোলজিস্ট ডা. সনি মেহতা উল্লেখ করেন, কম পানি পান করা, বেশি লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং কিছু বিপাকীয় সমস্যা কিডনিতে পাথর তৈরির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ কিডনিতে পাথর হওয়ার পেছনে শুধু ভাগ্য বা বংশগত কারণ নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনেরও ভূমিকা থাকতে পারে।

কিডনিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?

কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পদার্থ থাকে। এসব পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে গেলে বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে সেগুলো স্ফটিক তৈরি করতে পারে। পরে সেই স্ফটিক একত্র হয়ে পাথরে পরিণত হতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা থাকে এবং পাথর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত খনিজগুলো শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবনযাপনভিত্তিক পদক্ষেপগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত তরল পান করা।

কম পানি পান করা বড় ঝুঁকি

কিডনিতে পাথরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা।

গরমে বেশি ঘাম হলে, দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে বা ব্যায়ামের পর শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণ না করলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে এবং প্রস্রাব তুলনামূলক ঘন হয়ে যায়। তখন পাথর তৈরির উপাদানগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ বেশি পায়।

তাই শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি পান করার বদলে দিনের বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত তরল গ্রহণের অভ্যাস করা ভালো। তবে কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো রোগের কারণে চিকিৎসক যদি তরল গ্রহণ সীমিত করতে বলে থাকেন, তাহলে নিজের মতো করে বেশি পানি পান করা উচিত নয়।

খাবারে অতিরিক্ত লবণ

অনেকের খাবারে লবণের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি থাকে। রান্নায় অতিরিক্ত লবণের পাশাপাশি চিপস, প্যাকেটজাত খাবার, ঝটপট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, চাটনি ও বিভিন্ন চটজলদি খাবার থেকেও প্রচুর সোডিয়াম শরীরে ঢুকতে পারে।

বেশি সোডিয়াম গ্রহণ কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম বের হওয়ার পরিমাণ বাড়াতে পারে। এতে কিছু ধরনের কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম অক্সালেট ও ক্যালসিয়াম ফসফেট পাথরের ক্ষেত্রে সোডিয়াম কমানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তাই শুধু টেবিলে আলাদা করে লবণ না দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারও কমাতে হবে।

অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিনও বিষয়

মাংস, মাছ, ডিমসহ প্রাণিজ প্রোটিন পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ কিছু ধরনের কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে ইউরিক অ্যাসিড পাথরের ক্ষেত্রে প্রাণিজ প্রোটিনের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন প্রস্রাবের রাসায়নিক পরিবেশে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা কিছু ধরনের পাথর তৈরিতে সহায়ক হয়।

এর অর্থ মাংস বা মাছ একেবারে বাদ দিতে হবে না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা এবং খাদ্যতালিকায় ডাল, শিম, মসুরের মতো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনও রাখা যেতে পারে।


অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে

শুধু খাবারের ধরন নয়, শরীরের ওজনও কিডনি পাথরের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

মার্কিন জাতীয় ডায়াবেটিস, পরিপাক ও কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ইউরিক অ্যাসিড পাথরের ইতিহাস থাকলে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা, বিপাকীয় পরিবর্তন এবং খাদ্যাভ্যাসের মতো বিষয় যুক্ত থাকতে পারে। এসব পরিবর্তন প্রস্রাবের রাসায়নিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সারাদিন বসে থাকা অভ্যাসও ভালো নয়

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বসে থাকা, ব্যায়াম না করা এবং ওজন বাড়তে দেওয়া পরোক্ষভাবে কিডনি পাথরের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

তবে শুধু ব্যায়াম করলেই কিডনিতে পাথর হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। পর্যাপ্ত পানি, সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর ওজন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, সবগুলো বিষয় একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।

শাকসবজি খেতে গিয়ে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলুন

কিডনিতে পাথরের কথা উঠলেই অনেকে সব ধরনের শাকসবজি বাদ দিতে শুরু করেন। এটি ঠিক নয়।

কিছু খাবারে অক্সালেট বেশি থাকে। যেমন পালংশাক, বাদাম, চিনাবাদাম ও গমের ভুসি। ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হওয়ার ইতিহাস থাকলে এসব খাবারের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

কিন্তু সবার জন্য একই খাবারের তালিকা প্রযোজ্য নয়। আপনি কী ধরনের পাথরে আক্রান্ত হয়েছেন, তার ওপর খাদ্যতালিকার পরিবর্তন নির্ভর করে।

ক্যালসিয়াম পুরোপুরি বাদ দেওয়া কি ঠিক?

এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। ক্যালসিয়াম দিয়ে পাথর তৈরি হয় বলে অনেকেই দুধ বা অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে চান।

কিন্তু ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ক্ষেত্রে খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া বরং উপকারী হতে পারে। অন্ত্রে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটিকে শরীরে শোষিত হওয়ার আগেই আটকে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

তাই কিডনিতে পাথর হয়েছে বলে নিজের মতো করে দুধ বা ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়। ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয় পরিমাণ এবং উৎস চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা ভালো।

সব কিডনি পাথরের নিয়ম এক নয়

কিডনি পাথর বললেই একই ধরনের পাথর বোঝায় না। ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ক্যালসিয়াম ফসফেট, ইউরিক অ্যাসিড এবং সিস্টিন পাথরসহ বিভিন্ন ধরনের পাথর হতে পারে।

কোন খাবার কমাতে হবে, কতটা পানি পান করতে হবে বা ওষুধ প্রয়োজন কি না, তা অনেকটাই পাথরের ধরন ও ব্যক্তির অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

এই কারণেই এক ব্যক্তির জন্য কার্যকর খাদ্যতালিকা অন্য ব্যক্তির জন্য একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।

কিডনিতে পাথর হওয়ার পর কী পরিবর্তন করবেন?

একবার পাথর হয়ে গেলে শুধু পাথর বের করে ফেলাই শেষ কথা নয়। ভবিষ্যতে আবার পাথর হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পাথরের ধরন জানা গেলে চিকিৎসক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন পরামর্শ দিতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব পরীক্ষা করে প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড বা অন্যান্য উপাদানের মাত্রা দেখা হয়। এর মাধ্যমে পাথর তৈরির ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পানি, লবণ, প্রাণিজ প্রোটিন বা নির্দিষ্ট খাবারের পরিমাণ পরিবর্তন করা হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পাথর প্রতিরোধের ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।

পানি কতটা খাবেন?

কিডনি পাথর প্রতিরোধে পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবার জন্য একই পরিমাণ পানি নির্ধারণ করা যায় না।

মার্কিন জাতীয় ডায়াবেটিস, পরিপাক ও কিডনি রোগ ইনস্টিটিউট সাধারণভাবে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের ওপর জোর দেয় এবং অনেক সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে দিনে ছয় থেকে আট গ্লাস পানি বা অন্যান্য তরলের কথা উল্লেখ করে। তবে গরম আবহাওয়া, ব্যায়াম, ঘাম এবং পাথরের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন বাড়তে পারে। অন্যদিকে কিডনি ফেইলিউর বা হৃদ্‌যন্ত্রের কিছু রোগে বেশি পানি পান করা ক্ষতিকর হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে ঘামের মাধ্যমে পানি হারানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

কিডনিতে পাথর অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। কিন্তু পাথর ইউরেটারে আটকে গেলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে। কোমর বা পিঠের পাশ থেকে তলপেট বা কুঁচকির দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত, বমি বা প্রস্রাবের সময় অস্বস্তিও হতে পারে।

তীব্র ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি, প্রস্রাব আটকে যাওয়া, বারবার বমি বা অসুস্থতা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ পাথরের সঙ্গে সংক্রমণ বা প্রস্রাবের পথে বাধা তৈরি হলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।

কিডনি পাথর এড়াতে দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?

সহজ কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে-

  • নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করুন
  • অতিরিক্ত লবণ ও সোডিয়ামযুক্ত খাবার কমান
  • প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন
  • প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন খাবেন না
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
  • নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
  • নিজের মতো করে সব ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার বাদ দেবেন না
  • আগে পাথর হয়ে থাকলে সেটির ধরন জেনে খাদ্যাভ্যাস ঠিক করুন
  • বারবার পাথর হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান

মার্কিন জাতীয় ডায়াবেটিস, পরিপাক ও কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটও পানি, সোডিয়াম, প্রাণিজ প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অক্সালেটের পরিমাণকে পাথরের ধরন অনুযায়ী বিবেচনা করার পরামর্শ দেয়।

কিডনিতে পাথর শুধু হঠাৎ হওয়া সমস্যা নয়

কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়ার পেছনে বংশগত প্রবণতা, কিছু রোগ ও বিপাকীয় সমস্যা যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি দৈনন্দিন জীবনযাপনেরও ভূমিকা থাকতে পারে। কম পানি পান করা, অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, কিছু ক্ষেত্রে বেশি প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন এবং অনিয়মিত জীবনযাপন ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে কিডনি পাথর প্রতিরোধের কোনো একক খাদ্যতালিকা নেই। আগে পাথর হয়ে থাকলে সেটির ধরন জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ঠিক করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

অর্থাৎ কিডনিতে পাথর হয়তো একদিন তীব্র ব্যথা দিয়ে জানান দেয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তার পেছনে দীর্ঘদিনের কিছু অভ্যাস কাজ করে। প্রতিদিনের খাবার ও পানীয়ের দিকে একটু বেশি নজর দেওয়া তাই ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া