logo

নিউমোনিক প্লেগ কী, কেন এটি এত ভয়ংকর

নিউমোনিক প্লেগ কী, কেন এটি এত ভয়ংকর
ছবি: ট্রি-সিটি হেরাল্ড

ইতিহাসের ভয়াবহ মহামারি প্লেগ। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫২ সালের মধ্যে এই রোগে প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে প্লেগ এখন চিকিৎসাযোগ্য। তবুও এর কিছু ধরন এখনও অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর এর মধ্যে অন্যতম হলো নিউমোনিক প্লেগ।

নিউমোনিক প্লেগ সরাসরি ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে।

এ প্লেগের বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, সংক্রমিত ব্যক্তির কাশি বা শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত সংক্রামক ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে। আর সময়মতো চিকিৎসা না হলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে, তার উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনার সুযোগ বেড়ে যায়।

নিউমোনিক প্লেগ কী

নিউমোনিক প্লেগ হলো প্লেগেরই একটি ধরন। এতে ‘ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস’ নামের ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। আবার একই ব্যাকটেরিয়া থেকে বুবোনিক ও সেপ্টিসেমিক ধরণের প্লেগও হতে পারে।

বুবোনিক প্লেগ সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। আর এতে শরীরের লসিকাগ্রন্থি ফুলে গিয়ে ব্যথা হতে পারে। এতে করে নিউমোনিক প্লেগে ফুসফুস আক্রান্ত হয়।

কখনো কখনো অন্য ধরনের প্লেগের সংক্রমণ শরীরের ভেতর ছড়িয়ে ফুসফুস পর্যন্ত পৌঁছালেও নিউমোনিক প্লেগ তৈরি হতে পারে। আবার সংক্রমিত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত সংক্রামক কণা অন্যদের শ্বাসের সঙ্গে মিশে গেলেও এ রোগ হতে পারে।

প্লেগের মূলত তিনটি প্রধান ধরন আছে-

বুবোনিক প্লেগ: সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় এবং লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায়।

নিউমোনিক প্লেগ: ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে।

সেপ্টিসেমিক প্লেগ: ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে এবং গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগ কীভাবে ছড়ায়

নিউমোনিক প্লেগ ছড়ানোর প্রধান উপায় হলো সংক্রমিত ব্যক্তি বা প্রাণীর শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত সংক্রামক কণা। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের সংস্পর্শে আসলে এ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পাশাপাশি সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শ থেকেও প্লেগের ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। খেয়াল রাখবেন, সংক্রমিত মাছির কামড় এবং আক্রান্ত প্রাণীর টিস্যু বা দেহরসের সংস্পর্শ প্লেগের অন্য ধরনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণপথ। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, প্লেগের সব ধরন একভাবে ছড়ায় না। বুবোনিক প্লেগ সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে সহজে ছড়াতে পারে না। নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ সহজেই সম্ভব।

নিউমোনিক প্লেগের ৭ লক্ষণ

নিউমোনিক প্লেগের লক্ষণ দ্রুত দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের পর কখনো মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও উপসর্গ শুরু হতে পারে।

হঠাৎ জ্বর: হঠাৎ জ্বর আসা প্লেগের অন্যতম লক্ষণ। এর সঙ্গে কাঁপুনি, শরীর ব্যথা ও অসুস্থ বোধ করার মতো উপসর্গ থাকতে পারে।

কাশি: নিউমোনিক প্লেগে কাশি হতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে পারে। কাশির সঙ্গে কখনো রক্তমিশ্রিত কফও বের হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট: ফুসফুসে সংক্রমণ গুরুতর হলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। শ্বাসকষ্ট দ্রুত বাড়তে থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বুকে ব্যথা: কাশি বা শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে ব্যথা হতে পারে। তবে বুকে ব্যথার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে নিউমোনিক প্লেগ নির্ণয় করা যায় না।

মাথাব্যথা: জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা হতে পারে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি অসুস্থতার তীব্রতাও বাড়তে পারে।

অতিরিক্ত দুর্বলতা: সংক্রমণের কারণে শরীর খুব দুর্বল লাগতে পারে। স্বাভাবিক কাজকর্ম করতেও কষ্ট হতে পারে।

দ্রুত অবনতি: নিউমোনিক প্লেগের অন্যতম বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো, রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে। জ্বর ও কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা রক্তমিশ্রিত কফ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

মনে রাখবেন, এসব লক্ষণ নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেও দেখা দিতে পারে। আর শুধু উপসর্গগুলোর ভিত্তিতেই নিউমোনিক প্লেগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নিউমোনিক প্লেগ কি প্রাণঘাতী

হ্যাঁ, সময় মতো চিকিৎসা না হলে এ প্লেগ প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রোগটি দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে। এছাড়া উপসর্গ শুরুর ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও অনেক সময় মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে একইভাবে বিষয়টি ঘটবে, তা না। আর এ কারণেই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগের চিকিৎসা কী

নিউমোনিক প্লেগের চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। রোগীর অবস্থা, বয়স, শারীরিক পরিস্থিতি এবং সংক্রমণের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচন করেন। গুরুতর রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

সন্দেহজনক রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের পর চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল আসার আগেই চিকিৎসা শুরু করতে পারেন। কারণ চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে রোগীর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।

মনে রাখবেন, কোনোভাবেই এসময় নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। কোন ওষুধ, কোন মাত্রায় আর কত দিন ব্যবহার করতে হবে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

নিউমোনিক প্লেগ থেকে বাঁচতে যা যা করবেন

সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। যেমন-

  • আক্রান্ত বা আক্রান্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • কারও মধ্যে লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
  • সংক্রমিত প্রাণী বা মৃত বন্য প্রাণী ভুলেও খালি হাতে ধরবেন না।
  • প্লেগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকায় গেলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
  • সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধুয়ে নিন এবং অসুস্থ ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • রোগীকে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।

খেয়াল রাখবেন, প্লেগের রোগীকে চিকিৎসার সময় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হয়। রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে পর্যবেক্ষণ বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগ কি কোভিড-১৯-এর মতো

নিউমোনিক প্লেগ আর কোভিড-১৯, দুটি রোগই শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত কণার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তবে তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

কোভিড-১৯ হয় সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের কারণে আর নিউমোনিক প্লেগ হয় ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে। তাই মনে রাখবেন, রোগ দুটির চিকিৎসা, সংক্রমণের বৈশিষ্ট্য ও রোগ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এক নয়।

প্লেগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুটি রোগের সংক্রমণপথে কিছু মিল থাকলেও একটিকে অন্যটির সমতুল্য মনে করার সহজ না।

নিউমোনিক প্লেগ বিরল হলেও অত্যন্ত গুরুতর একটি সংক্রামক রোগ। এর প্রধান ঝুঁকি হলো ফুসফুসে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আর দ্রুত চিকিৎসা না হলে অল্প সময়ের মধ্যে জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি হওয়া।

আধুনিক চিকিৎসায় রোগটি নিরাময় করা সম্ভব, বিশেষ করে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু হলে। হঠাৎ জ্বর, কাশি, বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিলে, বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্লেগের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

মনে রাখুন, শুধু রোগটির নাম শুনে আতঙ্কিত না হয়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য জানা, উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: সিএনএন